logo

নচিকেতা, অঞ্জন ও সুমন - জীবনমুখী বাংলা গানের তিন পথিকৃৎ

অনিন্দিতা চৌধুরী | Wednesday, 12 January 2022


জীবনমুখী বাংলা গানের মধ্য দিয়ে জীবনের স্বাদ নিতে যারা ভালোবাসেন, তাদের কাছে তিনটি নাম খুবই কাছের - নচিকেতা, সুমন ও অঞ্জন।

বাংলা গান জীবনের সন্ধান পেয়ে মিলিত হয়েছে এই ত্রিমোহনায় আর ভারতীয় বাংলাই শুধু নয়, বাংলাভাষী সকল শ্রোতার মধ্যেই একটি আলাদা শ্রেণি তৈরি হয়েছে- যারা কিনা এ ধারার বাংলা গানের পাঁড় ভক্ত। আজকের লেখায় কথা হবে এই তিন পথপ্রদর্শককে নিয়ে।

নচিকেতা চক্রবর্তী

নীলাঞ্জনা, অনির্বাণ, পৌলমী, রাজশ্রীকে আমরা যার গানের মধ্য দিয়ে চিনতে শিখেছি, তিনিই নচিকেতা। নচিকেতার গান অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অপ্রাপ্তি বা দুঃখকে নির্দেশ করে, অনেক ক্ষেত্রে আবার তীক্ষ্ণ পলিটিকাল স্যাটায়ার হয়ে অসচেতনতার ফাঁপা বেলুনে ছুঁচ ঢোকায়।

বিদ্যমান রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যকার ফাঁকফোঁকরকে তিনি গানের কথার মাঝে প্রকাশ করেন ‘ও ডাক্তার,’ ‘হাল্লা বোল,’ ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’ কিংবা ‘সরকারি কর্মচারী’ গানগুলোর মধ্য দিয়ে।

নিজেকে তিনি প্রকাশ করেন এভাবে- “নচিকেতা আজো মানুষের হৃদয়ে হয়ে জ্বলছে ‘আগুনপাখি’।”

প্রেমিকপুরুষ হিসেবে নচিকেতা প্রচণ্ড বেপরোয়া। তিনি প্রেমিকার সাথে কোনোপ্রকার সমঝোতায় যেতে চান না, অন্তত তার গানে তো নয়ই। প্রেমিকার দিকে গানের মধ্যে তিনি শব্দ ছুঁড়ে দেন, “এই তুমি কি আমায় ভালোবাস? যদি না বাসো, তবে পরোয়া করি না। আমি সূর্যের থেকে ভালোবাসা নিয়ে রাঙাব হৃদয় তার রং দিয়ে, পোশাকি প্রেমের প্রয়োজন বোধ করি না!”

আকস্মিক ক্ষোভে নচিকেতার গলায় আমরা শুনতে পাই, “আমি তোমার খোঁপায় আমার চেতনা-স্বাধীনতা সঁপে দিতে পারব না, দিতে পারব না!”

এই যে জেদ, এই যে সমঝোতা না করার একরোখা স্বভাব, এটাই নচিকেতা। নচিকেতা উদ্ধত যুবা, নচিকেতা হাতুড়ির কড়া আঘাত, নচিকেতা গানেও গদ্যের এমন ধারা শামিল করেছেন যে একেকটি গানে খুঁজে পাওয়া যায় জীবনের মানে।

তিনি কখনো থেমে যান না, তাই তার কাছে ‘অন্তবিহীন পথ চলাই জীবন’। নচিকেতা চক্রবর্তীর অন্তবিহীন এ পথচলার শুরু হয়েছিল তার প্রথম অ্যালবাম ‘এই বেশ ভালো আছি’ দিয়ে।

অঞ্জন দত্ত

মেরী অ্যান, রঞ্জনা, বেলা বোস... হালকা গোঁফ ওঠা, রাত্তিরে বুকের মাঝে চিন চিন ব্যথা, কোনো এক সদ্য কিশোরের প্রেমে হাবুডুবু খাবার জন্য তিনটি নামই যথেষ্ট।

তবে এতেই সীমাবদ্ধ নয় অঞ্জনের গানের সীমারেখা কিংবা তার গানের চরিত্রদের আবেদন। চিরতরুণ এক বুড়ো অঞ্জন দত্ত নিজেই যেন কখনো হয়ে ওঠেন বেহালাবাদক সেই জেরেমি।

দার্জিলিংয়ের রাস্তার চলতে চলতে আপনার কানেও হয়তো কখনো ভেসে উঠেছে- “খাদের ধারের রেলিংটা!”

আপনার মনেও হয়তো পড়েছে, চ্যাপ্টা নাকের দো দো শিরিংটার কথা, যার সাথে অঞ্জনের ছেলেবেলার বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে শৈশবের দার্জিলিংয়ের স্কুলে। এসবই তিনি বলেছেন জীবনীমূলক বই- ‘অঞ্জনযাত্রা’য়। এ বইয়ে অঞ্জনের যাত্রার বিবরণ দিয়েছেন লেখক, তবে সে বিবরণের পুরোটাই অঞ্জনের সাক্ষাৎকার থেকে পাওয়া।

অঞ্জন দত্ত শুধু গানই নয়, চলচ্চিত্রেও নিয়মিত নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন সেই সাল থেকে, অভিনয় ও পরিচালনা উভয় ক্ষেত্রেই।

এখনো পর্যন্ত তার পথচলা আগের মতোই দুর্নিবার। এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপনাও করেছেন তিনি। বর্তমান সময়ে অঞ্জন দত্ত একজন বহুমুখী প্রতিভার প্রতিনিধি, যার পদচারণায় বাংলা নাগরিক সংস্কৃতি প্রতিদিনই কিছুটা ভিন্নভাবে মুখর হয়।

কবীর সুমন

অত্যন্ত অমায়িক ধরনের এই মানুষটি বাংলা জীবনমুখী গানের ধারার সাথে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন। অমরত্বের প্রত্যাশা থাকুক বা নাই থাকুক, ‘জাতিস্মর’ গানটির জন্য সুমন সত্যি অমর হয়ে গেলেও অবাক হবার কিছু নেই।

যিনি তীব্র আকর্ষণে বলতে পারেন, “যতবার তুমি জননী হয়েছ, ততবার আমি পিতা/ কত সন্তান জ্বালাল প্রেয়সী, তোমার আমার চিতা...,” তার বিনয়ের মধ্যেও যেন আগুনের ফুলকি চমকে ওঠে।

সুমনের গানের কোথাও একটা বব ডিলানের স্পর্শ পাওয়া যায়। বাংলায় বব ডিলানের গানকে অন্য এক চেনা রূপ দান করেছেন তিনি।

শুধু তা-ই নয়, পাশ্চাত্য ঘরানার সঙ্গীত থেকে ভিন্ন নির্যাস নিয়ে এসে তিনি মিশিয়েছেন বাংলা গানে, এক অন্য রূপ ও গন্ধের মিশেল ঘটে সুমনের গান অনন্য হয়ে রয়েছে, থাকবে আরো হাজার বছর।

‘এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই’ - প্রেমের জটিল তত্ত্বকে এক কাপ চায়ের মাঝে এনে দৈনন্দিন আটপৌরে একটা ছাঁচ দেবার চেষ্টা করেছেন তিনি। আবার বহুদিন পর দেখা হওয়া কোনো বন্ধুকে দেখে আপনার মনে যে অনুভূতি জন্ম নেবে, ঠিক সেটাই সুমন তার গানে বলে দিয়েছেন -

“হঠাৎ রাস্তায়, আপিস অঞ্চলে...হারিয়ে যাওয়া মুখ চমকে দিয়ে বলে,

বন্ধু...কী খবর, বল? কতদিন দেখা হয়নি...!”

সদ্য গিটারশেখা যুবক বন্ধুদের আড্ডায় যখন তখন গেয়ে ওঠে নচিকেতা-অঞ্জন কিংবা সুমনের গান। তারা কখনো পুরনো বা বুড়ো হয়ে যান না, তারা চিরযুবা এক চেহারা নিয়ে আমাদের কাছে একটা বন্ধুসুলভ আদলে থেকে যান গানের কলিতে, ভুলে যাওয়া প্রেমের বুলিতে, বন্ধুর সাথে হেসে ওঠাতে।

অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
anindetamonti3@gmail.com