তাঁবুবাসী প্রভাষক এবং ব্রিটেনের উচ্চশিক্ষার জগত
সৈয়দ মূসা রেজা | Tuesday, 2 November 2021
১৯৮০-এর দশকে ভিনদেশী একটি বাংলা সাময়িকীর প্রথম পাতার সম্পাদকীয় শিরোনাম ছিল ‘উচ্চশিক্ষার জন্য মায়েরা পথে বসেছেন।’ সাথের ছবিতে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের সামনে রাস্তার পাশে চাটাই পেতে বসে আছেন মায়েদের দল। খরচ বাঁচাতে সন্তানকে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেওয়ার পর আর ঘরে ফিরে যান না। এভাবেই মায়েরা বসে থাকেন ছুটির পর সন্তানকে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। এ দৃশ্য এখন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়ও দেখা যায়।
এবারে কাহিনীর অন্যদিকে নজর দেওয়া যাক। বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা দিচ্ছেন যে শিক্ষক তিনি কীভাবে জীবনযাপন করেন? এবারে সেই কাহিনীই তুলে ধরেছে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান।
অনেক পিএইচডি ছাত্রের মতোই অ্যামি লি'রও চাকরিটা একান্তই দরকার। ইংরেজির প্রভাষক হিসেবে ঘণ্টা ধরে বেতন দেওয়া হয় তাঁকে। নিজের পড়ালেখার জন্যেই এ চাকরি টিকিয়ে রাখা তাঁর দরকার। টাকার জন্যেই লি চাকরি করেন এটা সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু তার ছাত্র-ছাত্রীরা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি যে দু’বছর ধরে শিক্ষাদানকারী অ্যামি লি বসবাস করছেন তাঁবুতে। পিএইচডি করার তৃতীয় বছরে এসে লি-কে বাইরে থাকার পথ বেছে নিতে বাধ্য হতে হয়। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন খ্যাতনামা রয়েল হলোওয়ের ছাত্রী লি বাস্তবের সঙ্গে টক্কর খেলেন। গবেষণা এবং শিক্ষাদান করে যে কয়টা টাকা হাতে আসে তা দিয়ে ঘর ভাড়ায় দেওয়া হলে পাকঘরের হয়তো আর দরকারই থাকবে না!
তিনি বলেন, “একজন থাকার মতো তাঁবু। ভেতরে ঢুকলে ঠাণ্ডা লাগে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁবুর উষ্ণতা বাড়ে। কিন্তু ঘুম ভেঙ্গে অনেক সময়ই দেখতে পেয়েছি, তুষারের বৃত্তে বাঁধা পড়েছে তাঁবু। পিএইচডি গবেষণা বা অন্য কোনো কাজের অবকাশে আমাকে শিখতে হয়েছে কী করে খড়ি কাটতে, বানাতে বা আগুন ধরাতে হয়।”
তাঁবুতে বইপত্র নষ্ট হয়ে যেতে পারে তাই সেগুলো লি রাখতেন তাঁর স্নাতকোত্তর দফতরে। তাঁবুতে থাকার কথা মা-বাবাকে জানান নি লি। বরং বলেন, ‘দুঃচিন্তা করার কোনো কারণ নেই। পরিবেশ খামার বা ইকোলজিক্যাল ফার্মে থাকছি।’ তাঁবুবাসের বেশ গালভরা নাম দিলেন লি।
এমনকি নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে জানতে দেননি তার হাল-হকিকত। চলতি সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয় দাবি করেছে, ছাত্রদের কল্যাণই তাদের কাছে সবচেয়ে মুখ্য। কোনো ছাত্র কষ্টে আছে জানতে পারলে তার জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তবে লি-র ভাবনা ভিন্ন। তিনি বলেন, “দুই রকম জীবনযাপন করেছি। কারণ, ভয় ছিল যে থাকার মতো ঘর নেই যদি লোকজন জানতে পারে তবে পেশা জীবনে ক্ষতি হবে।”
লি জানান, ছাত্ররা তাঁর পাঠদানের ভালো পর্যালোচনা করেছে। “হোটেল লবিতে বসে জিসিএসই (সাধারণভাবে ‘ও’ লেভেল হিসেবে পরিচিত) পরীক্ষার ৩০০ খাতা দেখেছি। খুবই মানসম্পন্নভাবে দায়িত্ব পালন করেছি এবং নিজ কাজের প্রতি পুরো মনোযোগ দিয়েছি।”
তবে তিনি এও বলেন, “শিক্ষাদানের কাজে ভালো বেতন পাচ্ছি – ছাত্ররা স্বাভাবিকভাবেই এমনটা হয়তো ভাবে। আসলে সব জায়গায়ই ছাত্ররা এমন কথাই ভাবে। তারা ধরে নেয়: সুন্দর চুক্তির ভিত্তিতে চাকরি করছি, প্রভাষকের দায়িত্ব পালন করছি। ছাত্রদেরকে বলেছি, না তাদের এ ভাবনা মোটেও বাস্তব না। তবে তাঁবুতে থাকি এ কথাটা তাদের কাছে তখন মুখ ফুটে বলতে পারিনি। এ কথা বললে হয়তো ভব্যতার সীমা ছাড়ানো হয়ে যাবে বলেই মনে করেছি।”
রয়াল হলোওয়ে তিন বছরের জন্য লি-কে বছরে ১৬ হাজার পাউন্ড স্টারলিং করে বৃত্তি বরাদ্দ দিয়েছে। মার্কিন সাহিত্যে জাতিগত সংখ্যালঘুর ওপর পিএইচডি করছিলেন লি। মার্কিন নাগরিক লি নিজ দেশ থেকেও বাড়তি বৃত্তি লাভ করেছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ছাত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে নগদ বছরে ৮ হাজার পাউন্ড দিতে হয়েছে তাঁর। যুক্তরাজ্যের ছাত্রদেরকে মোটা অংকের এ টাকা দিতে হয় না। ফলে শিক্ষকতার বেতন এবং ১২ হাজার পাউন্ড হাতে নিয়ে বছর পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। এ কয়টা টাকায় টেনেটুনে প্রথম এক বছর চলতে পারলেও তারপর তার কপাল আগুন লাগে। এ সময় ছাত্রদের জন্য সস্তা ছাত্রাবাসটি মেরামতের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘরভাড়া বাবদ বছরে এ বারে বাড়তি যোগ হয় আরো তিন হাজার পাউন্ড। বাড়তি টাকার সংকুলান করার মতো অবস্থা তার ছিল না। যাই হোক, লেখাপড়া ছাড়া যাবে না- নিজেই নিজের কাছে পণ করেছিল লি। এক বন্ধুর কাছ থেকে একটি তাঁবু ধার নেন তিনি।
তবে প্রথমে ভয় তাকে পেয়ে বসলেও বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বিক্ষোভ শিবির করা হয়েছে দেখতে পান তিনি। ব্যস। ভয় কেটে যায়। নিজের তাঁবু নিয়ে ওখানে হাজির হলেন। একবার শুধু জানতে চান, ওখানে থাকতে পারবো কিনা? এভাবেই পরের দুই বছরের তাঁবুবাসের হাতেখড়ি হলো লির।
বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ ইউনিয়ন (ইউসিইউ) বলছে, পেশা জীবনের ঊর্ধ্ব যাত্রাকে নিশ্চিত করতে যাবতীয় কষ্ট পোহাতেও পিছুপা হন না সেরকম উদ্যমী তরুণ শিক্ষাবিদদের দুর্ভোগ বাড়ছে। অন্যায্য বেতন, অগ্রহণীয় কাজের চাপ এবং সাময়িক চুক্তির বিরুদ্ধে ব্রিটেনের ১৪৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা ধর্মঘট নামবেন কিনা তা নিয়ে মতামত গ্রহণ চলছে। বড়দিনের আগেই এ ধর্মঘট করা হবে বলে কথাবার্তা চলছে।
সকলি গরল ভেল…
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডার গ্রাজুয়েট টিউটোরিয়ালের সুনাম বিশ্বজোড়া। কিন্তু এ মাসে প্রকাশিত গবেষণা পত্রে উঠে এসেছে যে অর্ধেকের বেশি এসব টিউটোরিয়াল দেন সাময়িক চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীরা। ইউসিইউ বলছে, গোটা দেশেই এমন দৃশ্য দেখা যাবে।
ইউনিয়নের গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষাবিদদের মধ্যে মাত্র এক তৃতীয়াংশকে নির্দিষ্ট মেয়াদী চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর ৪১ শতাংশ ঘণ্টা হিসেবে চুক্তিতে নিয়োগ পান। নারী, কালো, এশীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘু (সংক্ষেপে বিএএমই)দের নিয়োগ হয় অনিরাপদভাবে।
রাসেল গ্রুপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘণ্টায় ১৫ পাউন্ড হিসেবে ইতিহাসে পাঠ দিতেন সিয়ান জোন্স (আসল নাম নয়)। একইসাথে পিএইচডিও করছেন। তাকে ছয় মাস এক বন্ধুর বাসায় ‘ফ্লোরিং’ করতে হয়েছে। জোন্সের দৈহিক প্রতিবন্ধকতা আছে এবং অপারেশনের জন্য একমাস কাটানোর পর তার পিএইচডি তহবিল বন্ধ করে দেওয়া হয়। গেরেস্তালি সহিংসতার কারণে এর একমাস পরে তাকে বাড়িও ছাড়তে হয়। জোন্সের না ছিল কোনো সঞ্চয়, না ছিল বাড়ি ভাড়া করার মতো টাকাকড়ি।
খুবই কঠিন সময় গেছে বলে জানান তিনি। “চালচুলা নেই, মাথা গোজার ঠাঁই নেই তারপরও শিক্ষকতা এবং গবেষণা দুই চালিয়েছি। এতো কিছুর ধকল সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত মানসিক রোগ পিডিএসডি’র শিকার হই।”
এক ঘণ্টার দূরত্ব এ রকম দুই প্রতিষ্ঠানে সাময়িক শিক্ষকতা করায় দৌড়ের ওপর থাকতে হয়েছে। তবে এরই ফাঁকে শেষ পর্যন্ত পিএইচডি সাঙ্গ করেন। “হাড়ে এখনো ক্লান্তি লেগে আছে,” বললেন তিনি। “তবে বরাত ভালোদের কাতারেই পড়েছি আমি। তিন বছরের চুক্তির মেয়াদে চাকরি পেয়েছি। আপাতত শ্বাস নেওয়ার মওকা রয়েছে। তবে আর মাত্র আড়াই বছর পরেই আবার চাকরি খোঁজার জন্য নামতে হবে।”
এদিকে, ব্রিটেনে গত পাঁচ বছর ধরে শিক্ষাঙ্গনে নির্দিষ্ট মেয়াদী চুক্তির চাকরি কমছে। এ কথা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ কর্মী সংস্থার প্রধান রাজ জেটওয়ান। তিনি আরো জানান, সাময়িক চুক্তির কর্মীরাই এখন দেশটিতে বেশির ভাগ শিক্ষা দিচ্ছেন।
[দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে]