logo

গানের জাদুকর মোহাম্মদ রফির জীবনের অজানা যা

মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Sunday, 31 July 2022


১৯৮০ সালের ৩১ জুলাই রাত সাড়ে দশটার দিকে এ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে পরপারে পাড়ি জমান মোহাম্মদ রফি। উপমহাদেশের একসময়েরঅন্যতম জনপ্রিয় এই শিল্পী তার জীবনকালে সাত হাজারের বেশি গান গেয়েছেন ১৪টিরও বেশি ভাষায়। 

রফি রয়ে গেলেন ভারতেই

১৯৪৪ সালে রফির প্লেব্যাক ক্যারিয়ার শুরু হয়। অবশ্য ছোট থেকেই গানে তালিম নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৩৮ সালে মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে তার এক চাচাত বোন বশিরা বিবির সাথে তাকে বিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এক দাঙ্গায় মা-বাবা খুন হলে আর ভারতে থাকতে চাননি বসিরা বিবি। পাকিস্তান চলে যান তিনি। কিন্তু রফি রয়ে গেলেন ভারতেই।

১৯৪৪ সালেই গাঁও কি গোরি সিনেমায় জি.এম.দুররানীর সাথে প্লেব্যাক করেন। রফি তখন বোম্বেতে শিফট করেছেন। বন্ধু আবদুল হামিদের সাথে ১০ ফিট বাই ১০ ফিট এর একটি ঘরে থাকেন। তার সাথে কবি তানভীর নকভির সাথে পরিচয়। এরপর নকভি পরিচয় করিয়ে দেন পরিচালক এ.আর.কারদারের সাথে। 

রফি-নওশাদের অমর জুটি

রফির জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে নওশাদের করা কম্পোজিশনগুলো। ১৯৪৫ সালে এ.আর.কারদারের পেহলে আপ সিনেমায় প্রথম নওশাদের সুরে প্লেব্যাক করেন রফি। ১৯৪৯ সালে দুলারী সিনেমায় করা 'সুহানি রাত ঢাল চুকি' গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সময়ের তুলনায় গানটির সুর ছিলো আধুনিক। গিটার ও বেহালার ব্যবহার এবং রফির কণ্ঠ গানটিকে ভিন্নমাত্রা দেয়।

১৯৫২ সালের বৈজু বাওরা সিনেমায় 'ও দুনিয়াকে রাখওয়ালে' গানটি তাকে শিল্পী হিসেবে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। এটিরও সুরকার ছিলেন নওশাদ।

গুরু দত্ত, দেব আনন্দ ও শাম্মী কাপুরের কণ্ঠে রফি

পঞ্চাশের দশক থেকেই শচীন দেব বর্মণ, শঙ্কর-জয়কিষেন এর মত সঙ্গীত পরিচালকরা রফিকে প্রধান প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন। দেব আনন্দের লিপে সিআইডি (১৯৫৬)সিনেমার খোয়া খোয়া চাঁদ গানটি তুমুল জনপ্রিয় ছিলো। আবার, গুরু দত্তের লিপে তার প্রায় সব সিনেমাতেই তিনি গান করেছেন। গুরুর চৌদভিঁ কা চাঁদ(১৯৬০) সিনেমার টাইটেল গানটিকে তার অন্যতম সেরা কাজ ধরা হয়।

আবার, শাম্মী কাপুরের লিপে 'চাহে কোয়ি মুঝে জাংলি কাহে' (জংলি: ১৯৬০) কিংবা কাশ্মীর কি কালি (১৯৬৪) সিনেমায় 'ইয়ে চাঁদ সা রশন চেহরা' গানগুলো তুমুল জনপ্রিয় ছিলো।

রফি ক্লাসিকালবা শাস্ত্রীয় সংগীতে যেমন পারদর্শী ছিলেন, তেমনি দ্রুত লয়ের গানেও বেশ পারদর্শিতা দেখান। যেমন- 'বাদান পে সিতারে লাপেটে হুয়ে।'

এছাড়া দোস্তি (১৯৬৪) সিনেমার 'চাঁহুগা মে তুছে সাঁঝ সাভেরে' গানটি লক্ষ্মীকান্ত-পেয়ারেলালকে শক্তভিত্তি দিয়েছিল।

১৯৬৬ সালে সুরাজ সিনেমায় রাজেন্দ্র কুমারের লিপে 'বাঁহারো ফুল বারসায়ো' তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ।

কিশোর কুমারের জন্য একাধিকবার প্লে ব্যাক করেছিলেন রফি। চলতি কা নাম গাড়ি সহ আরো কিছু সিনেমায়। নায়ক হিসেবে কিশোরেরই সেসব করার কথা ছিলো, তবে তার অনুরোধেই আরো ভালোভাবে গানগুলো করার জন্য রফিকে দিয়ে প্লেব্যাক করানো হয়।


কিশোর কুমার ও মোহাম্মদ রাফি (বামে),  ছবি:ইন্ডিয়ানএক্সপ্রেস.কম

আরাধনা (১৯৬৯) সিনেমাটি রাজেশ খান্নাকে নায়ক হিসেবে শীর্ষস্থানে নিয়ে যায়। এই ছবির প্রথম দুটো গান রফি রেকর্ড করেন। পরবর্তীতে হজ্ব পালনের জন্য ছেলেকে নিয়ে মক্কায় গেলে রাহুল দেব বর্মণ বাকি গানগুলো কিশোর কুমারকে দিয়ে রেকর্ড করান। এই সিনেমা কিশোরকে পরিণত করে শীর্ষ গায়কে।

কিশোর রফির খুব ভক্ত ছিলেন। তবে রাজেশ তার ভোকাল হিসেবে সবসময় কিশোরকে নেয়ার জন্য প্রযোজকদের চাপ প্রয়োগ করতে থাকায় রফির এ সময়ে গানের সংখ্যা কমতে থাকে। 

তবে এ সময়ে দ্য ট্রেন (১৯৭০) সিনেমার গুলাবি আঁখে জো তেরি দেখি কিংবা লোফার (১৯৭৩) সিনেমার 'আজ মৌসাম বড়া বেইমান হ্যায়' গানগুলোতে তিনি কাজ করেন।

১৯৭৫ - এ সঞ্জয় গান্ধীর ইচ্ছানুযায়ী রাষ্ট্রীয় সব গণমাধ্যম থেকে কিশোর নিষিদ্ধ হলে রফির দিকে আবার প্রযোজক-সঙ্গীত পরিচালকরা ঝুঁকতে থাকেন।

১৯৭৭ সাল ছিলো রফির আবার শীর্ষে আরোহণের বছর। হাম কিসিসে কাম নেহি সিনেমার 'ক্যায়া হুয়া তেরা ওয়াদা' গানের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ারে সেরা গায়ক ও জাতীয় পুরস্কার পান। এই সাফল্যের ধারা তার মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

বাংলা গানে রফি

রফি প্রথম বাংলা গান রেকর্ড করেন ১৯৫৮ সালে,ইন্দ্রাণীসিনেমায় নচিকেতা ঘোষের সুরে। এই গানের জন্য পারিশ্রমিক ছিলো মাত্র পাঁচশ টাকা। তিনি প্রথমে এটা ভেবে অবাক হন যে, এত কম  টাকায় কীভাবে রেকর্ড সম্ভব। পরে বিনা পারিশ্রমিকেই গানটি রেকর্ড করে দেন।

রফি 'ওই দূর দিগন্ত পারে', 'পাখিটার বুকে যেন তীর মেরো না'-র মত বাংলা গান করেছেন।

জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ে 'তোমার নীল দোপাটি চোখ', 'এবার তাহলে আমি যাই'- এর মত গান করেছেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুরে।

কিছু মন কষাকষি

১৯৬১ সালে 'মায়া' সিনেমার গান রেকর্ডের সময় লতা মঙ্গেশকর বারবার একটি নোটে তার ভুল ধরেছিলেন। সলিল চৌধুরীর সঙ্গীতে রফির গায়কীতে ভুল ছিলো না। তবুও তাকে অবাক করে সলিল পরে লতাকেই ঠিক বলে দেন। এতে বেশ কষ্ট পান রফি।

আবার, শঙ্কর-জয়কিষানের এক গানের রেকর্ডে দেরি হয়ে যাওয়ায় ও.পি নাইয়ারের সাথে নির্ধারিত শিডিউল রেকর্ডে পৌঁছতে তার দেরি হয়। রফি সত্যিস্বীকার ও দুঃখপ্রকাশ করেন। কিন্তু নাইয়ার রেকর্ড তো ক্যান্সেল করেনই, সাথে পরবর্তী তিন বছরের জন্য তার সাথে কাজ করা বন্ধ রেখেছিলেন। 

রয়ালটি মুভমেন্ট বিতর্ক

ষাটের দশকে লতা মঙ্গেশকর প্লেব্যাক শিল্পীদের জন্য ৫ শতাংশ হারে রয়ালটি চেয়েছিলেন। এজন্য গণস্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু হয়। তিনি সমর্থনের জন্য রফির কাছে গেলে সমর্থন পাননি। রফির মত ছিলো, যেহেতু প্রযোজক আর্থিক ঝুঁকি নিচ্ছেন, সঙ্গীত পরিচালক গানটির সঙ্গীতায়োজন করছেন; সেক্ষেত্রে রয়ালটি তারা পাওয়াটাই ঠিক। এখানে প্লেব্যাক থেকে শিল্পীদের আবার রয়ালটি নেয়ার প্রয়োজন দেখেননি তিনি। এতে লতার সাথে তার মনোমালিন্য তৈরি হয়।





                    সঙ্গীত পরিচালক লক্ষ্মীকান্ত- প্যায়ারলালের সাথে লতা ও রফি, ছবি: লক্ষ্মীকান্তপ্যায়ারেলাল.কম




গিনেক বুক অভ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে রফি

১৯৭৭ সালে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ডের জন্য লতা মঙ্গেশকর গিনেস বুক অভ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ নাম লেখান। রফি গিনেসের কাছে লেখা এক চিঠিতে জানান, তার গানের সংখ্যাও ওই পরিমাণ। বিগত তেত্রিশ বছরে তিনি এরচেয়ে বেশি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। বিবিসিতে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই সংখ্যা ২৫০০০ এর বেশি বলেন। গিনেজ তখনই আবেদনটি আমলে নেয়নি। ১৯৮৪ সালে রফি লতার সাথে যৌথভাবে এই রেকর্ডের ভাগিদার হন। পরে অবশ্য আশা ভোঁসলে রেকর্ডটি ভেঙেছেন।

১৯৮০ সালের ১ আগস্ট তার জানাজায় রেকর্ড পরিমাণ লোক হয়েছিল। ভারতে সে সময়ে মুসলিমদের ভেতর সবচেয়ে বড় জানাজা হয়েছিলো তার। বিপুল সংখ্যক মানুষের ঢল নেমেছিলো তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।

 

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

mahmudnewaz939@gmail.com