থ্রিফটিং ও বাংলাদেশ
সুরাইয়া ফাতিমা | Wednesday, 6 July 2022
বর্তমান সময়ে কেনাকাটা করার বেশ আলোচিত এবং জনপ্রিয় একটি মাধ্যম হচ্ছে থ্রিফটিং। থ্রিফটিং দোকানগুলোতে মূলত সেকেন্ড হ্যান্ড বা ব্যবহার হয়ে যাওয়া পোশাক এবং অন্যান্য জিনিসপত্র কেনাবেচা করা হয় যেন সাধ্যের মধ্যে সবাই কেনাকাটা করতে পারে। এখনকার সময়ে যার বিচরণ আরও বেশি।
থ্রিফটিং শুধু সাশ্রয়ী বলে নয়, তৈরি পোশাক শিল্পে অপচয় রোধে এর পুনর্ব্যবহার একে পরিবেশবান্ধব একটি প্রক্রিয়া হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলেছে বিশ্বব্যপী।
থ্রিফটিং এর প্রচলন শুরু হয়েছে সেই শিল্পযুগের বিকাশের আমল থেকেই। শিল্পায়নের ক্রমবিকাশের সাথে সাথে দ্রব্যমূল্যের দাম ও বাড়তে থাকে। এর কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষের আর্থিক অনটনের মুখে পড়তে হয়। এই সময় থেকেই থ্রিফটিং চালু হয় যেন এই বঞ্চিত মানুষগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কিনতে পারে। এই থ্রিফটিং থেকে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করা হয় তার সবটাই দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে দান করে দেওয়া হয়।
যেহেতু থ্রিফটিং এ সেকেন্ড হ্যান্ড পোশাক বেচাকেনা করা হয় সেহেতু পরিচ্ছন্নতার একটা প্রশ্ন থাকে। আদতে থ্রিফটি শপ থেকে কেনা পোশাক ব্যবহার করা যায় কি না তা নিয়েও দ্বিধায় থাকেন অনেকে।
তবে থ্রিফটিং স্বাস্থ্যসম্মত এবং পরিচ্ছন্নও বটে। থ্রিফটিং এর আগে পোশাকগুলোকে মানসম্মত উপায়ে পরিষ্কার করা হয় এবং ব্যবহারের আগেও আরেকবার পরিষ্কার করে নেওয়া হয়, স্টিমিং প্রক্রিয়ার ব্যবহার হয় এক্ষেত্রে বেশি।
থ্রিফটিং এর জনপ্রিয়তা ছুয়েছে বাংলাদেশকেও। থ্রিফটিং ট্রেন্ডে যদিও বাংলাদেশ নতুন, খুব বেশিদিন হয়নি বাংলাদেশের এই ক্ষেত্রে কাজ করার। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে থ্রিফটিং ট্রেন্ড। এই ট্রেন্ড জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হিসাবে বলা যায় মানুষের মধ্যে এখন তাদের নিজস্ব ফ্যাশনের একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। নিজেকে নিজের মতো করে প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছে। পছন্দের কোনো ব্রান্ডের পণ্য তারা সুলভ মূল্যে অর্জন করতে পারছে।
বাইরের দেশগুলোতে থ্রিফটিং এর জন্য আলাদা দোকান এবং মার্কেট আছে। সেখানে যেকোন একটা দিনে মার্কেট বসবে এবং সবাই সেখানে গিয়ে কেনাকাটা করবে, অনেকটা গ্রামবাংলার হাটবারের মতো। যেমন আমেরিকার সবথেকে বড় থ্রিফট মার্কেট হলো কমিউনিটি থ্রিফট স্টোর এন্ড ডোনেশন সেন্টার ইন সেলিংসগ্রোভ। এছাড়াও অনলাইন শপগুলো তো আছেই। থ্রিফটিং এর পালে নতুন রুপে হাওয়া এসে লেগেছে একবিংশ শতাব্দীতে, এই প্রযুক্তির সময়ে। যার ধরন হিসাবে দেখা যায় অনলাইন মার্কেটগুলোকে।
থ্রিফটিং এ অর্থ বাচানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে এর প্রসারতার সুযোগ ও রয়েছে। কেননা বর্তমানে মানুষ থ্রিফটিং এর প্রতি ঝুঁকছে, তরুণদের মাঝে এর জনপ্রিয়তা আরো বেশি।
কোনো কিছু কেনার দরকার হলে বেশিরভাগ মানুষের প্রথম পছন্দ হচ্ছে এখন থ্রিফটিং শপগুলো। বাংলাদেশে জনপ্রিয় থ্রিফট স্টোরগুলোর মধ্য অন্যতম হলো বাংলাদেশ থ্রিফট, ঢাকা ভিন্টেজ, কালারস ঢাকা, পপ ট্যাগস টুডে, পেট রক ভিন্টেজ, ভিন্টেজ বেবি বিডি, লাক্স ভিন্টেজ ইত্যাদি। এসব অনলাইন দোকানগুলোতে সুলভ মূল্যে কোয়ালিটি সম্পন্ন এবং পছন্দসয় পোশাক পাওয়া সম্ভব।
জনপ্রিয় থ্রিফট শপ বাংলাদেশ থ্রিফট এর পথচলা শুরু হয় ২০২০ সালের ৬ ডিসেম্বর। তাদের থ্রিফটিং আইটেম হলো সেকেন্ড হ্যান্ড পোশাক। বাংলাদেশ থ্রিফট এর অন্যতম প্রতিষ্ঠতা, সুনাইরা শুভা পুষ্পিতা, তার কাজ শুরু করে ১৭ বছরর বয়সে। তার পকেট মানির জন্য প্রথমে তিনি এই কাজ শুরু করেন কিন্তু কিছু সময় কাজ করার পর তার মনে হয় থ্রিফটিং স্লো ফ্যাশনগুলোর জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম এবং তিনি এই বিষয়ে আরো বেশি জানতে শুরু করেন।
বাংলাদেশ থ্রিফট অনলাইনের মাধ্যমেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। বর্তমানে সমাজে যে অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, থ্রিফটিং এর মাধ্যমে সেসব সমস্যাগুলো অনেকখানি এড়ানো সম্ভব এবং তারা এই লক্ষ্যেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সেকেন্ড হ্যান্ড বেচাকানার এই স্টাইলের মাধ্যমে তারা স্লো ফ্যাশনের ভালো দিকগুলো তুলে ধরতে চায়। তাদের পেজের মূল আকর্ষণ তরুণ প্রজন্মের পছন্দনীয় রেট্রো ধারার ফ্যাশন।
এই অনলাইন শপিং স্টোরগুলো ছাড়াও বাংলাদেশের থ্রিফটিং মার্কেটের একটি পরিচিত মুখ হলো নুরজাহান মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেট, নীলক্ষেত, এবং ফুটপাতে বসা ছোট ছোট দোকানগুলো। প্রতিনিয়ত এখান থেকে বিপুল কেনাবেচা করা হয়।
থ্রিফটিং এর মাধ্যমে পোশাকের পাশাপাশি বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে জুতা, সাইকেল, ল্যাপটপসহ অনেককিছুই কেনা সম্ভব। থ্রিফটিং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে বলা যায়।
সুরাইয়া ফাতিমা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।