তালেবান এবং পশ্চিমের মধ্যে যোগাযোগের সেতু এখন কাতার
এফই অনলাইন ডেস্ক | Wednesday, 8 September 2021
তালেবানের হাতে পতন হলো আফগানিস্তানের। আর পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টায় হন্যে বিশ্বশক্তিগুলো এবার দাঁড়াল কাতারের দরজায়। আফগানিস্তানের এই ইসলামী গোষ্ঠী এবং পশ্চিমের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগের ভূমিকায় রয়েছে দোহা।
আফগানিস্তান থেকে শেষ মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার প্রধান কেন্দ্রই হলো কাতার। হাজার হাজার আফগান শরণার্থীদের সরিয়ে আনার ঘাঁটি হয়ে উঠল উপসাগরীয় এ রাষ্ট্র।
কাতার গত কয়েক দশক ধরেই ইসলামপন্থী গোষ্ঠীটির সাথে যোগাযোগ বজায় রাখছে। পশ্চিমের সঙ্গে এ গোষ্ঠীর আলোচনা এবং সমঝোতা প্রয়াসের মধ্যস্থাকারীর ভূমিকা নিতে চাইছে দেশটি। আট বছর আগে মার্কিন মদদেই দোহাতে প্রতিনিধি-দপ্তর খোলে তালেবানরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবানের মধ্যে আলোচনার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে কাতার। সুফল হিসেবে ভূরাজনীতিতে বিশাল ভূমিকায় নামার অবকাশ পেলো কাতার।
লন্ডনের কিংস কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডেভিড রবার্ট কাতারের এ ভূমিকার কথাই তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আফগান সঙ্কট কাতারের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করল -- রাষ্ট্রটি যা করতে চাইছিল এর মাধ্যমে তা বাস্তব হয়ে উঠল।”
তিনি আরো বলেন, “আমি এমন কথা বলতে চাই না যে এক দশক আগেই জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছে কাতার এবং বুঝতে পেরেছে যে তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখলে আফগানিস্তানে দখলদারিত্ব ফুরালে তারই জেরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় নামতে পারবে দোহা। তবে কাতারিরা অনেক আগেই দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছে, তালেবানের ভূমিকা যখন রঙ্গমঞ্চে প্রধান হয়ে ওঠেনি তখন থেকেই তাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের মতো গুরুত্বের কাজটি করেছে।”
তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার স্বার্থে কাবুলের পশ্চিমা দূতাবাসগুলোকে সরিয়ে নেওয়া হলো দোহায়। মার্কিনিরা সরে আসার পর কাবুল বিমানবন্দরে ভবিষ্যৎ তৎপরতা চালানোর বিষয়ে তালেবানের সাথে বহুপক্ষীয় আলোচনা চলছে। এ আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে কাতার। এর আগে, আফগানিস্তান থেকে আমেরিকা হটে আসার পূর্বে, আফগান পক্ষগুলোর সঙ্গে মধ্যস্থতার ভূমিকায়ও ছিল কাতার।
রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইন্সটিটিউট ফর পাবলিক পলিসির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ফেলো ক্রিস্টিয়ান কোয়েটস উলরিচেসেন বলেন, “পশ্চিমা কূটনৈতিক মিশনগুলো দোহাতে সরিয়ে আনায় যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তা হলো, তালেবানের সঙ্গে যে কোনো ধরনের কূটনৈতিক পন্থাই নেওয়া হোক না কেনো তাতে কোনো না কোনোভাবে জড়িত থাকবে কাতার। আলোচনার ব্যবস্থাকারী এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সংলাপ চালু রাখতে ভূমিকা পালন করবে কাতার। কাবুলে কী ধরণের সরকার গঠিত হয় সে দিকে দুনিয়া যখন তাকিয়ে আছে তখনই ঘটছে এসব।”
দোহায় এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোমিনিক রাব কাতারকে তালেবান সঙ্কট নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে “অপরিহার্য” হিসেবে উল্লেখ করেন।
শীতল অবস্থা হতে
তালেবান, ইখওয়ানুল মুসলেমিন বা মুসলিম ব্রাদারহুড এবং তেহরানের সাথে কাতারের যোগাযোগে ক্ষুব্ধ এবং ক্রদ্ধ হয় দেশটির কোনো কোনো পড়শি। ২০১৭ সালে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা রাতারাতি কাতারের গলায় পরিয়ে দেয় বাণিজ্য এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ফাঁস। ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র হলেও কাতার নিয়ে প্রাথমিক দ্বিধা-সংশয়ে দুলেছেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের এ ভূমিকাও সৌদি এবং তার মিত্রদের কাতার বিরোধী তৎপরতায় মদদ যোগায়।
এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের কয়েক দিনের মধ্যেই সৌদি সফরে গেলেন ট্রাম্প। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ সৌদি শীর্ষস্থানীয় কর্তারা তাঁকে স্বাগত জানান। কাতার উগ্রবাদীদের সহায়তা করছে বলে যে অভিযোগ রিয়াদ করেছে তাকে ট্রাম্প সমর্থন করেন বলেই সে সময় ধারণা হলো। তবে দোহা অব্যাহতভাবেই এ অভিযোগকে অস্বীকার করেছে।
মাথাপিছু আয়ের হিসাবে দুনিয়ার অন্যতম ধনী রাষ্ট্রের কাতারেই রয়েছে কাতার। নিজ শক্তিশালী অর্থনৈতিক খুঁটির জোরে এবং বাণিজ্য পথ ঘুরিয়ে দিয়ে নিষেধাজ্ঞার ফাঁস কেটে বেরিয়ে আসে কাতার। সৌদির ‘জানি দুশমন’ তুরস্ক এবং ইরানের দিকে ঘুরিয়ে দেয় নিজ বাণিজ্য পথ। এদিকে ট্রাম্প উপসাগরীয় বিবাদ মেটানোর কাজ করতে থাকেন। মার্কিন এই তৎপরতায় পশ্চিম দেশগুলো একে অন্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেন দায়িত্ব নেওয়ায় সৌদি যুবরাজ তার আগের অবস্থান থেকে পুরো সরে আসার সুযোগ পেয়ে যান। কয়েক মাসব্যাপী আলোচনার পর ফেব্রুয়ারিতে দোহার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় রিয়াদ।
মার্কিন ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য এরিখ সোয়ালওয়েল টুইট বার্তায় বলেন, “আফগানিস্তান থেকে আসা শেষ উড়োজাহাজগুলো কাতারে নেমেছে – কাতারে আসা হাজার হাজার আফগান শরণার্থীদের দলে যোগ দিয়েছে – তখন ভাবুন, উপসাগরীয় ঘাঁটি হিসেবে কাতারকে হারানোর কতো কাছে চলে গিয়েছিল আমেরিকা।” এই টুইটে আরো বলা হয়, “সৌদির চাপানো নিষেধাজ্ঞার সময়ে, ২০১৭ সালে, এই সম্পর্ককে প্রায় বানচাল করেছিল ট্রাম্প। বাইডেন বুদ্ধিমানের মতোই কৌশলগত এ সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিয়েছেন।”
নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ক্ষেত্রে উত্তেজনা হ্রাস পায়। বাইডেন নির্বাচিত হওয়ায় এবং কোভিড বিশ্বমারির বিপর্যয়ের ফলে এর সমাপ্তি ঘটে। ‘জানি দুশমন’ ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে গত কয়েক মাস ধরে আলোচনার সূচনা হয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আস-সানি বলেন, “আমি মনে করে গোটা অঞ্চলের গতিশীলতা পাল্টে গেছে। উত্তেজনা হ্রাস, সংবরণ, চুক্তি এবং সংলাপের কথা শোনা যাচ্ছে। আমরা যারা কাতারে বসবাস করি তারা এতে বিশ্বাস করি।”
সাহায্যের হাত
আফগানিস্তান থেকে ৪৩ হাজারের মানুষকে সরিয়ে নিতে সহায়তা করার মধ্য দিয়ে কাতারের ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আফগানিস্তান থেকে সরে আসতে উদ্বিগ্ন ও ব্যাকুল মানুষগুলোকে তালেবানের নিরাপত্তা চৌকিগুলো পার হতে ব্যক্তিগত ভাবে সহায়তা করেছেন কাবুলে নিযুক্ত কাতারের রাষ্ট্রদূত। হাজার হাজার বিপন্ন মানুষকে সহায়তা করার জন্য এভাবে দেশটির ওপর কাতারের প্রভাবকে সরাসরি কাজে লাগান তিনি।
এইসব ভেগে আসা মানুষদের একজন হলেন ২০ বছরের হাসিনা। এই ছাত্রী এখন নিরাপদে দোহায় অবস্থান করছে। হাসিনার পালিয়ে আসার প্রথম চেষ্টা বানচাল হয়ে যায় কাবুল বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে। তাকে সেখান থেকে ফিরিয়ে দেয় তালেবান সদস্যরা। কাতারের রাষ্ট্রদূত পরদিন তাকে সহ তার আরো ছয় সহপাঠীকে নিজে সঙ্গ দিয়ে নিয়ে আসেন। তাদেরকে তালেবানের নিরাপত্তা চৌকিগুলো পার হতে সহায়তা করেন। আফগানিস্তান ছাড়তে মরিয়া মানুষের ঢল নেমেছিল সে সময় কাবুল বিমানবন্দরে। তারা সবাই আফগানিস্তান ত্যাগকারী উড়োজাহাজে ওঠার চেষ্টা করছিল। এই জনতার ঢলের মধ্য দিয়েই ছাত্রীদেরকে ব্যক্তিগত চেষ্টায় নিয়ে আসেন মান্যবর রাষ্ট্রদূত।
হাসিনা বলেন, “মা কখনোই স্কুলের শিক্ষা সফরে আমাকে যেতে দেয়নি – কিন্তু আমি এখন এখানে একা। আমরা যখন কাবুল ছাড়ি মা কান্নাকাটি করছিল তবে একই সাথে আমার নিরাপদে দোহায় পৌঁছাতে পারায় তিনি শোকরগুজারি করছেন।”
ফিরেছে জাতীয় গৌরব
আফগানিস্তানে কাতারের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেশটির রংচটা এবড়ো-থেবড়ো গৌরবকে আবার সদ্য পালিশ করা ঝাঁ চকচকে করে তুলেছে। গত কয়েক বছর ধরেই আন্তর্জাতিক কুৎসা ও গ্লানির তোপের মুখে পড়েছে কাতার। আগামী বছর দেশটিতে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণে নিয়োজিত অভিবাসী শ্রমিকরা কাতারে দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছে। এমন অভিযোগ বারবার শোনা গেছে বেশ জোরশোরেই।
গত মাসেই অ্যামনেস্টি অভিযোগ করে, উপসাগরীয় দেশটিতে প্রচণ্ড গরমে নিরাপত্তহীন পরিবেশে কাজ করতে হয়েছে শ্রমিকদের। শ্রমিক মৃত্যু এবং নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ নিয়ে তদন্ত করতে কাতারি কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। কাতার সরকার এ অভিযোগ নাকচ করে দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, শ্রমিকদের আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনাগুলোর সঙ্গে ‘এই অঞ্চলের জন্য আন্তর্জাতিক সেরা রীতিনীতি মেনে চলার যে প্রচলন রয়েছে এবং নতুন মান নির্ধারণ করা হয়েছে তার সঙ্গতি রয়েছে।’
নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় কাতারের ওপর থেকে চাপ কমেছে এবং মেজাজের পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু কোভিডের বিধিনিষেধে পর্যটন ও ভ্রমণ আটক যাওয়ায় এখনো কাঙ্খিত অর্থনৈতিক সুবিধা মেলেনি। তবে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা বাড়লে এবং করোনা ভাইরাসের বাধানিষেধেরও সমাপ্তি ঘটলে হাইড্রোকার্বন-নির্ভর কাতারের অর্থনীতি গত বছরের মন্দা কাটাতে পারবে বলেই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
কেউ কেউ এ আশাও ব্যক্ত করেন যে, আফগান সংকটকে কেন্দ্র করে কাতার নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিরূপ আখ্যানও পাল্টে যাবে।
কাতারের একজন প্রবীণ অর্থলগ্নিকারী বলেন, “আফগানিস্তানে আমরা দারুণ ভূমিকা পালন করছি এবং শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক কিছু খবরও পাচ্ছি। বিশ্বকাপ ফুটবলের স্থাপনা নির্মাণে নিয়োজিত শ্রমিক থেকে শুরু করে নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত – সত্যিই কাতারের একটা খারাপ ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। সে সময়ে সবাই ভেবেছে কাতারিরা সন্ত্রাসী।”
গ্রীষ্মের দাবদাহ এড়াতে বিশ্বকাপ ফুটবল ডিসেম্বর ২০২২ এ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্বকাপ নিয়ে কাতারকে আরো যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হয়তো হতে হবে। কিন্তু উলরিচসেন বলেন, “আফগানিস্তান থেকে মানুষদের সরিয়ে আনা এবং মানবিক তৎপরতায় সাড়া দেওয়ায় ২০১৭ সালের অনেক নেতিবাচক ধারণা নাকচ হয়ে যেতে পারে। বিশ্বকাপের পাদপ্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার আগেই কাতার অর্জন করতে পারে আন্তর্জাতিক শুভেচ্ছা।”
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]