দ্যা ওর্স্ট পার্সন ইন দা ওয়ার্ল্ড: একুশ শতকের দ্বিধাময় জীবনের এক নিখুঁত চিত্রায়ন
সাদমান ফাকিদ | Sunday, 13 February 2022
হোয়াকিম ট্রিয়ার পরিচালিত অস্কার মনোনীত ড্যানিশ চলচ্চিত্র ‘দ্যা ওর্স্ট পার্সন ইন দা ওয়ার্ল্ড’ - এ আমাদের সামনে ফুটে ওঠে একুশ শতকের তথ্য এবং সংস্থানের অতিপ্রাচুর্যের ইউরোপে শিক্ষিত মধ্য বা উচ্চমধ্যবিত্ত জীবনধারার এক রাখঢাকহীন স্বরূপ।
সেই স্বরূপের কেন্দ্রে থাকে জুলি নামের এক তরুণী যার জীবনের কাছে প্রত্যাশা সবসময়ই অজানা, আর তাকে ঘিরে থাকে অনেক মধ্যবয়স্ক নারী বা পুরুষ যারা সবাই-ই যেন জানে সেই প্রত্যাশাগুলো কি হওয়া উচিৎ।
এভাবে নিজেকে খোঁজার সাফল্য-ব্যর্থতায় ব্যক্তি আর পারিপার্শ্বিকের টানাপোড়েনকে চিত্রায়নের মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি আমাদের অনুভব করায় এই উত্তর আধুনিকতার যুগে একজন তরুণ বা তরুণী হিসেবে বেঁচে থাকাটা আদতে কেমন।
এই ছবির জন্য কানের সেরা অভিনেত্রী হওয়া রেনাটা রেন্সভার স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ে চিত্রায়িত জুলিকে আমরা চলচ্চিত্রের শুরুতেই খুঁজে পাই ক্যারিয়ার বেছে নিতে দ্বিধান্বিত অবস্থায়।
ডাক্তারির পড়াশোনা করে সে ক্যারিয়ার গড়তে চায় মনোবিজ্ঞানে, কিছুক্ষণ যেতেই আমরা দেখি মনোবিজ্ঞানের জায়গা নিয়েছে ফটোগ্রাফি।
তবে সঙ্গী বেছে নেয়ায় সে এর থেকেও বেশি দোদুল্যমান। একের পর এক সঙ্গী বদলের পর একসময় এই অস্থিরসংকল্প জুলি স্থিতু হয় চল্লিশের আশপাশের বয়সী অ্যান্ডার্স ড্যানিয়েলসেন অভিনীত চরিত্র অ্যাকসেলের সাথে। তাদের মাঝে সংযোগটা বেশ, সম্পর্কের রসায়নও বেশ শক্ত।
জুলি সত্যিকার অর্থেই অ্যাকসেলকে ভালোবাসতে শুরু করে যখন অ্যাকসেল বয়সের পার্থক্যের জন্য সম্পর্কে বিচ্ছেদ চায়। সম্পর্ক তখন আরো বেশি দৃঢ় হয়ে ওঠে।
তবু সে সম্পর্কে থাকে মতভেদ, অ্যাকসেল মধ্যবয়সে এসে সন্তান চায়, তরুণী জুলি তা চায় না। তাদের বয়সের পার্থক্য যে দুজনকে জীবনের দু’পর্যায়ে এনে রেখেছে তা তাদের সামনে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে ধরা পড়ে ধীরে ধীরে। একসময় জুলির জীবনে বৈদ্যুতিক শকের মতো কাঁপুনি ধরিয়ে আবির্ভাব হয় সমবয়সী আইভিন্দের। এভাবে এগোতে থাকে গল্প।
তবে সে গল্পে শুধু এই যাপিত জীবনের প্রেম ভালোবাসাই থাকে না। রোমান্স শুধু এই গল্পের মোড়কমাত্র। মোড়কের নিচে জলবায়ু পরিবর্তন বা ক্যান্সেল কালচারের মত হালের টপিকের পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে যুগের পরিবর্তনে মানুষের ব্যক্তিজীবনের স্বাধীনতার বিবর্তনকে বিশ্লেষণ, কী করেনি এই ছবিটি!
আর এসবকিছুর মাঝেই হাস্যরসকে স্থান দিতে ভুলেননি পরিচালক হোয়াকিম ট্রিয়ার। ছবিটিতে হাস্যরসাত্মক দৃশ্যের অভাব ছিলো না, প্রতিটি আবেগঘন বা বিচক্ষণ দৃশ্যের বিপরীতেই ছিল কোনো না কোনো কৌতুকপ্রদ দৃশ্য।
মানুষের নিজের সাথে নিজের করা প্রতারণা আর মিথ্যাচার যে তৃতীয় দৃষ্টি থেকে কতটা হাস্যকর তা-ই হোয়াকিম ট্রিয়ারের পরিচালনা এবং তার আর এস্কিল ভটের যুগ্ম লেখনীতে ফুটে উঠেছে দর্শকের সামনে।
ছবির পরিচালনা এবং সিনেমাটোগ্রাফি নতুনত্বে ভরপুর। পুরো গল্পটিকে সাজানো হয়েছে একটি উপন্যাসের মতো প্রলগ, এপিলগ এবং বারোটি অধ্যায়ে।
সেখানে কখনো নতুন প্রেমের তীব্রতাকে বোঝাতে প্রেমিক-প্রেমিকা বাদে চরিত্ররা মূর্তির মতো অসাড় হয়ে যায়, কখনো মাদকাচ্ছন্ন হ্যালুসিনেশন দেখাতে পরিচালক আশ্রয় নেন অ্যানিমেশনের।
ছবিটিতে মিউজিকের ব্যবহারও বেশ নির্ভীক এবং বৈচিত্র্যময়। যখন প্রয়োজন ক্ল্যাসিকাল, যখন প্রয়োজন পপ, যখন প্রয়োজন রক – ছবিটির মিউজিক যেন কোনো একুশ শতকের তরুণের স্পটিফাই প্লেলিস্ট।
যে গল্পটি অন্য কোনো হাতে নিতান্ত রোমান্সের গল্প হতে পারত সে গল্পই অসলো ট্রিলজির পরিচালক হোয়াকিম ট্রিয়ারের সপ্রতিভ হাতে হয়ে দাঁড়িয়েছে বিচক্ষণ এক জীবন উপাখ্যান, আর কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেনাটা রেন্সভার সাবলীল অভিনয় একে দিয়েছে অনন্য মোহনীয়তা।
এদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণ সম্প্রদায় ছবিটি দ্বারা অনুরণিত হতে বাধ্য, কারণ গল্পটি প্রকৃতপক্ষে তাদের জীবনেরই পশ্চিমা রূপ।
sadman.fakid69@gmail.com