জীবনযাপনে যে পরিবর্তন এল সম্প্রতি
ফারিয়া ফাতিমা | Tuesday, 27 July 2021
"আমরা মৃত্যুর আগে কী বুঝিতে চাই আর? জানি না কী আহা।। সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দেয়ালের মতো এসে জাগে।। ধূসর মৃত্যুর মুখ — একদিন পৃথিবীতে স্বপ্ন ছিল — সোনা ছিল যাহা।।"
জীবনানন্দ দাশের এই কবিতার মতোই হয়তো জীবন। সোনার স্বপ্নে বয়ে চলা জীবন করোনার ছায়ায় এখন ধূসর মৃত্যুর মুখ। তবুও থেমে নেই মানুষের পথচলা। সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট- এই তত্ত্বকে আঁকড়ে ধরে মানিয়ে চলার ক্রমাগত চেষ্টা চলছে এই নিউ নরমালে। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে মানুষ বেশ নতুন কিছু অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়েছে, অনেক নতুন বিষয় জেনেছে এবং নিত্যনৈমিত্তিক জীবনে সেগুলো কাজেও লাগাচ্ছে।
ব্যক্তিজীবনে
রাস্তায় বের হলেই পড়তে হয় যেন ধুলা-বালির সাগরে, তা থেকে হতে পারে অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্ট, বক্ষব্যাধিসহ নানা রোগবালাই। এসব জানা সত্ত্বেও কতজনই-বা মাস্ক পরতাম? তবে এখন চিত্র আলাদা। বাতাসে ভেসে বেড়ানো করোনাভাইরাস কিংবা সামনে থাকা মানুষের হাঁচি-কাশির থেকে বাঁচার চেষ্টায় মানুষজন এখন মাস্কে অভ্যস্ত। সাথে চলছে নিয়মিত হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার ব্যবহার করার অভ্যাস রপ্তের প্রচেষ্টা। আর সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিষয়টি তো আছেই।
কিন্তু মানুষ সামাজিক জীব বলেই কিনা, এমন দূরত্বে, লকডাউনে ঘর থেকে বের হতে না পারায় একাকীত্বের ভার দিন দিন বেড়েই চলছে। তুমুল আড্ডাপ্রিয় মানুষ হোক বা একা ঘুরে বেড়ানো অন্তর্মূখী স্বভাবের মানুষটি- কারো জীবনই নেই আর আগের মতন।
কর্মক্ষেত্রে
পাল্টে গেছে জীবনযাপন, পাল্টে গেছে অভ্যাস। কর্মক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে বিশালাকারে। 'হোম অফিস' থেকে শুরু করে অফিসে-দোকানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা- সবই ইঙ্গিত দেয় নিউ নরমালের।
সরকারি চাকরিজীবী মোঃ আনিসুর রহমান জানান, করোনাকালে তার ডিজিটালাইজেশনের অভ্যাসের কথা। তিনি বলেন, "অনলাইনে কাজ করার ফলে কম সময়ে অনেক বেশি আউটপুট দিতে পারছি। কাজের কোনো সময়সীমা নেই এখানে। অফিস আওয়ারের বাইরেও অনেক সময় কাজ করতে হয়েছে। কাজের সময় নমনীয় হয়েছে অনেক। নিজেকেও সময় দিতে পেরেছি। তবে করোনা পরিস্থিতিসহ অনেক কারণেই মানসিক স্বাস্থ্যের নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।"
করোনা পরবর্তী সময়ে এর প্রভাব হিসেবে তিনি বলেন, "যেহেতু ভবিষ্যতে আমরা ডিজিটাইলেশনের দিকে যাচ্ছি সেক্ষেত্রে আমি মনে করি এই পরিবর্তন অনেকাংশেই থেকে যাবে। এই করোনা মহামারীর কারনে দেশের প্রায় সব চাকুরীজীবীই অনলাইন কার্যক্রমে অনেকটা অভ্যস্ত হয়েছে। যেহেতু আমাদের সবারই একটা অনলাইন কাঠামো প্রস্তুত হয়ে গেছে, সেহেতু করোনা পরবর্তী সময়ে সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলেও এই কাঠামোর ব্যবহার থেকে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।"
এদিকে কেউ বাসায় বসে থেকে থেকে বিরক্ত, আবার কারো ক্ষেত্রে ঘুরতে যেতে না পারা, আড্ডা দিতে না পারাটাই সমস্যা। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরোয় যাদের, তাদের কী অবস্থা? কোনো শখ নয়, কোনো চিত্ত বিনোদন নয়, তাদের সমস্যাটা স্রেফ বেঁচে থাকার যুদ্ধ নিয়ে। স্বভাবতই ভালো নেই নিম্ন আয়ের মানুষজন। করোনার ভয়াবহ গ্রাসে তাদের জীবনযাপনে এসেছে বেশ পরিবর্তন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রেতা মোঃ বরকতউল্লাহ জানান, "রাস্তায় আগের মত মানুষ থাকে না, বিক্রি বাট্টা খুবই কম হয়। এখন সকাল নয়টায় বের হয়ে রাত নয়টা পর্যন্ত চা-কফি নিয়ে ঘুরলেও তেমন বিক্রি হয় না। মা-বাবা, বউ- বাচ্চারে ভালো করে খাবারও দিতে পারি না এখন। মাসের দশ তারিখের মধ্যে বাসা ভাড়া দেয়ার লাগে। টাকা না থাকায় পনেরো তারিখ পর্যন্ত সময় বাড়ায় নিলেও বাসা ভাড়া দিতে পারিনা। মালিকে নানান কথা শোনায়।”
তবু তাঁর মুখে আশার বাণী- “তবে আল্লাহ চাহে তো করোনা গেলে লকডাউন ছাড়লে, দোকান পাট খুলবে, মানুষজন আসবে। বিক্রি বাট্টা বাড়বে আবার, ছেলে পেলে নিয়ে খেয়ে পরে চলতে পারব আগের মতোন।"
শিক্ষাক্ষেত্রে
গত বছরের মার্চ মাসের শুরুতে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হলে সে মাসেই বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলেও একেবারে থেমে নেই পড়াশোনা। ক্লাসরুমবিহীন নতুন অভ্যাসে চলতে থাকে শিক্ষাক্ষেত্র।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী তাসনিম জারিন জানান, "গত এক বছরে পড়াশোনা অনেকটাই অনলাইনভিত্তিক হয়ে উঠেছে। যদিও আমরা আগে থেকেই জানতাম যে ইন্টারনেটের কারণে জগৎ হাতের মুঠোয় এখন, কিন্তু সেটাকে যে পড়াশোনার ক্ষেত্রেও এত বিস্তৃত আর বৈচিত্র্যময়ভাবে কাজে লাগানো যায় সেটা আগে কেউ উপলব্ধি করিনি।
এখন আমাদের শিক্ষকেরা প্রযুক্তির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন। করোনা পরবর্তী সময়ে অনলাইন ক্লাসগুলো হয়তো থাকবে না, কিন্তু ডিজিটালাইজেশনের সুবিধাগুলো থাকলে বেশ ভালো হয়। তবে মারণঘাতী ভাইরাসের দিনগুলো পাশ কাটিয়ে বন্ধু- বান্ধব, শিক্ষক- শিক্ষিকাদের সাথে মুক্ত ক্যাম্পাসে আবার ফিরে যাওয়ার চেয়ে ভালো আর কিছুই নেই।"
কোথাও লকডাউনে জীবিকার চাপ। কেউবা হয়েছেন স্বজনহারা। আবার কেউ লড়াই করছে এই ভাইরাসের সাথে। সব মিলিয়ে বদলে গেছে মানুষের হতাশা, একাকীত্ব, বিষণ্নতার মাত্রা। তবে আতঙ্ক নয়, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সতর্কতাই ভরসা এই সময়ে। নিউ নরমালে নতুন অভ্যাসে মানিয়ে নিয়ে, মহামারীর পর দিনগুলো আবার ভরে উঠুক নানা রঙে। দিনগুলো থাকুক যত্নে, সোনার খাঁচায়।
ফারিয়া ফাতিমা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
fariasneho@gmail.com