logo

দুর্বলতাকে ছাপিয়ে, যাই এগিয়ে

মোঃ ইমরান খান | Tuesday, 13 July 2021


আমরা কেউই সবকিছুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ নই। নিজেদের সম্পর্কে অনেক কিছুই আছে, যা আমরা জানি না। এই না জানার তালিকায় যেমন কিছু শক্তি-সামর্থ্য থাকে, ঠিক তেমনি থাকে কিছু দুর্বলতা। এই দুর্বলতাগুলো সম্পর্কে অবগত না থাকলে আমরা বিভিন্ন কাজে আশানুরূপ ফল পাই না। আবার কেউ কেউ দুর্বল দিকগুলো সম্পর্কে জানলেও কীভাবে তা নিজের শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়, তা জানেন না।

আজকের এ লেখায় আলোচনা হবে, নিজেদের দুর্বল দিককে কীভাবে নিজের শক্তিতে পরিণত করা যায়, এই নিয়ে।

১. নিজের দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন হন

দুর্বলতাকে শক্তিতে পরিণত করার সর্বপ্রথম শর্ত হলো নিজের সম্পর্কে জানা। নিজের সবল ও দুর্বল দিকের নিরিখ করে নেয়া। তাই নিজের ব্যবহারের দিকগুলো সম্পর্কে বন্ধু-বান্ধব কিংবা ঘনিষ্ঠ কারো সাথে আলোচনা করে এর সম্পর্কে অবহিত হওয়া প্রয়োজন।

একইভাবে সবল দিকগুলোও চিহ্নিত করে নেয়া উচিত। এতে করে দুর্বলতা মোকাবেলা করা অনেকটা সহজ হয়ে যায়। যা আপনার শক্তি, তার উপযুক্ত ব্যবহার করলে জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই সফলতা পাওয়া যায়।

তাই নিজেকে নিয়ে ভাবুন। ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি, আপনার বন্ধু অথবা নির্ভরযোগ্য এমন কেউ যে সরাসরি আপনাকে আপনার সবল ও দুর্বল দিক বলে দিতে পারবে, তার সাথে আলোচনা করুন।

এমন হতে পারে যে, আপনি সমালোচনা নিতে পারেন না। তাহলে ধরে নেবেন এটাই আপনার অন্যতম দুর্বল দিক। এরকম হলে নিজের যেকোনো কাজের ফলাফলের দিকে লক্ষ রাখুন, ফলাফল ভালো-মন্দ যেমনই হোক, বিশ্লেষণ করুন। সহিষ্ণু হবার জন্য ভালো বই পড়ুন এবং ভাবুন। এভাবেই আপনি নিজের দুর্বল দিক সম্পর্কে জানবেন।

২. লক্ষ্য অর্জনে বাধাদায়ী দিকগুলো চিহ্নিত করুন

আপনার লক্ষ্য অর্জনে বাধা দিচ্ছে এমন কোনো বৈশিষ্ট্যকে আপনার দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করুন। এটি বের করা সহজ। যেমন, উপরের উদাহরণে আপনি সমালোচনা নিতে পারছেন না, ভিন্ন মত গ্রহণ করতে পারছেন না। এটি একটি আচরণগত দুর্বলতা। এখন যদি আপনার লক্ষ্য হয় ভালো মানের লেখক হওয়া, কোনো গায়ক কিংবা কোনো সঙ্গীতশিল্পী- তাহলে আপনি আপনার পূর্বে করা কাজ এবং সমসাময়িক অন্যদের করা কাজ নিয়ে বিশ্লেষণ করুন। সহজেই বুঝতে পারবেন, কেন আপনি এখনো আগের অবস্থানে থমকে আছেন।

সমালোচনাধর্মী ভিন্ন মত আপনার দলীয় কাজে সফলতা বয়ে আনবে। তাই নিজের লক্ষ্যকে সামনে রেখে দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করুন।

৩. অন্যের সাহায্য নিন

দুর্বলতা নিয়ে জানা হয়ে গেলে সেগুলো নিয়ে কাজ করতে শুরু করুন। কীভাবে দুর্বলতাকে কাটিয়ে ওঠা যায়, কীভাবে দুর্বলতাকে শক্তি-সামর্থ্যে পরিণত করা যায়, তা ভাবুন।

অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি, আপনার কোনো প্রিয়জন এক্ষেত্রে আপনাকে সহায়তা করতে পারে। আপনার পরিচিতদের মাঝে অনেককেই দেখবেন, যারা আগে আপনার মতোই নিজেদের কোনো না কোনো দুর্বল দিক নিয়ে সমস্যায় ছিল। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে সাহায্য নিতে পারেন। আপনার দুর্বলতা সম্পর্কে হীনমন্যতায় না ভুগে তা নিয়ে প্রকাশ্যে তাদের সাথে কথা বলুন। তাদের উপদেশগুলো যাচাই-বাছাই করে নিজের প্রাত্যহিক জীবনে প্রয়োগ করতে পারেন।

হয়তো আপনি প্রচণ্ড অন্তর্মুখী। আর এজন্য অনেকেই আপনার সম্পর্কে ভুল ধারণা রাখে এবং আপনার কাজে এই স্বভাবটা নেতিবাচক প্রভাব রাখে। সেক্ষেত্রে আপনি যাদের সাথে কথা বলে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাদের সহায়তা নিতে পারেন। তাদের সাথে আপনার পছন্দের বিষয় নিয়ে একটু একটু কথা বলা শুরু করতে পারেন। দেখা যাবে, একদিন আপনি বেশ খোলামেলাভাবেই যেকোনো বিষয়ে আলোচনা করতে পারছেন।

৪. দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করুন

ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়- কথাটি সত্য। তবে ইচ্ছার পাশাপাশি চেষ্টাও থাকা প্রয়োজন। ইচ্ছা এবং ইচ্ছাপূরণের চেষ্টা আপনাকে সফলতা দিতে পারে। বড় বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার অদম্য ইচ্ছা থাকলেও শুধুমাত্র দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় কমতির জন্যই সেগুলো আর করা হয়ে ওঠে না।

আপনাকে অনেকেই হয়তো নেতিবাচক কথা বলবে, দুর্বলতার জন্য সফল হতে পারবেন না, এরকম কথাও বলবে। কিন্তু লক্ষ্যে অটল থেকে চেষ্টা করলে আপনি সেটিও মোকাবেলা করতে পারবেন।

দুর্বলতা কাটিয়ে সফল হওয়ার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। পাকিস্তানের একমাত্র বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক, ইমরান খানের সাথে অনেকেই হয়তো পরিচিত। তিনি যখন বোলিং শুরু করেন, তখন তার বোলের গতি ছিল ঘণ্টায় ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার, যা নিম্ন-মধ্যম গতি বলা যায়। তিনি সবসময় ফাস্ট বোলার হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফাস্ট বোলার হবার অন্তরায় ছিল তার বোলিং অ্যাকশন (যেভাবে একজন বোলার বোল ছোঁড়েন)। তার কোচ এবং সতীর্থরা বলতেন, তিনি অ্যাকশন পরিবর্তন করলে আর কখনো খেলতে পারবেন না। ইমরান তাদের কথায় মনোযোগ না দিয়ে দিন-রাত কাজ করে গেলেন তার বোলিং অ্যাকশন পরিবর্তনের জন্য। ফলাফল হিসেবে একদিন তিনি দ্রুততম বোলারদের প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ঘণ্টায় ১৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার গতিতেও বোলিং করতে সক্ষম হন এবং ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে পরিগণিত হন।

৫. আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলুন

দুর্বলতা ছাপিয়ে যেতে হলে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, এমন বই পড়তে পারেন। যেসকল কাজ আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, সেগুলোতে অংশগ্রহণ করতে পারেন। নিজের জন্যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করুন। ভালো মানুষের সংস্পর্শে থাকার চেষ্টা করুন, যারা আপনাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করে।

সবাই সবকিছু পারে না এবং এটাই বাস্তবতা। তাই যা কিছুতে আপনি ভালো, তা চালিয়ে যেতে পারেন এবং যে সকল ক্ষেত্রে দুর্বল, তা ধীরে ধীরে পরিবর্তন করুন। সময় নিয়ে কাজ করতে পারেন। নিজেকে নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হন। আপনি পারবেন, এই বিশ্বাসটি নিজের মধ্যে ধারণ করুন।

৬. দুর্বলতার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখুন

দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে দৃশ্যপটও বদলে যায়। আপনার যে বৈশিষ্ট্যগুলো আপনার কাছে দুর্বল মনে হয় এবং যা আপনার কাজের উন্নতির সাথে জড়িত নয়, বরং সমাজের দৃষ্টিতে দুর্বল- সেগুলো নিয়ে চিন্তিত হবেন না।

লোকে বলবে আপনি অবাস্তববাদী; কিন্তু নিজেকে ভাবুন- আপনি স্বপ্নদ্রষ্টা। লোকে বলবে, আপনি অগোছালো; নিজেকে দেখুন- আপনি সৃজনশীল। লোকে বলবে, আপনি জেদি; নিজেকে ভাবুন, আপনি অধ্যবসায়ী। লোকে বলবে, আপনি শিশুসুলভ; নিজেকে দেখুন আপনি আনন্দপ্রেমী।

কেননা শিল্পী আনন্দ বকশি তার গানে বলেছেন, "কিছু তো লোক বলবেই, লোকের কাজই বলা"। তাই নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক রেখে যা আপনার লক্ষ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা পরিবর্তন করতে পারেন।

৭. বিশ্লেষণ করুন

যেকোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে বিশ্লেষণধর্মী হওয়া উচিত। বিশ্লেষণাত্মক মনোভাবে দিয়ে নিজের কাজগুলো যাচাই করা যায়। এটি দুর্বল ও সবল দিকগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

এতে করে নিজের অবস্থান সম্পর্কে আপনি আরো সচেতন হতে পারবেন। ফলে আর কী কী করলে অবস্থার উন্নতি হতে পারে, সেটি বিবেচনায় নিয়ে কাজে এগিয়ে যেতে পারবেন।

৮. অপরকে সহায়তা করুন

আপনার আশেপাশে অনেকেই থাকবেন, যাদের আপনার মতোই সমস্যা হরহামেশা মোকাবেলা করতে হয়। হয়তো কেউ অন্তর্মুখী, কারো ধৈর্য কম, কারো রাগ বেশি। আপনি তাদেরকে এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করতে পারেন। যেভাবে নিজের দুর্বলতাকে শক্তি-সামর্থ্য পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, ঠিক তেমনি বাকিদেরও সাহায্য করতে পারেন। দলীয় কোনো কাজে দলের অন্য সদস্যদের এভাবে সহযোগিতা করে উপযুক্ত ফলাফল বয়ে আনতে পারেন।

কোনো মানুষই দুর্বল নয়, বরং প্রতিটি মানুষেরই থাকে নিজস্ব শক্তি-সামর্থ্য। তবে লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের প্রতিনিয়ত অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়। তাই নিজের শক্তি-সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আমরা আমাদের যেকোনো দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারি।

মোঃ ইমরান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

mohd.imranasifkhan@gmail.com