ঝুঁকিপূর্ণ গুলশান শপিং সেন্টার কেনাকাটায় সরগরম
এফই অনলাইন ডেস্ক | Thursday, 17 February 2022
ঢাকার গুলশান শপিং সেন্টারকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণার আট মাস পেরোলেও নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা; ঝুঁকির বিষয়টি জেনে না জেনে প্রতিদিন সেখানে সমাগম করছেন হাজারো ক্রেতা। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
ঢাকার কূটনীতিকদের এলাকা গুলশান ১ নম্বরের এই বিপণি বিতানকে ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করে সাড়ে তিন বছর আগে ফায়ার সার্ভিস বলেছিল, ভবনটিতে যে কোনো সময় অগ্নিকাণ্ডসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাধীনতার আগে গড়ে তোলা ছয় তলা ওই ভবনের একটি অংশে ছিল সিনেমা হল, অন্য অংশে বিপণি বিতান। সিনেমা হল বন্ধ করে ১৯৯৬ সালে সেই অংশেও করা হয় দোকান।
বর্তমানে ওই ভবনে ৭২৩টি দোকান রয়েছে। আসবাবপত্র, তৈজসপত্র, খাবার, শিশু পণ্য, কসমেটিকস, রেস্তোরাঁসহ প্রায় সব ধরনের দোকান রয়েছে ওই মার্কেটে।
২০১৭ সালে ২ জানুয়ারি পাশের ডিএনসিসি কাঁচাবাজারে ভয়াবহ আগুন লাগে। প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ওই ঘটনার পর গুলশান শপিং সেন্টারের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
ওই বছরের ২৮ মে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গুলশান শপিং সেন্টার পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনে ওই ভবনে অগ্নিঝুঁকি সংক্রান্ত ১০টি ত্রুটি ধরা পড়ে।
সে সময় ত্রুটি সারানোর জন্য সময় দিয়ে ভবন মালিকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব ত্রুটি সারানো হয়নি বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
এরপর ২০১৮ সালের ১১ জুন ভবনটি ব্যবহার উপযোগী নয় বলে ঘোষণা করে ফায়ার সার্ভিস। ওই নোটিসের বিরুদ্ধে ১৬ জুন সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিবের কাছে আপিল করেন গুলশান শপিং সেন্টারের সাধারণ সম্পাদক।
ফায়ার সার্ভিসের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে আপিল করে দোকান মালিক সমিতি। তবে হাই কোর্ট ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করার নির্দেশ দেয়।
২০২১ সালের ২১ জুন আবারও ওই ভবনটি পরিদর্শন করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত কমিটি।
২২ জুন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন গুলশান শপিং সেন্টার কর্তৃপক্ষ এবং সেখানকার ভূমি মালিক বাণীচিত্র প্রতিষ্ঠান লিমিটেড ও চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দেয়।
ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ভবনটির অগ্নিঝুঁকি আগের মতোই রয়েছে, ফলে যে কোনো সময় অগ্নিকাণ্ডসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। মানুষের মৃত্যুসহ যে কোনো ধরনের ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ভবনটিকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করা হয়।
ওইদিন ভবনের দুটি দেয়ালে ‘গুলশান শপিং সেন্টার অগ্নিনিরাপত্তা বিহীন ও ব্যবহার অনুপযোগী’ ব্যানার টানিয়ে দেওয়া হয়।
একইসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনারকে ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয় ফায়ার সার্ভিস।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরনো ওই ভবনটির নিচতলায় রেস্তোরাঁ, কসমেটিকসহ নানা দোকান। মার্কেটের গলি অপ্রশস্ত। দোকানগুলো নানা মালামালে ঠাসা। দোতলার পর থেকে ওপরের তলাগুলোর প্রায় গলি অন্ধকারাচ্ছন্ন। ওপরের তলার অনেক দোকান ব্যবহার হচ্ছে গুদাম হিসেবে।
দোকান মালিকদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফায়ার সার্ভিসের নোটিসের পর ২০২১ সালের ১৪ অগাস্ট মার্কেট খালি করার কথা ছিল। সে অনুযায়ী দোকানদারদের নোটিসও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওইদিনই ভবনের জমির মালিক আহমেদ ফয়জুর রহমান মারা যান। পরে দোকানগুলো আর সরানো হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, একটি ভবনে প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা একটি বড় ঝুঁকি। এছাড়াও ভবনটির আরও সমস্যা রয়েছে। এসব কারণে ফায়ার সার্ভিস ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সেখানে নোটিস টানিয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, “ফায়ার সার্ভিসের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা নেই। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকেও অনুরোধ করা হয়েছে।
“গুলশান শপিং কমপ্লেক্স ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করে। তো যারা ট্রেড লাইসেন্স দেয়, তারা সার্বিক বিষয়ে ভালো বলতে পারবে। আমাদের (ফায়ার সার্ভিস) আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা নাই। কাউকে জেল জরিমানা দেওয়া বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারি না; সেটা আমাদের দেওয়া নাই। এজন্য আমরা বিষয়টি সিটি করপোরেশন এবং পুলিশকে জানিয়ে রেখেছি।”
গুলশান শপিং কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সফরুল ইসলাম বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে দাবি করেন, ফায়ার সার্ভিস ওই ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেনি। এটা ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। ভবনটি অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ, তবে ঝুঁকিপূর্ণ না।
“ফায়ার ফাইটিংয়ে যেসব ফল্ট ছিল, সেগুলো আমরা পূরণ করে দিয়েছি। তবে এই ভবন ভেঙে বহুতল ভবন করার প্রক্রিয়া চলছে। বিষয়টি নিয়ে জমির মালিকদের সঙ্গে আমাদের একটা আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু জমির মালিক মারা যাওয়ায় একটু ঝামেলা হচ্ছে।”
জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, “এ ধরনের আরও কয়েকটি ভবন আছে ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবন নিয়ে আমরা এখনও কাজ শুরু করতে পারি নাই। তবে আমরা বিষয়টি দেখব।”