ঘরে বানানো খাবার যখন অনলাইনে
তানজিম হাসান পাটোয়ারী | Monday, 29 November 2021
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘরে বানানো খাবারের হোম ডেলিভারি আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আর তাতে ভিন্ন মাত্রা এনে দিয়েছে দারুণ সব ক্লাউড কিচেন, ক্যাটারিং সার্ভিস, সহজ ভাষায় ঘরে বানানো খাবার। আর এরূপ হোম ডেলিভারি নারী উদ্যোক্তাদের মাঝেই দেখা যায় অধিক।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো মূলত অনলাইন ব্যবসাকে আরো সফল করেছে। এসব প্ল্যাটফরমে বিভিন্ন পেজ থেকে ক্রেতারা পছন্দমতো খাবার অর্ডার করতে পারেন। বিক্রেতারা সাধারণত বিভিন্ন ডেলিভারি এজেন্সির মাধ্যমে ক্রেতার গন্তব্যে খাবার পৌঁছে দেন। ফলে একজন ক্রেতা তার ঘরে বসেই পছন্দের খাবারটি পেয়ে যান। ব্যবসায় বিকাশের সাথে কমে যায় সময় ও শ্রম- দুটোই।
ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে ই-ক্যাবের সদস্য প্রায় ১,৬০০ জন। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রায় ২৭ শতাংশ যাদের একটি বড় অংশই ফুড ডেলিভারি, জুয়েলারি, কিংবা পোশাক-পরিচ্ছদের অনলাইন ব্যবসার সাথে জড়িত।
এ ব্যবসার প্রবৃদ্ধির হারটাও বেশ ইতিবাচক। গত কয়েরকবছরে এই হার গড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ। আর শুধু বিগত বছরে এর প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ।
ফেনীর রাজিয়া আক্তার পেশায় একজন গৃহিণী। খুব বেশিদিন হয়নি তিনি হোম মেইড ফুড ডেলিভারি ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের একটি মুদি দোকান ছিল। করোনার আগ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকভাবেই চলছিল। কিন্তু করোনার মধ্যে আয় মারাত্নকভাবে কমে যায়। আর ঐ অবস্থায় পরিবারকে একটু আর্থিক সহযোগিতা দিতেই এ ব্যবসায়ের সাথে জড়িত হই।”
তিনি আরো বলেন, “আমি মূলত ক্রেতাদের থেকে প্রাপ্ত অর্ডারের উপর ভিত্তি করে খাবার প্রস্তুত করি এবং একটি রাইড শেয়ারিং কোম্পানির মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করি। প্রথমে শুধু মহামারি পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার জন্য এটি শুরু করলেও বর্তমানে এর থেকে প্রাপ্ত আয়ে আমার পরিবারে অনেক স্বচ্ছলতা এসেছে। তাই আগামীতেও এ ব্যবসায়টি চালিয়ে যাবার আশা রাখি।”
হোম ডেলিভারি সার্ভিস সম্পর্কে জানতে আরো কথা হয়েছিল সালমা নাওয়ার রাইসা এর সঙ্গে যিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন। তার প্রেক্ষাপট রাজিয়া আক্তারের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন হলেও তিনিও বর্তমানে তার ব্যবসার আয় নিয়ে সন্তুষ্ট।
“শখের বশেই গত বছর ডিসেম্বরে আমি এ ব্যবসাটি শুরু করি। এরপর ধীরে ধীরে ক্রেতার সংখ্যা যেমন বাড়তে থাকে ঠিক তেমনি আমিও অবসর সময়গুলোকে কাজে লাগানোর একটি সুযোগ পাই। এছাড়া এখান থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে আমার ব্যক্তিগত খরচ ভালোভাবেই মেটানো যায়।”
“অন্যদিকে একটি ডেলিভারি এজেন্সির সাথে চুক্তি থাকায় সময়মত ক্রেতাদেরকে খাবার পৌঁছাতে পারি। আর এ কারণে ক্রেতারাও বেশ খুশি। আগামীতে ব্যবসায়ের পরিসর আরো বড় করার আশা আছে,” ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানাচ্ছিলেন রাইসা।
বর্তমানে ক্রেতারাও এ ধরনের ব্যবসাকে সাদরে গ্রহণ করছেন। প্রায় সবার হাতেই এখন মোবাইল ফোন থাকার সুবাদে চাইলেই এসব ব্যবসায়ের পেইজে গিয়ে পছন্দের খাবার অর্ডার করা যায়। আর ঘরোয়া পরিবেশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে তৈরি খাবারের স্বাদ কে পেতে না চায়!
এরকম একজন নিয়মিত ক্রেতা আবৃত্তি শিল্পী শামীমা আক্তার। তিনি বলেন, “বর্তমানে প্রায়ই চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অনলাইনে খাবার অর্ডার করি। কারণ এতে করে বাহারি সব খাবারের স্বাদ পাওয়া যায়। তাছাড়া, ব্যস্ততার কারণে সব খাবার বানানো হয়ে ওঠে না। ব্যস্ততার মাঝে হোম ডেলিভারিই ভরসা। বিশেষত হোম মেইড খাবার হলে তো সেটি আমাদের কাছে আরো বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়।”
এছাড়া পুঁজির কথায় আসলে দেখা যায় এ ধরনের ব্যবসায়ে পুঁজি বলতে লাগে শুধু একটি মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগ। আর তাই রান্না করার দক্ষতা থাকলে যে কেউই এ ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত হতে পারে। বর্তমানে নারীদের এ ধরনের ব্যবসায়ের উপর ঝোঁক বেশি দেখা যায়। আর এতে করে তারা তাদের নিজের ও পরিবারের স্বচ্ছলতার জন্য একটি বাড়তি আয়ের পথও তৈরি করতে পারেন।
তানজিম হাসান পাটোয়ারী বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশনা করছেন।
tanjimhasan001@gmail.com