নানান গুণের অ্যালোভেরা
ফরহাদুর রহমান | Tuesday, 8 June 2021
বাংলাদেশে তুমুল জনপ্রিয় ভেষজ উদ্ভিদ ঘৃতকুমারী বা অ্যালোভেরার নাম শোনেননি এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। অ্যালোভেরার হরেকরকম উপকারিতা, সহজলভ্যতা ও তুলনামূলক সস্তা দাম এর জনপ্রিয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকেই বাড়ির ছাদে, বেলকোনিতে কিংবা উঠানবাগানে অ্যালোভেরার চাষ করে থাকেন। এছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সব নার্সারি, বাজারের ঔষদি দোকানে এই ভেষজ উদ্ভিদটি পাওয়া যায়।
অ্যালোভেরা একটি লিলি প্রজাতির উদ্ভিদ। আফ্রিকার মরুভূমি অঞ্চল ও মাদাগাস্কারে এটি প্রথম দেখা যায়। বহু আগে থেকে গ্রিস, মিসর, ভারত, মেক্সিকো, জাপান, চীনসহ নানা দেশে প্রাচীনকাল থেকেই হরেকরকম কাজে অ্যালোভেরা ব্যবহার করা হয়। যার ধারাবাহিকতায় যুগ ধরে নানা পরিচর্যায় মানুষজন অ্যালোভেরা ব্যবহার করছে।
অ্যালোভেরা মানুষের শরীরে নানারকম প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান দিতে সক্ষম। ভেষজ এই উদ্ভিদ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে ব্যবহার করা হলেও খাদ্য-পানীয় হিসেবেও এটি কার্যকর। এমনকি অ্যালোভেরা সালাদ হিসেবেও খাওয়া যায়। এটির ব্যবহার আপনাকে যেমন নানা রোগ থেকে বাঁচাতে সক্ষম হবে তেমনি বিভিন্ন রোগের প্রতিকার হিসেবেও কার্যকরী। এই লেখায় পাঠকদের জন্য অ্যালোভেরা বা ঘৃতকুমারীর বিভিন্ন গুণাবলী তুলে ধরা হল।
বদহজমরোধে অ্যালোভেরা
অনেকের খাবার বদহজমের সমস্যা থাকে। আর বদহজম থেকে শরীরে অনেক রোগের সৃষ্টি হয়। তাই সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন সঠিক হজম প্রক্রিয়া। অ্যালোভেরা পরিপাক যন্ত্রকে পরিষ্কার করে হজম শক্তি বাড়াতে খুবই কার্যকর। এছাড়া অ্যালোভেরার রস পরিপাক ও রেচন যন্ত্রকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম। যা পেটে কৃমি হওয়া থেকে সুরক্ষা দেয়। এমনকি কৃমি থাকলেও তা নির্মূল করে।
ত্বক ও চুলের মহৌষধ
ত্বক ও চুলের যেকোনো সমস্যা সমাধানে অ্যালোভেরা যেন এক মহৌষধ। বর্তমানে প্রসাধনী সামগ্রীর অন্যতম কাঁচামাল হিসেবে অ্যালোভেরা ব্যবহৃত হয়। অ্যালোভেরায় আছে ভিটামিন সি, ই এবং বেটা-ক্যারোটিন। তাই এটি ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখে, ত্বক কোমল রাখে ও ত্বকের দৃঢ়তা বজায় থাকে। ত্বকে ফুসকুড়ি পড়লে কিংবা ক্ষতিকারক পোকা কামড় দিলে এটি ব্যবহারে সমস্যা দূর হয়। এমনকি ত্বকের কোনো ক্ষতে অ্যালোভেরা রস ব্যথা কমাতেও সক্ষম। অ্যালোভেরা চুলের বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে। চুলে পুষ্টি জোগাতে, চুল পরিষ্কার করতে এবং চুল ঝলমলে উজ্জ্বল রাখতে অ্যালোভেরা খুবই কাজের।
শরীর জ্বালাপোড়া ও ব্যথা কমায়
নানা কারনে অনেকসময় শরীর জ্বালাপোড়া করে থাকে। এ ধরণের সমস্যা দূরীকরণে অ্যালোভেরা বেশ কার্যকর। কেননা এতে বি-সিসটারোলসহ এমন ১২টি উপাদান আছে যা শরীর জ্বালাপোড়া কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও হাত-পায়ের জোড়ার জড়তা দূর করে এবং গিঁটের ব্যথা কমাতেও অ্যালোভেরা সহায়তা করে।
ওজন কমাতে সহায়ক
অ্যালোভেরার রসে অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি নামের একটি উপাদান আছে যা শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত মেদ দূর করে। ফলে নিয়মিত অ্যালোভেরার রস পান করলে শরীরের ওজন ঠিক থাকে। এছাড়াও এই ভেষজ উদ্ভিদের রস শরীর দূষণমুক্ত রাখে। দূষণমুক্ত শরীর মানুষের কর্মশক্তি বাড়িয়ে দেয়। বদহজমরোধে সহায়তা করে। এতে করে শরীর অযাচিত রোগবালাই থেকে মুক্তি পায়।
ঠোঁটের লাবণ্যে অ্যালোভেরা
ঠোঁটের সৌন্দর্য বাড়াতে অ্যালোভেরা খুব কাজের। শীতে অনেকের ঠোঁট শুষ্ক হয়ে যায়। এতে করে ঠোঁট ফাটা, ঠোঁট দিয়ে রক্ত পড়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। ঠোঁটে কালচে ভাব আসে। এসব সমস্যা রোধ ও প্রতিকারে প্রতিদিন ঠোঁটে সামান্য পরিমাণে অ্যালোভেরা ব্যবহার খুবই উপকারী।
মুখের যত্নে অ্যালোভেরা
অ্যালোভেরায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি আছে। যা মুখের জীবাণু দূর করে। এছাড়াও মাড়ি ফোলা ও মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বন্ধ করে। এছাড়াও মুখের ঘা দূর করতে অ্যালোভেরা অত্যন্ত কার্যকরী। অ্যালোভেরার জেল মাউথ ওয়াশ হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
অ্যালোভেরার হ্যান্ড স্যানিটাইজার
বিভিন্ন রোগজীবাণু ধ্বংস করতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা হয়। অ্যালকোহলের সাথে অ্যালোভেরা জেল ও তেল দিয়ে সহজেই ঘরোয়াভাবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করা যায়। এতে করে বাজার থেকে অধিকমূল্যে কেনা স্যানিটাইজারের খরচ কমানো সম্ভব হয়।
রক্তশূন্যতা রোধে
অনেকে অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতায় ভুগে থাকেন। অ্যালোভেরা শরীরে লোহিত রক্ত কণিকার উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। এতে এর প্রকোপ কমে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যালোভেরা জুস খাওয়ার সাথে সাথে সারা শরীরে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্তের প্রভাব বেড়ে যায়। ফলে, শরীরের প্রতিটি অঙ্গের পাশাপাশি হৃৎপিণ্ডের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। রক্তে ক্ষতিকারক কোলেস্টেরলের মাত্রাও হ্রাস পায়। এতে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে। এছাড়াও অ্যালোভেরা রস রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমিয়ে আনতে সহায়তা করে। যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে দারুণভাবে সহায়তা করে। সর্বোপরি নানান গুণের অ্যালোভেরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই উপকারিতা বয়ে আনতে সক্ষম একটি ভেষজ উদ্ভিদ।
ফরহাদুর রহমান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত।
farhad.mcj1@gmail.com