logo

গ্রামোফোন থেকে ইয়ার ডটের গল্প

মো. ইমরান খান | Sunday, 21 March 2021


এক. সেই ধুতরার ফুল

সময়টা চল্লিশের দশক। দেশভাগের কিছু সময় আগে। কপাটযুক্ত বড় বড় তাক বিশিষ্ট জানালা, দরজা ও লম্বা বারান্দা নিয়ে পুরোনো ধাঁচের জমিদার বাড়ি। এই বাড়ির সবচেয়ে ছোট্ট শিশু। ধরা যাক নাম তার সংগীত চট্টোপাধ্যায়। সংগীত পুরো বাড়ি দৌড়াদৌড়ি করতে করতে একদিন উপরতলার দক্ষিণমুখী ঘরটিতে পৌঁছায়। সে দেখে, তার দাদু এক হাতে চশমা নিয়ে একটি দোদুল্যমান চেয়ারে হেলান দিয়ে মাথা দোলাচ্ছে। তাঁর পাশে সোনালি বর্ণের ধুতরা ফুলের মতো দেখতে একটি যন্ত্র, যার নিচে একটি সুচালো আংটা গোলাকার কালো প্লেটের সঙ্গে লেগে আছে এবং প্লেটটি ঘুরছে। সেই সঙ্গে ভেসে আসছে একটি গান।

ছোট্ট শিশুটি যন্ত্রটির দিকে তাকিয়ে দাদুকে জিজ্ঞেস করল, ‘এটি কী?’ দাদু বললেন, ‘গ্রামোফোন’। পেছনে বাজছেইয়াদ পিয়া কি আয়ে’—ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ’র বন্দীশ।

ইংরেজ আমলের শেষদিকে উপমহাদেশে এই সোনালি বর্ণের ধুতরা ফুলের মতো যন্ত্রটির বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিশেষ করে আর্থিকভাবে ভালো অবস্থানে আছে এমন পরিবারে দেখতে পাওয়া যেত এই যন্ত্রটি। তখনকার সময়ে বিখ্যাত সব সংগীত শিল্পীর গান রেকর্ড করা হতো এবং তা শোনা হতো গ্রামোফোনে। রবীন্দ্র সংগীত, ওস্তাদ বড় গোলাম আলীর বন্দীশ, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁয়ের সংগীত কিংবা ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁয়ের সানাই-সবকিছু রেকর্ড হয়ে জায়গা পেত গ্রামোফোনগুলোতে। আর গ্রামোফোন ঠাঁই পেত অভিজাত পরিবারগুলোর বিশ্রাম ঘরের একপাশে।

 

দুই. ছোট্ট বাক্সের রেডিও

দেখতে দেখতে কুড়িটি বছর অতিক্রান্ত হলো। সংগীত চট্টোপাধ্যায় এখন বড় হয়েছেন। তার দাদু গত হয়েছেন দেশভাগের পরপরই। সেই সঙ্গে গত হয়েছে তার দাদুর প্রিয় গ্রামোফোনটি। না বাজাতে বাজাতে এটি এখন আর ঠিকঠাক কাজ করছে না।

এখন ঘরে নতুন জায়গা করে নিয়েছে রেডিও। দিনের সব কাজ শেষ করে বাড়ির লোকেরা এই নতুন যন্ত্রটির সামনে বসে। সবাই এক সঙ্গে তখন তাদের পছন্দের গানগুলো শুনে। ঘরের ছেলেরা খেলতে থাকে আর গান শোনে, মায়েরা গান শুনতে শুনতে কাঁথা সেলাই করে। এটি তখনকার নিত্যদিনের দৃশ্য।

রেডিওর বিশেষত্ব হলো, এর ডান পাশের গোলাকার সুইচটি ধরে ঘোরালেই চ্যানেল পরিবর্তন হয়। আর নতুন নতুন গান শোনা যায়। আগে যেটি গ্রামোফোনে সম্ভব ছিল না, সেটি এখন রেডিওতে সম্ভব হচ্ছে।

রেডিওর আরেকটি বিশেষ দিক হলো, এতে বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়। সেসব প্রোগ্রামে আলাপ আলোচনা ও নাটকের পাশাপাশি গানও সম্প্রচার করা হয়। এখানে শিল্পী রেডিও স্টুডিওতে গিয়ে সরাসরি গান শুনিয়ে থাকেন। ভক্তরা তাঁকে সরাসরি শুনতে পেয়ে আরও বেশি আনন্দিত হয়।

 

তিন. তারুণ্যের ওয়াকম্যান

সময়টা তখন আশির দশক। বাজারে রেডিওর পাশাপাশি আরেকটি যন্ত্র এসেছে। নাম তার ওয়াকম্যান। তারযুক্ত হেডসেট একটি বাক্সের সঙ্গে যুক্ত থাকে। বাক্সটিতে সাউন্ড নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কয়েকটি বাটন।

আশির দশকে তরুণদের মাঝে তখন এটি বেশ বিখ্যাত। কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের কানে ইয়ারফোন এবং পকেটে বা হাতে বক্সটি নিয়ে শহরে কিংবা রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত।

 

চার. নব্বইয়ের নস্টালজিয়া ও অডিও ক্যাসেট

এরপর আসে নব্বইয়ের দশক। ছাদের ওপরে অ্যানটেনা ঘুরিয়ে টিভিতে পরিষ্কার দৃশ্য দেখার যুগ। চল্লিশের দশকের সেই ছোট্ট শিশুটি এখন তার জীবনের পড়ন্ত বিকেলে। দিন বদলেছে আর দিন বদলের ছায়া গানের জগতেও পড়েছে।

ক্যাসেটে গান চলতে থাকা অবস্থায় হঠাৎ গান আটকে গেলে হাতের কনিষ্ঠতম আঙুল চোখের মতো দেখতে ক্যাসেটের সরু ছিদ্রে ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ক্যাসেটের রিল ঠিক করা হতো। তারপর আবার ক্যাসেটটি প্লেয়ার প্রবেশ করিয়ে গান শোনা হতো। এটিও ছিল সে সময়ের চেনা দৃশ্য।

নব্বইয়ের দশকের সিনেমার গান, বাংলা ব্যান্ড মিউজিক, বিশেষ করেসোলস’-এরমন শুধু মন ছুঁয়েছে’র পরমাইলস’-এরনীলা তুমি কি জানো না’ হয়ে প্রথম প্রেমের ব্যর্থতা থেকে এলআরবি’রসেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’। এই গানগুলো জুড়েই ছিল মানুষের শৈশব আর যৌবন।

 

পাঁচ.গোলাকার ছোট্ট প্লেট

সংগীত বাবু গানের বিবর্তনে আরেকটি সংযোগ দেখেছেন। এটি হলো সিডি প্লেয়ার। দাদুর ঘরে দেখা সেই গোলাকার প্লেটগুলোর মতোই দেখতে, তবে আকারে ছোট সূর্যের আলোতে বিভিন্ন রং দেখা যায়।

বাংলা ব্যান্ড মিউজিকে ও সেই সঙ্গে নতুন দিগন্ত ছুঁয়েছে। নতুন দিগন্তের পথে সঙ্গী হয়েছে সিডি প্লেয়ার। বাংলা ব্যান্ড মিউজিক থেকে শুরু করে ভারতের সিনেমার বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অ্যালবামগুলো জায়গা করে নিয়েছে সিডি প্লেয়ারের রং পরিবর্তনশীল ডিস্কগুলোতে।

 

ছয়. হাতের মুঠোয় এমপি থ্রির গান 

বৃদ্ধ সংগীত তাঁর নাতি নাতনিদের হাতে এখন ছোট্ট একটি যন্ত্র দেখেন। ম্যাচ বক্সের মতো। তিনি অতি আগ্রহের তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘এটি কি?’ তারা বলে, ‘দাদু, এটি এমপিথ্রি প্লেয়ার। এটায় গান শোনে’।

গান শোনার যন্ত্রগুলোর বিবর্তন দেখে প্রথমবারের মতো আশ্চর্য হয়ে তিনি বলে ওঠেন, ‘তাহলে গান এখন তোমার হাতের মুঠোয়!’

 

সাত. তারযুক্ত এবং তারহীন ইয়ারফোন

সময়টা এখন একবিংশ শতাব্দী। গানের জগতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে গানের যন্ত্রে। এখন আর সিডি প্লেয়ার বা ক্যাসেটের যুগ নেই। ইয়ারফোন বা হেডফোনে করে এমপি থ্রি প্লেয়ার অথবা মোবাইল ফোনের সঙ্গে যুক্ত করে গান শোনা যায়।

ব্যান্ড মিউজিকের পাশাপাশি সিনেমার গান, মিউজিক সবকিছু এখন এই নব্য মাধ্যমে শোনা যায়।

একদিন সে শতাব্দীর পরবর্তী দশকে অর্থাৎ বর্তমান সময়ে ওয়ারলেস বা তারহীন প্রযুক্তির বিকাশ হয়েছে। এখন তারযুক্ত ইয়ারফোনের পাশাপাশি জায়গা করে নিচ্ছে তারহীন ইয়ারফোন বা এয়ার ডট।

বাজারে চলে আসছে বিভিন্ন ধরনের গানের অ্যাপ। অ্যাপগুলো সাবস্ক্রাইব করলে সেখানে পাওয়া যাবে বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন ভাষার হাজার হাজার গান। যেকোনো সময় শুনতে পাওয়া যাবে যেকোনো ধরনের গান।

চল্লিশের দশকে জন্ম নেওয়া সংগীত চট্টোপাধ্যায়ের জন্য এটি কোনো বিস্ময়ের থেকে কম নয়। তিনি কখনো ভাবতেও পারেননি, যে গান শুনতে হলে একটা সময় গ্রামোফোনের মতো বিশাল একটি যন্ত্রের প্রয়োজন হতো, সেটি এখন বিনা কোনো সংযোগে মানুষ শুনতে পাবে।

তার শৈশব কেটেছে গ্রামোফোনে, যৌবন রেডিও, কর্মব্যস্ততা ওয়াকম্যান আর ক্যাসেটে, অবসরযাপন সিডি প্লেয়ার আর আর এমপিথ্রিতে।

এখন তিনি বৃদ্ধ। নতুন ফ্ল্যাটের বারান্দায় চেয়ারে বসে গান শুনছেন। অন্য ঘর থেকে দৌড়ে এসে তার ছোট্ট নাতি জিজ্ঞেস করে, ‘দাদু এটা কী?’ তিনি বলেন, ‘এটা ইয়ার ডট। এটায় গান শোনে।’ এ সময় সংগীতের চোখে ভাসে তাঁর শৈশব, তাঁর দাদু আর সেই গ্রামোফোন।

 

মো. ইমরান খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে (এমএসএস) অধ্যয়নরত।

ইমেইল-mohd. imranasifkhan@gmail. com