চিলি, চীন ও ব্রাজিলে পোশাক রপ্তানিতে বড় পতন
কিছুটা বেড়েছে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও রাশিয়ায়
মনিরা মুন্নি | Monday, 16 August 2021
কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে গত অর্থবছরে চিলি, চীন ও ব্রাজিলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরণের পতন হয়েছে। তবে রপ্তানি বেড়েছে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও রাশিয়ায়। এই দেশগুলো বাংলাদেশের পোশাক খাতের অপ্রচিলত বাজারের (নন-ট্র্যাডিশনাল মার্কেট) অন্তর্ভুক্ত।
সরকারি পরিসংখ্যান মতে, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে চীনে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২৭ কোটি ১৩ লাখ মার্কিন ডলারের মতো (যা প্রায় ২,২৯৭ কোটি টাকা।। এটি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আয়ের চেয়ে ৪৬ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) হিসাব মতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীনে প্রায় ৫০ কোটি ৬৫ লাখ মার্কিন ডলার (বা ৪,২৮৮ কোটি টাকা) মূল্যের পোশাক রপ্তানি করতে পেরেছিল।
একইভাবে, বিজিএমইএ-এর উপাত্ত দেখাচ্ছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্রাজিলে প্রায় ১৬ কোটি মার্কিন ডলারের (১,৩৫৯ কোটি টাকার) পোশাক রপ্তানি করেছিল। কিন্তু, ২০২০-২১ অর্থবছরে দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমে হয়েছে প্রায় সাত কোটি সাত লাখ মার্কিন ডলারের মতো (বা ৫৯৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা)। সেই হিসেবে, গত অর্থবছর ব্রাজিলে আমাদের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৫৫ শতাংশেরও বেশি।
এরই মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার আরেক দেশ চিলিতে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল আট কোটি ২৬ লাখ মার্কিন ডলারের মতো যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৯৯ কোটি টাকা । কিন্তু, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এটি ছিল প্রায় ১১ কোটি ১৩ লাখ মার্কিন ডলারের সামান্য ওপরে (৯৪২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা)।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) অন্যতম পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, “বিশ্বের যেসব দেশে আমাদের পোশাক শিল্পের বাজার রয়েছে, মহামারীর ফলে সামগ্রিকভাবে সেগুলোর সর্বত্রই বড় ধাক্কা লেগেছে। তবে, আমাদের প্রচলিত বাজার তথা মর্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে অবস্থার ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু, মহামারীর প্রভাবেই অপ্রচলিত বাজারে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি এখনো অর্জিত হয়নি।
বিকেএমইএ-এর এই পরিচালক জানান, “গত দু’বছরে বেশ কয়েক দফায় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা চালু থাকার পরও আমরা প্রচলিত বাজারের ক্রেতাদের সঙ্গে তাদের স্থানীয় কার্যালয়ের মাধ্যমে অথবা তাদেরকে ই-মেইল পাঠিয়ে ও অন্যান্য ভার্চুয়াল উপায়ে যোগাযোগ করে সম্পর্কগুলো জোড়া লাগাতে পেরেছি। কিন্তু ক্রেতা বা স্থানীয় সরবরাহকারী কেউই আরো অগ্রসর হয়ে সম্ভাব্য বাজারের অনুসন্ধান করতে পারছেন না। ফজলে শামীম এহসানের মতে, “এর ফলে, যেসব ক্রেতারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমেই যোগাযোগ করে থাকেন, তাদের সঙ্গে আমরা সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারছি না।”
তিনি আরো জানান, মহামারীর এই সময়ে চীন তাদের ক্রয় কমিয়ে ফেলেছে এবং নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করছে।
ফতুল্লা ফেব্রিক্স লিমিটেডের পরিচালক ইরফানুল হক জানান, “বাংলাদেশ থেকে চীন মূলত লো-এন্ডের অর্থাৎ কম-দামি পণ্য আমদানি করে থাকে।” চীনে বাংলাদেশি পণ্যের একজন রপ্তানিকারক হিসেবে তিনি বলেন যে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সুতার মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকায় চীনা ক্রেতারা ক্রয়াদেশ দেওয়া বলতে গেলে বন্ধই করে দিয়েছেন।
এমবি নিট ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেএবং বিকেএমইএ-এর সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ব্রাজিল, মেক্সিকো, তুরস্ক ও দক্ষিণ আফ্রিকায় আমদানি শুল্কের উচ্চহারকে সেসব দেশে বাংলাদেশের রপ্তানির নিম্নহারের কারণ বলে মনে করছেন। তিনি বলেন, তুরস্ক নিজেরাই পোশাক প্রস্তুতকারক বলে স্থানীয় উৎপাদকদের সংরক্ষণ সুবিধা দিতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
তবে, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সঙ্গে আলাপচারিতায় স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হারের নিম্নগতিতে অর্থনৈতিক কাজকর্মে গতিশীলতা ফিরে আসায়, তাঁরা ব্রজিল, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার তরফ থেকে আগামী মাসগুলোর জন্য পোশাক রপ্তানির বিষয়ে খোঁজখবর ও ক্রয়াদেশ পাচ্ছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, মহামারী সত্ত্বেও গত দুটি অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও রাশিয়াতে বাংলাদেশের পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ প্রায় ৭২ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের (৬,০৯৪ কোটি টাকা) তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছিল যা ২০২০-২১ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৩ কোটি ১১ লাখ মার্কিন ডলারের মতো বা ৬,১৯০ কোটি টাকা ।
ওদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ৩২ কোটি ২৩ লাখ মার্কিন ডলার ( বা ২,৭২৯ কোটি টাকা )মূল্যের। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই অঙ্কটি ছিল আরো কম-- প্রায় ২,৩৬৪ কোটি টাকা বা ২৮ কোটি মার্কিন ডলারের মতো।
রাশিয়াতেও পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। ২০১৮-১৯ সালে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৮ কোটি ৮৫ লাখ মার্কিন ডলার (বা ৪,১৩৭ কোটি টাকা) । সেটি বেড়ে গত অর্থবছরে হয়েছে প্রায় ৫৯ কোটি ৩৬ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি (৫,০২৬ কোটি টাকা)।
সার্বিকভাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাত থেকে প্রায় তিন হাজার ১৪৫ কোটি মার্কিন ডলার (বা দুই লাখ ৬৬ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা) আয় করেছে যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল প্রায় দুই হাজার ৭৯৪ কোটি মার্কিন ডলার (বা প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা)। তবে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি খাত থেকে বাংলাদেশের আয় ছিল আরো বেশি। অঙ্কটি হল, তিন হাজার ৪১৩ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় দুই লাখ ৮৮ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা) ।
munni_fe@yahoo.com