টিকটিকির টিকটিক আর পেটের ভেতর গাছ: কুসংস্কারের ধূম্রজাল
অনিন্দিতা চৌধুরী | Monday, 27 December 2021
ছোটবেলা থেকে বেশ মজার কিছু কুসংস্কার শুনে এবং অনেকাংশে শুনে বেড়ে ওঠা। আধুনিকতার ধ্বজাধারী হয়ে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার প্রবণতা যতই থাকুক না, এ ক্ষেত্রে এসে যেন চোখ বন্ধ করে ফেলাই হয়েছে বারবার। খেলার ছলে, শিশুদের ভুলিয়ে রাখতে ধীরে ধীরে নিত্যদিনের সাথে বুনে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন কুসংস্কারের বীজ।
এই সিরিজে সমাজের খুব চেনাজানা এমন কিছু কুসংস্কারের ভিত্তিহীনতা, এগুলো ছড়িয়ে পড়ার কারণ এবং ব্যাখ্যা ইত্যাদি নিয়ে আলাপ হবে। সিরিজের প্রথম পর্বে থাকছে-
জোড়া কলা খেলে হবে জোড়া সন্তান
দ্রব্যমূল্যের ঘোড়া অন্য সময়ের চাইতে বর্তমানে একটু বেশিই লাগামহীনভাবে দৌড়ুচ্ছে। বাজারে সবকিছুর দামই তাই এখন ‘একটু’ বেশি। অথচ আপনি যদি জোড়া কলাগুলো কিনতে চান, তবে তা অন্য কলার চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম দামে পেয়ে যাবেন। কিছুদিন আগে এমনই অভিজ্ঞতা হয়েছিল অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী সত্যেন্দ্র কুমার চৌধুরীর। কারণ হিসেবে তিনি জানান, জোড়া কলাগুলো সাধারণত ক্রেতারা নিতে চান না, জোড়া বা যমজ সন্তান হবার ‘ভয়ে’। এ নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই বলে প্রায়ই একটু কম দামে সেসব কলা কিনে নিয়ে আসেন তিনি।
চিরুনি যখন অতিথি আসার সঙ্কেত
হয়তো কাউকে নির্দিষ্ট সময় বলে দেয়া আছে দেখা করবার, কিন্তু তৈরি হওয়া হয়নি এখনো। তাই চেষ্টা চলছে ঘর থেকে যত জলদি সম্ভব বেরোবার। এমতাবস্থায় চুল আঁচড়ানোর সময় হাত থেকে চিরুনি পড়ে যাওয়াটা আসলে খুব স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু এই চিরুনি পড়ে যাওয়ার নাকি রয়েছে আরেক অর্থ, অন্তত এই কুসংস্কারটি মতে, ঘরে অতিথি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলের বীজ খেলে পেটে গাছ হয়
সন্তান লালন-পালন নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অন্যতম কঠিন একটি কাজ। আর সে কাজ করতে গিয়ে বাবা-মা কিংবা অন্যান্য অভিভাবকেরা প্রায়ই আশ্রয় নেন বিভিন্ন ছলাকলার। হতে পারে তা অদৃশ্য কোনো পরী বা দৈত্য বা বিভিন্ন সাবধানতাবাণীর অতিকায় রূপ। সন্তানকে আসন্ন বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে নিজের অজান্তেই কখন যেন তারা বুনে দেন বীজভীতির বীজ।
বড় ফলের বীজ যদিওবা কেউ গিলতে যায় না, তবে আঙুর-বরই-তেঁতুল বা জামের মতো ছোটখাটো ফলের বীজ বের করে ফেলার চাইতেগিলে ফেলাই সহজ মনে হয়। আর তা করতে গিয়ে গলায় আটকে যাবার মতো দুর্ঘটনাও কম হয় না। এ থেকে বাঁচাতে গিয়েই শিশুদের তাই বলে দেয়া হয়, ওই বীজ খেয়ে ফেললে ক’দিন পর তার মাথা দিয়ে গজিয়ে উঠবে গাছ!
তর্ক জেতাবে টিকটিকির অনুমতি?
হয়তো বেশ তুলকালাম তর্ক চলছে। এর মাঝে একজনের বক্তব্য উপস্থাপনের পরপরই দেয়ালের টিকটিকিটি জোরেসোরে ডেকে উঠলো। ব্যস, একটু আগে যিনি কথা বলছিলেন, তিনি যেন নিজের কথার সার্টিফিকেট পেয়ে গেলেন। এর একমাত্র ‘কারণ’বোধহয় টিকটিকির ডাকটি, অর্থাৎ ‘টিক টিক’ধ্বনি। টিকটিকি আমাদের সাথে নিত্যদিন বসবাস করা এক প্রাণী, মনের সুখে বা দুঃখে সে কোনো না কোনো সময় ডাকলে তা আমাদের কানে পৌঁছুবেই। তবে এর সাথে অহেতুক নিজেদের আলাপের সংযোগ স্থাপন করার কোনো মানে নেই।
কালো বেড়াল পথ কাটলে
শুভ-অশুভ, ঠিক-ভুল, সত্য-মিথ্যা; এসব ইতি ও নেতিবাচক শব্দযুগলকে যেন আমরা দুটো রঙের সাথে যুক্ত করে ফেলেছি। সাদা আর কালো। আমাদের মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে গেঁথে গেছে, যা ভালো নয়, তাই কালো। প্রাচীন গ্রিস ও মিশরের ইতিহাস থেকে ক্রমান্বয়ে কালোর এই বদনাম কোনো না কোনোভাবে টিকে রয়েছে এ যুগে এসেও। তাই সাদা বেড়ালকে দেখে যত নিরীহই মনে হোক না কেন, পথ চলার সময় কালো বেড়াল সামনে দিয়ে চলে গেলে মন যেন ‘কু’ ডেকে ওঠে। মনে হয়, কিছু একটা অশুভ ঘটবে।
এই মনে হওয়ার পেছনেও কাজ করছে সেই বহু বছরের কুসংস্কার, যা বুঝিয়েছে কালো রঙটি ঠিক ভালো নয়। এখন কালো বেড়াল পথ কাটলে তা দেখে বিচলিত হয়ে যদি কেউ ম্যানহোলে পড়ে যায় কিংবা ছুটে আসা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে, দোষটা কি আদৌ বেড়াল কিংবা ‘কালো’র হবে?
এ পর্বের কুসংস্কারনামা এ পর্যন্তই। পরের পর্বে কথা হবে আরো কিছু ভিত্তিহীনতার ভিত্তি নিয়ে।
অনিন্দিতা চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী।
anindetamonti3@gmail.com