নানান দেশের নানান জুতো
শুভদীপ বিশ্বাস | Friday, 30 July 2021
কখনো কি পোশাকের সাথে জুতোর সম্পর্কটা খেয়াল করে দেখেছেন? যেমন ধরুন, পাঞ্জাবির সাথে গামবুট পরলে যেমন বেমানান লাগবে, তেমনি টপস আর জিন্সের সাথে হাওয়াই চটি পরলেও লোকের হাসির খোরাক হবে। যদিও আজকাল আমরা যেসব জুতো পরি, তাদের প্রায় সবগুলোই পাশ্চাত্যের জুতোর অনুকরণে বা অনুসরণে তৈরি, আমাদের নিজস্ব শৈলীতে তৈরী জুতো বলতে তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই। তবে পৃথিবীর নানান দেশে এখনও হরেক রকমের ঐতিহ্যগত জুতো বা পাদুকা আছে, যেগুলো ঔপনিবেশিকতা বা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পাল্লায় পড়ে এখনও বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। আমাদের আজকের এই লেখা তেমনি কিছু অদ্ভুত ঐতিহ্যবাহী পাদুকা নিয়ে।
লোটাস শুজ (পদ্ম জুতো)
এই বিশেষ ধরনের জুতোটি চীনের একান্তই নিজস্ব সম্পত্তি। খুব সম্ভবত দশম শতাব্দীতে এর প্রচলন হয়েছিল। সেই থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত, মোটামুটি এক হাজার বছর ধরে এই পদ্ম জুতো চীনা নারীদের পায়ের সাথে লেগে থেকেছে।
তবে প্রচলনের শুরু থেকে ঢালাওভাবে সব নারী এই জুতো পরতে পারতেন না, বা পরার অধিকার পেতেন না। শুধু তারাই এই জুতোটি পরতে পারতেন, যারা ‘ফুট বাইন্ডিং’, আক্ষরিক বাংলায় ‘পদবন্ধন’ নামক কষ্টকর চর্চাটি করতে পারতেন। এ প্রক্রিয়ায় চীনা নারীরা নিজেদের পায়ের আকৃতিকে অনেকটা বিকৃত করে জোরপূর্বক ছোট করে রাখতেন। যেহেতু প্রথমে শুধুমাত্র অভিজাতশ্রেণির নারীরাই এই কাজটি করতে পারতেন, কাজে তারাই শুধু এই পদ্ম জুতো পরার অধিকার রাখতেন।
ধীরে ধীরে অবশ্য বহু সাধারণ চীনা নারীও প্রক্রিয়াটি অভ্যাস করতে শুরু করেন এবং ঐতিহ্যবাহী পদ্ম জুতো পরার অধিকার লাভ করেন। এ জুতোয় সাধারণত নানা রত্নখচিত কারুকার্য, সূচিকার্য থাকত। তবে সাধারণ ঘরে তৈরী পদ্ম জুতোও পাওয়া যেত। পদ্মের মতো দেখতে বিচিত্র এই জুতোটি হিলসহ এবং হিল ছাড়া, দু’ধরনের শুকতলি সমেতই পাওয়া যেত।
কাবকাব জুতো
তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যে, অর্থাৎ লেবানন, তুরস্ক, সিরিয়া ইত্যাদি দেশে এই বিচিত্র নামের ও আকৃতির জুতোটি প্রচলিত ছিল। কিছু গবেষকদের মতে এই বিশেষ পাদুকাটির প্রথম প্রচলন হয় লেবাননে। কাবকাব জুতো শুকতলার নিচের দিকে সামনে ও পেছনে দুটো বিশাল সাইজের কাঠের হিল লাগানো থাকত। এ জুতো পরার পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, রাস্তাঘাটের ময়লা পায়ে বা জুতোতে না লাগা।
তখনকার দিনের গণ-স্নানাগারেও এই জুতো পরে যাওয়া হতো, যাতে করে পায়ে নোংরা পানি বা নোংরা পাথরের মেঝের স্পর্শ না লাগে। কাবকাব জুতো সাধারণত পুরোটাই কাঠের তৈরি। বিভিন্ন রত্ন, মুক্তো ও সোনা-রূপার কারুকার্য সম্বলিত জুতোটি দেখতে যথেষ্ট অভিজাত ছিল। মার্বেল পাথরের মেঝের ওপর দিয়ে হাঁটার সময় জুতোটির সাথে মেঝের ঘর্ষণে ‘কাব কাব’ জাতীয় শব্দ হতো। সে থেকেই জুতোটির নামের উৎপত্তি।
স্যাবোট/ ক্লম্পেন/ ক্লগস
ওপরের নাম তিনটি মুলত একটিই জুতোর। আমরা নাহয় একে আপাতত ‘স্যাবোট’ বলেই ডাকি। স্যাবোটের প্রাপ্তিস্থান হচ্ছে বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, ডেনমার্ক প্রভৃতি দেশে। সম্পূর্ণ কাঠের তৈরী এই জুতোটি মোটা কাপড়ের মোজা দিয়ে পরা হয়, যাতে কোনোভাবেই পা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
কাঠের তৈরী বলে জুতোটি পরা বেশ বেদনাদায়ক বলে আপনার মনে হতেই পারে, কিন্তু সত্যি বলতে এই জুতো বেশ আরামদায়ক এবং নিরাপদ। জুতোজোড়া আপনার পা দুটোকে প্রবল গ্রীষ্ম, শৈত্য, সাপের কামড়, এমনকি কড়া এসিড থেকেও অনায়াসে রক্ষা করবে। তাছাড়া এগুলো পরতে বা খুলতে খুব একটা পরিশ্রমও হয় না। আজকের দিনে এসেও ওসব জায়গার কৃষকেরা স্বচ্ছন্দে এই জুতো ব্যবহার করেন।
বিংশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত স্যাবোট হাতেই মাপ নিয়ে তৈরি করা হতো। তবে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রথমবারের মতো মেশিনের মাধ্যমে স্যাবোট জুতো তৈরি করা শুরু হয়।
মেক্সিকান সূঁচালো বুট
একধরনের সূঁচালো বুট আছে মেক্সিকোতে, যেটা দেখলেই সালভাদর ডালির গোঁফের কথা মনে পড়ে। এর সামনের দিকটা লম্বা হতে হতে অনেকটা ডালিসাহেবের গোঁফের মতই পেঁচিয়ে সূঁচালো হয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বুটের সামনের এই লম্বা অংশটুকু বেশ লম্বা হয়, কোনো কোনো বুটের সামনেটা তো দেড় মিটার পর্যন্ত লম্বা!
২০০৯ এর দিকে ইলেক্ট্রিক মিউজিক ব্যান্ডের সদস্যদের মধ্যে হঠাৎ করে এই বুটটি প্রবল জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাদের দেখাদেখি ভক্তদের মধ্যেও প্রবল আলোড়ন তোলে এই বিশেষ জুতো। উৎসব-উৎসব ভাবের এই বুট বিভিন্ন ধরনের বিচিত্র জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো হয়। এলইডি ফ্ল্যাশ বাল্ব, ডিস্কো লাইট থেকে শুরু করে ছোট ছোট আয়নার টুকরা, হেন বস্তু নেই- যা দিয়ে জুতোটি সাজানো যায় না। আজও মেক্সিকান ব্যান্ড সদস্য এবং নাচিয়েরা এই গভীর যত্নের সাথে মেক্সিকান সূঁচালো বুট ব্যবহার করে থাকে।
এধরনের অদ্ভুত কিংবা বিচিত্র জুতো আজও নানা দেশে বহাল তবিয়তে টিকে রয়েছে। ওপরে বর্ণিত এই জুতোগুলোর মতো আরও হাজারো রকমের জুতো আছে। সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে প্রভৃতি দেশের বাস্ট শুজ, ফিনল্যান্ডের সামি রেইনডিয়ার বুটস, গ্রিসের সারৌহি, পাকিস্তান, ভারতের মোজারি, জাপানের জিকা-টাবি ইত্যাদি আরও অনেক জুতো সেদেশের সংস্কৃতির অংশ হয়ে থেকে গেছে। অথচ আমাদেরও তো খড়ম ছিল, আমাদের নিজেদের ঐতিহ্যবাহী জুতো। আমাদের সংস্কৃতি তাকে জায়গা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখল না, আফসোসেরই কথা বটে।
শুভদীপ বিশ্বাস বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ, তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
shuvodipbiswasturja1999@gmail.com