logo

চাপ বাড়াচ্ছে শিক্ষা উপকরণের দাম

এফই অনলাইন ডেস্ক | Wednesday, 8 June 2022


দুই মেয়ে ও এক ছেলের পড়াশোনার পেছনে মাসের উপার্জনের বড় অংশ যায় মিরপুরের পোশাক ব্যবসায়ী নুরুল হাসান রতনের। তার তিন সন্তান পড়ছে একাদশ, দশম ও প্রথম শ্রেণিতে।

এই ব্যবসায়ী জানালেন, সবকিছুর দাম বাড়ায় একার উপার্জনে সংসার চালাতে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

তার ভাষায়, “বাজারে দাম বাড়ে নাই এমন জিনিস খুব কমই খুঁজে পাবেন। কিন্তু আমাদের ইনকাম বাড়ছে না। সাধারণ মানুষকে চলতে হচ্ছে কৌশল করে।”

এ অবস্থায় শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভাবতে হচ্ছে এই অভিভাবককে।

নুরুল হাসান বলেন “শুনতে মনে হবে কম টাকা বেড়েছে। কিন্তু বাসা ভাড়া, স্কুলের বেতন, কোচিং ফি, দ্রব্যমূল্য- সব যেভাবে বাড়ছে তাতে বাচ্চাদের আগের মত ভালভাবে পড়ানো সম্ভব হবে না।”

বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, মহামারী কাটিয়ে গত সেপ্টেম্বরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর থেকেই কাগজসহ অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়ছে। মে মাসে আরেক দফা দাম বাড়ায় বড় প্রভাব পড়েছে বাজারে।

খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, দাম বাড়ার পাশাপাশি কিছু শিক্ষা উপকরণ এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না।

মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বরে ‘বুক প্যালেস’ এর ব্যবস্থাপক রাকিবুল হাসান রাসেল বলেন, “বই ছাপানো বন্ধ করে দিছে। গ্রামার বইগুলো মার্কেটে নাই। চাইলে আমরা দিতে পারছি না। শারীরিক শিক্ষা ব্যবহারিক খাতা বাজারে নাই।

“১২০ পৃষ্ঠার পদার্থবিজ্ঞান ব্যবহারিক খাতা ৬০ টাকারটা এখন ৬৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।”

তিনি জানান, গত তিন সপ্তাহে অধিকাংশ শিক্ষা পণ্যের দাম বেড়েছে। নতুন যেসব পণ্য আসছে সবকিছুরই দাম বেড়েছে।

সহায়ক বই আসছে বাড়তি দামে। ২৮০ টাকার বসুন্ধরা কোম্পানির অফসেট কাগজ প্রতি রিমের (১০০ পাতা) দাম হয়ে গেছে ৩৩০ টাকা। অন্যগুলোর দামও ২০-৫০ টাকা বেড়েছে।

“চায়নিজ জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। আগে কম্পাস বিক্রি করতাম ৭৫ টাকায়, এখন বিক্রি হচ্ছে ৯৫ টাকায়। কলমের দাম বেড়েছে ডজনে ৫-১০ টাকা। আর পিস বিক্রি করলে ১টাকা বেশিতে বিক্রি করতে হচ্ছে।

“শার্পনার ৫ টাকারটা ৬ টাকা, ১০ টাকারটা ১২ টাকা বিক্রি হচ্ছে। ক্যালকুলেটরের দামও অনেক বেড়েছে।”

পল্লবীর ন্যাশনাল লাইব্রেরি অ্যান্ড স্টেশনারির বিক্রয়কর্মী আবদুর রাজ্জাক জানান, ঈদের পর ব্যবহারিক খাতা কিনেছেন ৬৬০ টাকা ডজন। দুই দিন পর মিরপুর ১০ নম্বর থেকে পাইকারিতে ৭২০ টাকা দিয়ে কিনেছেন, এখন তা ৮২০ টাকা।

এছাড়া এক দিস্তা খাতা ২০ টাকার পরিবর্তে এখন ২৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এক রিম হোয়াইট প্রিন্ট ৪২০ টাকা পড়ছে, আগে ছিল সাড়ে ৩০০ টাকা।

“সব বিষয়ের সহায়ক বইয়ের দামও বেড়েছে,”- বলেন এই বিক্রেতা।

বাংলাবাজারের পাইকারি দোকান লোকনাথ বুক এজেন্সির বিক্রয়কর্মী সন্তোষ কুমার দে বলেন, “শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়ায় বিক্রি কমছে, ফলে দোকানে পণ্য কমিয়ে রাখতে হচ্ছে।”

তিনি জানান, ১৫ টাকার স্লেট এখন ২২-২৫ টাকায়, ৬-৭ টাকার চক ১২-১৩ টাকায়, ১০-১২ টাকার কাগজের দিস্তা ১৬-১৭ টাকায়, ৩৮-৪০ টাকার কলমের পাতা ৪৫ টাকায়, ২৪০ টাকা রিমের কাগজ ২৭০-২৮০ টাকায়, ৩১০ টাকা রিমের কাগজ ৩৮০ টাকায়, ২৬০ টাকার বসুন্ধরা অফসেট ৩০০ টাকায়, ১৮০ টাকা ডজনের স্কেল ২৪০ টাকায়, ৫৫ টাকার কম্পাস ৭৫ টাকায়, ১৮০ টাকার সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর ২৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

হাবিব ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী সালাম খান বলেন, “দাম বললে কাস্টমার খালি ঘুরতে থাকে এখন। ঈদের পরে দাম বেশি বাড়ছে, আগে এতটা ছিল না। ফলে বিক্রি অনেক কমে গেছে। সাপ্লায়ারদের কিছু বললে শুধু যুদ্ধের কথা বলে।”

কাজল বুক ডিপোর স্বত্বাধিকারী কাজল সরকার জানান, আগে জানুয়ারিতে সহায়ক বইয়ের যে দাম থাকত, তা সারাবছর একই থাকত। এবার সেখানে ১০ শতাংশ দাম বেড়েছে।

“এখন কোনো বিক্রি নাই। বই না চলায়, দাম বাড়ায়- আমরাও দোকানে বই তুলতে পারছি না,”- বলেন তিনি।

বইয়ের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে প্রকাশকরা কাগজের পাশাপাশি ছাপার প্লেট ও কালির দাম বাড়ার কথা বলছেন।

বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার বইয়ের প্রকাশক সাদেক হোসেন মনে করেন, কাগজের দাম বাড়লে মানুষের বই কেনার ক্ষমতাও কমে, এখন সে প্রভাবই পড়ছে। বাজার অস্থির হওয়ায় তারা বই ছাপা কমিয়ে দিয়েছেন।

“২০০ টাকার প্রোডাকশন এখন করতে হচ্ছে ২৫০ টাকায়। প্রায় ৬০ শতাংশ খরচ বেড়ে গেছে। বেশি দামে বই বের করে বিক্রি না হলে লাভ কী? কাগজের সংকট, সে কারণে প্রতিনিয়ত দাম বাড়ছে।”

বাংলাবাজারের ‘এক্সিলেন্ট প্রকাশনী’র এই কর্ণধার বলেন, “স্কুল খোলার পর অক্টোবর থেকে কাগজের দাম বাড়ছে। ৫৫০ টাকা রিমের কাগজ ঈদে এসে হয় ৭৫০ টাকা। ঈদের পরের সপ্তাহে কমে হয় ৬৫০ টাকা, এখন সেটা ৯৫০ টাকা চলছে।

“ঈদের পর প্রতি টন নিউজ প্রিন্টের দাম ছিল ৬৫ হাজার টাকা, এখন ৯৫ হাজার। দাম বাড়ার কারণে সেল কম, প্রোডাকশনও কমে গেছে।”

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানালেন, এই সময়টাতে দাম যতটা বেড়েছে, সিন্ডিকেট করে তার চেয়ে বেশি দেখানো হচ্ছে।

নিয়ন্ত্রণ হারানো বাজারের কারণে যেসব বহুমুখী চাপ তৈরি করছে তার আঁচ পাওয়া গেল শ্যামবাজারের আবু বকর বাইন্ডিংয়ের কর্ণধার আবু বকরের কথায়।

“কাগজ, কালি, আঠার দাম বাড়ায় অনেক কাজ কমে যাচ্ছে। আমরা তেমন কাজ পাচ্ছি না। সমস্ত কিছুর দাম বেড়ে গেলে আমাদের মত খেটে খাওয়া মানুষ চলবে কীভাবে?

“আগে দিনে পাঁচটা কাজ পেলে এখন পাচ্ছি তিনটা। আগের মত কারিগর রাখতে পারছি না। কাজ না থাকলে তাদের আমি বেতন দেব কী আর তারা সংসার চালাবে কীভাবে?”

এমন বাস্তবতায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

কালশী এলাকার বাসিন্দা রহিমা আক্তারের স্বামী মাছের ব্যবসা করেন। দুই ছেলে-মেয়ের পড়ালেখার একটু ভাল ব্যবস্থা করতে তিনি গৃহকর্মী হিসেবে কাজে নামেন।

তার মেয়ে চতুর্থ ও ছেলে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। আরেকটি সন্তান নেওয়ায় এখন আর তিনি উপার্জন করতে পারছেন না। এর মধ্যে বাজার চড়ে যাওয়ায় বিপদ দেখছেন রহিমা।

“কলম, পেন্সিল, কাটার, খাতা কোনটার দাম বাড়ে নাই? এভাবে যদি সবকিছু বাড়তে থাকে, তাহলে গরীবের ছেলেমেয়ে পড়বে কেমনে?

“আমার বাচ্চারা খুব ভাল রেজাল্ট করছে। কিন্তু এমন টানাটানি চললে ম্যাডামের কাছে পড়ানো বন্ধ করে দিতে হবে, তখন পড়ার মান খারাপ হবে। কেবল স্কুলে পড়ে তো এখন তেমন শেখা যায় না।”

মিরপুর বিসিআইসি কলেজের শিক্ষার্থী ইসমাঈল হোসেন জানান, কলম এবং খাতার দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ বাঁচানোর জন্য এখন তাকে মেপে মেপে লিখতে হচ্ছে।

“খাতার দাম ৫-৭ টাকা করে বেড়ে গেছে। আগে তো ধরেন, যেভাবে করতাম, এখন খাতা বাঁচায় অল্প জায়গায় লেখা শেষ করার চেষ্টা করতেছি। কারণ আমাদের অনেকগুলো খাতা লাগে।

“আবার ক্লাসের কাজ, বাড়ির কাজ, বাসায় প্র্যাকটিস করতেও খাতা-কলম লাগে। এখন তো বুঝে চলা ছাড়া উপায় নাই।” 

সংকটে প্রকাশনা শিল্প

খরচ বাড়ার বিপরীতে কাজ কমে আসায় সামনের ‘ছাপা মৌসুম’ নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন প্রকাশনার সঙ্গে জড়িতরা।

তোপখানা রোডের প্রগতি প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের ব্যবস্থাপক জামাল হোসেন বলেন, “কাগজসহ প্রেসের সবকিছুরই দাম বাড়ছে। ৫০০ টাকার জিনিস ৭০০ টাকা হয়ে গেছে। ৪টা কালির ডিব্বা ২৫০০ টাকা ছিল, এখন ২৯০০ টাকা।”

পাঠ্যবই, বইমেলা, ডায়েরি এবং ক্যালেন্ডারের জন্য অগাস্ট থেকে কাজের চাপ বাড়ে জানিয়ে এবার পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

“এখন একটা মেশিন চলে আমাদের। তখন তিনটা মেশিন চলবে, ওভারটাইম থাকে। কিন্তু দাম বাড়তি থাকলে এবার পিক সময়ে এত কাজ পাব বলে মনে হচ্ছে না।”

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম জানান, বাজার অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় এবার পাঠ্যবইয়ের দরপত্রে তারা অংশ নেবেন কি না সে বিষয়ে বৈঠক করছেন।

“ভয়াবহ অবস্থা চলছে। আজকে এক প্রাইসে অর্ডার নিলাম, কাল সে দামে কালি-কাগজ পাচ্ছি না। অনেকে টেন্ডারের কাজ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়েছে- এখন তার রেট দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তখন সারেন্ডার ছাড়া তো উপায় নাই।”

‘আর আর প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং’ এর এই কর্ণধার জানান, ৭৫ হাজার টাকা টনের কাগজ ১ লাখ ৫ হাজার টাকা, ৯০-৯২ হাজার টাকা টনের আর্ট পেপার এখন ১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে।

“বিদেশি পণ্যের দাম অনেক বেড়েছে। অনেকের বড় ধরণের ক্ষতি হচ্ছে, প্রোডাকশনের কাজ কমছে। গার্মেন্টস ও ঔষধ শিল্পেও দামের প্রভাবটা পড়বে।”