logo

টাটার উত্থানে ভারতীয় ইতিহাসের প্রতিফলন

বেনজামিন পারকিন | Monday, 30 August 2021


সেটা ১৮৬৮সাল।

ঔপনিবেশিক ভারতের ব্রিটিশ কমান্ডার রবার্ট নেপিয়ার সেসময়ে আরব সাগর অঞ্চলে আবিসিনিয়ার সম্রাটের বিরুদ্ধে লড়ছেন। ভেঙে খান খান করে দিতে চাইছেন আবিসিনিয়ার সাম্রাজ্য। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে নেপিয়ারের বিশালবাহিনী। এ সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে দেশীয় ঠিকাদারদের নিয়োগ দিলেন।

এইসব ঠিকাদার ব্রিটিশবাহিনীর কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করতে থাকে। ফলে পণ্যের দাম চড়াতে  থাকল --দুর্নীতির বিস্তার ঘটায়। ‘খচ্চর থেকে উঠ বা কয়লা পর্যন্ত সব জিনিসপত্রের দাম ’ এভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হলো । বলা যায়, মরা গরুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া শকুনের ঝাঁকের মতোই তারা ছিঁড়ে খেলো নেপিয়ারকে। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সংসদীয় তদন্তের মুখে পড়তে হয় এ  কমান্ডারকে।

ঠিকাদারদের এ দলে নুসারওয়ানজি টাটা নামের পার্সি এক আফিম ব্যবসায়ীও ছিলেন। তারই পরিবার কিভাবে আধুনিক ভারতের টাটা শিল্প গোষ্ঠীকে গড়ে তোলে সে কাহিনীকে নিজ বইয়ের উপজীব্য করেন ঐতিহাসিক মিরসিয়া রাইয়ানু।

রাইয়ানু মনে করেন, ভারতের আধুনিক ইতিহাসের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় নিশ্চিতভাবে রয়েছে টাটা গোষ্ঠী। হংকংয়ের সোয়ার বা দক্ষিণ আফ্রিকায় অ্যাংলো-আমেরিকান বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যগুলোর চেয়েও টাটার ভূমিকা ভারতে অনেক বেশি।

[বইয়ের সূচনাপর্বেই টাটার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক টি. আর. ডুনগাজির বক্তব্য তুলে ধরা হয়। টাটার তৈরি ঘড়ি ব্যবহার করা থেকে শুরু করে টাটার হোটেল বা বিপণন কেন্দ্রে যাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই বিশাল সংস্থার কথা উঠলেই প্রথমে যা আমাদের মনে হয় তা হলো, আস্থা এবং প্রতিশ্রুতি।

অন্যদিকে ভারতে দৈনন্দিন জীবনে টাটার সেবা বা পণ্য ব্যবহারের কথা তুলে ধরেন ভারতের খ্যাতনামা লেখক, মানবাধিকারকর্মী, ভিন্নমতালম্বী অরুন্ধতী রায়। তিনি বলেন, আমরা টাটার নুনই খাচ্ছি। টাটা আমাদের অবরুদ্ধ করে ফেলেছে।

দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হলে ও টাটা যে ভারতীয় আটপৌরে জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে সে কথা দুই প্রান্তের দুই ব্যক্তিত্ব ভিন্ন ভাষায় স্বীকারক রেন। সম্ভবত এটাই টাটার সর্বব্যাপী সফলতার নির্ভুল এবং সেরা চিহ্ন।]

ভারতে ইস্পাতের মতো দেশীয় ভারি শিল্পের সূচনা করেছে টাটা। এছাড়া, চা থেকে প্রযুক্তি পর্যন্ত হরেকরকম ব্যবসায় জড়িয়ে আছে টাটা। ভারতের ঝড়ো রাজনীতির হাল ধরেছে, ঔপনিবেশিক শাসন থেকে সমাজতন্ত্রবাদী বছরগুলো পর্যন্ত টাটার উপস্থিতি বজায় থেকেছে। টাটাগোষ্ঠী ভারতের সবচেয়ে বড় কংগ্লোমারেট বা নানামুখী বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান নিয়ে গড়ে ওঠা বিশাল শিল্পগোষ্ঠী।

জাগুয়ার এবং ল্যান্ডরোভারের মতো বিশাল গাড়ি শিল্পের মালিকানা রয়েছে টাটার। এ সুবাদে যুক্তরাজ্যে শিল্পখাতে সর্ববৃহৎ চাকরিদাতা বা কর্মসংস্থানকারী প্রতিষ্ঠানও হয়েউঠেছে এই টাটা।

একদিকে বাণিজ্যে তুঙ্গে রয়েছে অপরদিকে, দানে-দাতব্যে কিংবা মানবিক ত্রাণেও শীর্ষে রয়েছে টাটা। ভারতের অন্যান্য ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনা করত গেলে বিস্মিত হতে হবে। দেখা যাবে, টাটার এসব তৎপরতার ধারে-কাছেও যেতে পারেনি আর কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। ভারতের ‘দুনীতিগ্রস্ত সমাজে সততা ও শ্রেষ্ঠত্বের’সমার্থক হয়ে উঠেছে টাটা। তাই ১৯২০ সালে ট্রেড ইউনিয়নের এক নেতা বলেছিলেন,  ‘তমসাচ্ছন্ননগরী-র ‘অন্ধরাজা’ নামই টাটা।

রাইয়ানুর ‘টাটা: দ্য গ্লোবাল করপোরেশন দ্যাট বিল্ট ইন্ডিয়ান ক্যাপিটালিজম’ বইটি হলো একজন শিক্ষাবিদ ও ঐতিহাসিকের কঠোর প্রয়াস। বই লেখার কাজে তিনি টাটার আর্কাইভ বা মহাফেজখানা তন্নতন্ন করে ঘেঁটেছেন, খতিয়ে দেখেছেন। টাটার উত্থান এবং প্রতিকূল পরিবেশে লড়াই করে দীর্ঘায়ু হওয়ার রহস্যভেদের চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি টাটাকে নিয়ে গড়ে ওঠা গালগপ্পো বা কেচ্ছা-কাহিনীকে এড়িয়ে গেছেন।

ভারতের অন্যতম প্রাচীন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হলো দেশটির পারসিকরা। এরা পারস্যের (বর্তমানের ইরানের) নবী হিসেবে স্বীকৃত অগ্নিউপাসক জরথুস্তের অনুসারী। (ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর স্বামী ফিরোজ গান্ধীও একজন পারসিক ছিলেন।) জাতপাতের শৃঙ্খলে আটা ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় পারসিকদের তেমন কোনো অবকাশ বা স্থান ছিল না। এটি টাটার জন্য শাপে বর হয়ে দেখা দিয়েছে। ব্রিটিশরাজের দুর্দান্ত প্রতাপের সময়ে ভারতে টাটার মতো পরিবারগুলোর বাণিজ্যে সমৃদ্ধি,  বিস্তার এবং বিকাশ ঘটে।

টাটা আধুনিককালে নিজের যে ভাব চিত্র গড়ে তুলেছে তার সাথে আবিসিনিয়ার কাহিনি যুতসইভাবে খাপ খায় না।তবে ১৯ শতকের রাজকীয় বাণিজ্যের জগতের বেহাল দশার কথা এসব গল্পের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়। তৎকালীন বাণিজ্য জগতের এই অরাজক অবস্থার মধ্য থেকেই উঠে এসেছে টাটা।

 

বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান হলেও আচার-আচরণে এবং বিধি-বিধান প্রণয়নে টাটা একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বভাব অনুসরণ করেছে। রাইয়ানু এক্ষেত্রে টাটা নগরীনির্মাণ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা এমন কি টাটা প্রশাসনিক সার্ভিস স্থাপনের কথা তুলে ধরেন। আর সত্যি বলতে কি, টাটা প্রশাসনিক সার্ভিসকে ভারতীয় সিভিল সার্ভিস বা আইসিএসের আদলেই গড়ে তোলা হয়।

এটি টাটাকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা এনে দেয় এবং ভারতীয় রাজনৈতিক হাওয়া বদলে গেলে তার ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি টাটার জন্য ঢালও হয়ে ওঠে এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা। ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটিশরাজের সাথে স্বাভাবিকভাবেই দহরম-মহরম করেছে টাটা। পাশাপাশি গান্ধির নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেও দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে মদদ যুগিয়েছে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে তাল দিয়েছে টাটা। টাটার ‘সর্প হইয়া দংশন করা এবং ওঝা হইয়া ঝাড়ার নীতি’সবসময়ই সুফল দিয়েছে একথা বলা যাবে না। ১৯৫৩ সালে ভারতের জাতীয়করণের কবলে পড়ে টাটার বিমানসংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া।

জামশেতজি নুসারওয়ানজি টাটা

জামশেদপুরে ভাববিলাসী কিন্তু দূরদৃষ্টিপূর্ণ টাটা নগরী নির্মাণের অ্যাখানের বর্ণনা বইটির অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ হয়ে উঠেছে। ভারতের গ্রামীণ জনপদে ইস্পাত শ্রমিকদের বসবাসের জন্য একটি নগরী নির্মাণের মধ্য দিয়ে একটি কোম্পানির সার্বভৌম ভাবধারা ফুটে ওঠে।

উদ্যান নগরী বানানোর আন্দোলনে প্রভাবিত টাটা মনে করেছে, শ্রমিকদের সুন্দর আবাসিক ব্যবস্থা ও মানসম্পন্ন জীবন-যাপনের সুযোগ দেওয়া হবে। একে অগ্রগামী শিল্পের সদাচরণ হিসেবে গণ্য করা যায়।এ আচরণের অংশ হিসেবে প্রতিদিনের কর্ম বা কাজের সময় বেঁধে দেওয়া হয় আট ঘণ্টা।

‘টাটা: দ্য গ্লোবাল করপোরেশন দ্যাট বিল্ট ইন্ডিয়ান ক্যাপিটালিজম বইয়ের প্রচ্ছদ

অন্য সব ইউটোপীয় বা ভাববিলাসী চিন্তাধারার অন্ধকার দিকগুলোর মতো এই সব প্রকল্পের বেলায়ও তা ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়। কিন্তু এ বইতে ঔপনিবেশিক সেইসব কাণ্ডকারখানা তুলে ধরা হয়েছে। নগর বানাতে গিয়ে স্থানীয় আদিবাসী বা উপজাতীয়দের নিজ ঘরবাড়ি ছাড়া করেছে টাটা। তাদের মধ্যে পুঁজিবাদী কর্মনৈতিকতা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার মূলে লুকিয়ে ছিল জাতপাতের প্রধান্য বজায়ের মনোবৈকল্য। জামশেদপুর হয়ে ওঠে ‘সহিংসতা ও রাজনৈতিক চক্রান্তে’-র আঁতুড়ঘর। দ্বিধাহীনভাবে আদিবাসী নারীদের হেনেস্তা করেছে টাটার ব্যবস্থাপক পর্যায়ের লোকজন। এছাড়া, যখন-তখন পুলিশও গোলাগুলির আশ্রয় নিয়েছে।

টাটার কর্মজগতকে বোঝার ক্ষেত্রে কোম্পানির আর্কাইভ বা মহাফেজখানা খুব একটা কাজে আসেনি বলেই স্বীকার করেন লেখক। কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় কর্তারা নিচের দিকের তৎপরতার যে বর্ণনা দিয়েছেন সেসব কাগজপত্র আছে। কিন্তু আদিবাসীরা কোম্পানির তৎপরতাকে কিভাবে দেখছেন সে কথা জানার চেষ্টা করা হলে সে সংক্রান্ত কাগজপত্র পাওয়া দায় হয়ে যায়। সব মিলিয়ে তিনি আশঙ্কা ব্যক্ত করেন, এমন সব কাগজপত্র ‘নষ্ট করা হয়েছে বা ইচ্ছাকৃতভাবে সরিয়ে’ফেলা হয়েছে। আফিম ব্যবসায় টাটার ভূমিকার মতো অস্বস্তিকর বাস্তবতাসহ এসব ঘটনা জনমানুষের চোখ থেকে আড়াল করার জন্যে এমন করা হয় বলে মনে করেন লেখক।

বইয়ের লেখক মিরসিয়া রাইয়ানু

বইয়ের কিছু অংশে ইতিহাস রচনা প্রসঙ্গে বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে। সাধারণ পাঠকদের তা হয়ত টানবে না। বইতে ১৯৭০-র দশকের সংক্ষিপ্ত উপাখ্যানও হয়ত তৃপ্তি দেবে না। আর এরপরই পাঠকদের নিয়ে আসা হয় আধুনিক সময়ে।

মিরসিয়া রাইয়ানু আরো বলেন, টাটা আজকের দিনের ভারতে আর সেরা বা অগ্রগামী উদ্যোক্তা নয়। মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাসট্রিজ এবং গৌতম আদানির একই নামের বাণিজ্য-গোষ্ঠীর দিকে দৃষ্টি ফেরান তিনি। টেলিযোগাযোগ এবং পুনব্যবহারযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ফলস্বরূপ বর্তমানে ভারতে তাদেরকেই ‘জাতিগঠনকারী’ অভিধায় ভূষিত করার জোরাল যুক্তি রয়েছে।

হাল আমলের এসব ধনকুবেররা ভিন্ন উপায়ে ব্যবসা করার প্রতিনিধিত্ব করছেন। রাষ্ট্র নিয়ে টাটার মতো দোটানার শিকার হন না তাঁরা। বিনাদ্বিধায় তাঁরা নরেন্দ্র মোদির সাথে এক কাতারে দাঁড়াতে পারেন। ‘সম্পদের জন্য সম্পদ করার’টাটার মনোভাবে যে রক্ষণশীল সংশয় তারও তেমন একটা পরোয়া করেন না একালের ধনকুবেররা।

তবে ভারতের পুঁজিবাদ এবং বাণিজ্য-সংস্থাগুলো বা কর্পোরেট শক্তি নতুন যুগে পা রাখছে কিনা জানতে হলে এ বইকে সময়োপযোগী পাঠ হিসেবে মনে করতে হবে।গত দেড়শ বছর ধরে ভারতে র অর্থনীতিতে কিভাবে আধিপত্য বজায় রেখেছে টাটা সে বিষয় জানতে হবে।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা ]