নান্দনিকতায় কাগজের কারুশিল্প
মোজাক্কির রিফাত | Thursday, 7 October 2021
'ছুটি হলে রোজ ভাসাই জলে কাগজ-নৌকাখানি,
লিখে রাখি তাতে আপনার নাম, লিখি আমাদের বাড়ি,
কোন গ্রাম বড়ো বড়ো ক’রে মোটা অক্ষরে যতনে লাইন টানি।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাগজের নৌকা কবিতার মত ফেরা হলে গত রোজ জলে ভাসিয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কাগজের নৌকা।
শৈশব থেকে শহর অথবা গ্রামের কথকতায় কত উঠে এল কাগজের নৌকা। কাগজ যে শুধু ছাপাখানা আর লেখার জন্য তৈরি হয় নি সে ধারণা মানুষের যে বহু আগে ভেঙেছে রবি বাবুর কবিতা পড়ে, বুঝতে কারোর বাদ থাকে না।
কল্পনার মিশেলে কাগজের কাজ হয়ে ওঠে এক অন্যরকম শিল্পকর্ম, নাম দেয়া হয় 'পেপার ক্রাফটিং' বা সহজ বাংলায় কাগজের কারুশিল্প।
কাগজের কারুশিল্পের উদ্ভব
কাগজের কারুশিল্প মূলত দ্বি বা ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্ম। এসব তৈরির জন্য প্রধান মাধ্যম কাগজ বা কার্ডবোর্ড এবং শিল্পীর সৃজনশীলতা।
কাগজ দিয়ে শিল্পের যে কারিকুরি চলে তার আনুষ্ঠানিক প্রচলন মূলত জাপানে। জাপানি ভাষায় এই শিল্পকর্ম 'অরিগ্যামি' নামে পরিচিত। অনেক বছর ধরে চলে আসলেও আধুনিক ভাবে এই শিল্পের প্রচলন করেন জাপানি কারুশিল্পী আকিরা ইয়োশিজাওয়াকা।
তবে এই শিল্প শুধু ভাঁজ করা কাগজের কারিকুরির মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কাগজ কেটে বা আঠার ব্যবহার করেও এই শিল্পকর্ম তৈরি হতে পারে; এই প্রক্রিয়াকে বলে 'কিরিগ্যামি'।
কারুশিল্প শেখার অনুষঙ্গ ও কৌশল
অরিগ্যামি ছকবদ্ধভাবে শেখার বিশেষ কিছু কলাকৌশল থাকলেও কাগজের কারুশিল্প ব্যাপারটা শেখার ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। নানা প্রকারের, নানা রঙের কাগজে করা হয় কাগজের কারুশিল্প; সাদা কাগজকেও চাইলে শিল্পীরা রাঙিয়ে নেন মনমতো।
বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সালভাদর দালির মতে, রঙের খেলাই হচ্ছে সৌন্দর্য্য। রাঙ ছাড়াও কাজটাকে নিখুঁতভাবে করার জন্য কাঁচি, স্কেল, আঠা- এসব অনুষঙ্গ ব্যবহার করে থাকেন কারুশিল্পীরা। আধুনিক পেশাদার কারুশিল্পীরা ব্যবহার করছেন পেপার ক্রাফটিং মেশিন-ও।
শখের কারুশিল্পী বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি এবং ক্রপ সায়েন্স বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী অনন্যা সরকার জানান, গত বছর অতিমারীকালীন ঘরবন্দী অবস্থায় সময় কাটানোর অনুষঙ্গ হিসেবে কাগজের শিল্প নিয়ে কাজ শুরু করেন ইউটিউব দেখে।
এরপর নিজের হাতেই প্রিয়জনদের জন্মদিনের উপহার, ঘর সাজানোর নানা সৌখিন জিনিসপত্র, এমনকি ছোট বাচ্চাদের খেলনাও কাগজ দিয়ে তৈরি করেছেন তিনি।
বাড়তি আয়ে কাগজের কাজ
বর্তমানে ছোট পরিসরে হলেও কাগজের কারুশিল্পের বাণিজ্যিক প্রচলন শুরু হয়েছে। বিশেষকরে শিক্ষার্থীদের জন্য কাগজের শিল্প বাড়তি আয়ের উৎস হতে পারে।
এই পথ ধরে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে স্বল্প মূলধনে ব্যবসা শুরু করেছেন হাল আমলে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কাগজের কলমদানি, খাম, জন্মদিন বা বিয়ের কার্ড, উপহারের বাক্স, এমনকি বিয়েবাড়িতে বা যেকোনো অনুষ্ঠানে কাগজের নান্দনিক সজ্জায় কাগজ ব্যবহার হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কারুশিল্পী নওশীন আনজুম জানান, ছোটবেলায় অরিগ্যামির প্রতি আগ্রহ এবং টেলিভিশন দেখে তিনি কারুশিল্প শুরু করেন। এরপর বন্ধুদের অনুপ্রেরণায় কলেজ জীবন থেকেই বাণিজ্যিকভাবে কাগজের কারুশিল্প শুরু করেন।
এর মাধ্যমে যা আয় করছেন তা বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে বেশ সন্তোষজনক বলে মনে করেন তিনি।
কারুশিল্পের নান্দনিকতার সুদিন হয়ত হারানোর পথে। তবে তরূণদের হাত ধরেই বেঁচে থাকতে পারে এসব হাতের কাজের ঐতিহ্য।
মোজাক্কির রিফাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
anmrifat14@gmail.com