দূর করুন ডেডলাইনের ভয়
মোঃ ইমরান খান | Sunday, 23 May 2021
প্রতিদিন আমাদের সবারই নানা ধরনের কাজ থাকে। এই কাজগুলো কখনো সম্পূর্ণ হতে অনেক সময় লাগে, কখনো বা খুব সহজে, অল্প সময়ে হয়ে যায়। তবে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ জমা দেওয়া অনেক সময় আমাদের জন্য ভীতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন করা খুবই প্রয়োজন। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন করতে না পারলে নিজের সুনাম ক্ষুন্ন হয়। এছাড়াও এর ফলে লোকে আপনাকে পরবর্তী সময়ে আর কাজ দিতে চাইবে না। আজকের লেখায় আমরা কিছু পদ্ধতি জানব, যা অনুসরণ করলে ডেডলাইন খুব সহজে রক্ষা করা যাবে।
গুরুত্ব অনুসারে কাজ সাজানো
প্রতিদিনের বিভিন্ন কাজের সময়সীমা নির্দিষ্ট করা, তাই নির্দিষ্ট সময়ে কাজ জমা দেওয়ার জন্য কাজগুলোর একটি তালিকা প্রথমে করে নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে গুরুত্ব অনুসারে তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। প্রথমে অধিকতর গুরুত্বসম্পন্ন ও জটিল কাজগুলোকে স্থান দিতে পারি, তারপর তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো। এক্ষেত্রে আরেকটি পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়; ডেডলাইন অনুসারে সাজানো। অর্থাৎ যে কাজটি আপনার আগে জমা দিতে হবে, সেটি তালিকায় প্রথম স্থানে রাখা। এভাবে ক্রমান্বয়ে কাজের গুরুত্ব ও ডেডলাইন অনুসারে তালিকা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
তিনদিনে এক সপ্তাহ
আমরা চাইলে সাতদিনের সপ্তাহকে তিনদিনে নিয়ে আসতে পারি। যেমন, পূর্বে নির্মিত তালিকা অনুসারে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সপ্তাহে সোমবার, মঙ্গলবার ও বুধবারে করার জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারে। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আপনি এই তিনটি দিনে করতে পারেন। এতে করে বাকি চারদিন রয়ে যাবে কোনো অপ্রত্যাশিত বা অপরিকল্পিত ঘটনার জন্য। এছাড়াও পুনর্মূল্যায়ন এবং ছাঁটাই-বাছাইয়ের জন্য সপ্তাহের বাকি দিনগুলো ব্যবহার করতে পারেন। এতে করে আপনার ডেডলাইন অতিক্রম হবার সুযোগ অনেকাংশে কমে যাবে।
ডেডলাইন সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি
আমাদের ডেডলাইন যদি আমরা বাদে আর কেউ না জানে, এতে করে বারবার ডেডলাইন অতিক্রম হবার আশঙ্কা থেকে যায়। তাই আমরা যদি কোনো কাজ করার আগে সেই কাজটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে করার কথা বলে সবার সামনে ঘোষণা দিই বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই, ডেডলাইন অতিক্রম হবার সম্ভাবনা কমে যায়।
নিজেকে উপহার দেয়া
যেহেতু আমরা আগেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ করার জন্য একটি তালিকা প্রণয়ন করেছি, তাই উক্ত সময়ের ভেতর কোনো কাজ শেষ করতে পারলে নিজেকে নিজে উপহার দেওয়া উচিত। এটি হতে পারে কিছু সময়ের জন্য পছন্দের কোনো কাজ করা; যেমন- চকলেট খাওয়া বা সিনেমা দেখা, পছন্দের বইয়ের কোনো অধ্যায় পড়া বা টিভি সিরিজের একটি এপিসোড দেখা ইত্যাদি।
উপহারের ব্যবস্থা থাকলে পরবর্তী সময়ে কাজ করার জন্য অনুপ্রেরণা জন্মে। কেননা শুধু কাজের পর কাজ করতে থাকলে মানুষের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে অবশ হয়ে পড়ে। তার কাজ করার জন্য আর প্রেষণা কাজ করে না।
নিয়মিত বিরতিতে কাজ করা
ডেডলাইনের আগে সমস্ত কাজ একবারে নিয়ে বসলে কাজের ফলাফল ভালো হয় না। এতে সবকিছু অগোছালো হয়ে পড়ে। এর প্রতিফলন আপনার কাজে দেখা যাবে। একটানা কাজের মনোযোগ ধরে রাখা বেশ কঠিন। তাই একটানা কাজ না করে অল্প বিরতি নিয়ে একটু পরপর কাজ করলে ফলাফল অধিকতর ভালো হয়। এটিকে বলা হয় পোমোডোরো পদ্ধতি।
এ পদ্ধতি অনুসরণ করার জন্য কিছু টাইমার অ্যাপ রয়েছে। আপনার মুঠোফোনের স্টপওয়াচ অ্যাপটির মাধ্যমে এ পদ্ধতিটি অনুসরণ করতে পারেন। এর ফলে যেকোনো কাজ আপনি টানা ২৫-৩০ মিনিট করে ৫-৭ মিনিটের একটি বিরতি নেবেন। বিরতির পরে পুনরায় শুরু করবেন ফলে কাজটি ডেডলাইনের পূর্বে শেষ হয়ে যাবে।
উপরে বর্ণিত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করলে ডেডলাইন অতিক্রম হবার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। কিন্তু, তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, কাজটি কীভাবে শুরু করব? যেকোনো কাজ জমা দেবার পূর্বশর্ত অবশ্যই আগে কাজটি শুরু করা। তাই সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক, কাজ শুরুর কিছু উপায়।
মনোযোগে বিঘ্ন নয়
নির্দিষ্ট সময়ে কাজ জমা দেওয়ার জন্য মনোযোগে বিঘ্ন ঘটায় এমন বস্তু বা কাজ পরিহার করা প্রয়োজন। প্রথমেই যা কিছু আপনার কাজটি সম্পূর্ণ করতে বাধা দিচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং তা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। হতে পারে সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বা ইউটিউবে ভিডিও দেখা। এটি আপনার কাঙ্খিত কাজটি শুরু করার পাশাপাশি কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করবে।
উপযুক্ত স্থান বাছাই
কাজ শুরু করার পূর্বে কাজটি করার জন্য উপযুক্ত স্থান তৈরি করে নেয়া খুব প্রয়োজন। কাজের পরিবেশ এর ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলে। অনুকূল পরিবেশে কাজটি করার জন্য আগ্রহ জন্মায়। একসাথে অনেকগুলো কাজ চোখের সামনে থাকলে আপনি স্থির করতে পারবেন না, কোন কাজটি রেখে কোনটি করবেন। ফলে একসাথে অনেকগুলো ডেডলাইনের চিন্তা আপনার মাঝে চলে আসতে পারে, যার বিরূপ প্রভাব কাজের মধ্যে পড়বে। তাই কাজ ভেদে নিজেকে আলাদা করে নেওয়া প্রয়োজন। এতে করে একটি নির্দিষ্ট কাজ শুরু করতে সহজ হয়।
কাজের উপকরণ গুছিয়ে নেওয়া
উপযুক্ত স্থান বাছাই করে উক্ত কাজের সাথে জড়িত যাবতীয় কিছু সে স্থানে গুছিয়ে রাখা উচিত। যেমন, পত্রিকা, নানান ধরনের বই, তথ্য-উপকরণ ইত্যাদি। এই উপকরণগুলো গুছিয়ে আপনি একটি টেবিলে রাখতে পারেন। এতে করে ওই কাজের সাথে জড়িত যাবতীয় কিছু আপনার চোখের সামনে থাকবে। আপনি যখনই টেবিলের সামনে দিয়ে যাবেন, তখনই কাজটি করার জন্য তাগিদ তৈরি হবে।
তাছাড়া কম্পিউটারের ফোল্ডার তৈরি করে বা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করেও নিজেকে কাজে আগ্রহী করে তোলা যায়। এগুলোতে আপনার কাজের সাথে প্রাসঙ্গিক তথ্য, লিঙ্ক, গ্রাফ, চার্ট ছবিসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট সাজিয়ে রাখতে পারেন, যা এক ক্লিকে আপনার সামনে উপস্থিত হবে। আর কাজের সমস্ত উপকরণ সাজিয়ে রাখলে সেগুলো দেখামাত্রই কাজটি শুরু করার পাশাপাশি সম্পন্ন করা আপনার জন্য সহজ হবে।
ডেডলাইনের ভয় ও দুশ্চিন্তা কখনোই আপনার পেশাদার জীবনে ভালো ফলাফল তৈরি করে না। এ ভয় বা কাজটি শেষ সময় আপনাকে করতে বাধ্য করলেও অনেকসময় ডেডলাইন অতিক্রম হবার কারণ হয়ে থাকে। আর কাজের মান নিয়েও থেকে যায় সংশয়। তাই ভয় না পেয়ে উপরিউক্ত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করুন, উপভোগ করুন আপনার কাজ।
মোঃ ইমরান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
mohd.imranasifkhan@gmail.com