গর্ভকালীন সময়ে নারীদের যা যা করণীয়
শবনম জাবীন জেবা | Monday, 7 March 2022
গর্ভধারণ এবং গর্ভকালীন সময়টা একজন নারীর জীবনে যেমন সুখের ঠিক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে নারী সত্তা আরেকটি নতুন রূপ পেতে যাচ্ছে, অপরদিকে শরীরের মাঝে ছোট্ট একটি প্রাণ ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে।
এসময় মা যা খাবে তা থেকে অনাগত শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করবে, হাসিতে সে হাসবে, কাঁদলে সে কষ্ট পাবে আর মাঝে মাঝে হাত-পা নাড়িয়ে তার অস্তিত্বের বার্তা দিতে থাকবে। গর্ভধারণের এই পুরো সময়টা একজন গর্ভবতী নারীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই খেয়াল রাখতে হয় বেশকিছু বিষয়ে।
খাবার-দাবার
গর্ভকালীন সময়ে কিছু কিছু খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকাই ভালো, যেমন- পুরোপুরিভাবে রান্না না হওয়া মাংস, প্রক্রিয়াজাত মাছ (ক্যানড ফিস), কাঁচা ডিম, অপাস্তুরিত দুধ থেকে প্রস্তুতকৃত পনির, অপাস্তুরিত দুগ্ধজাত খাবার, অংকুরিত মটরশুঁটি, বিভিন্ন ধরনের এনার্জি ড্রিংক, অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার ইত্যাদি। এই সকল খাবার গ্রহণে মা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে এমনকি গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি হতে পারে।
ক্যাফেইন
অতিরিক্ত ক্যাফেইন মিসক্যারেজসহ অন্যান্য জটিলতার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। তবে অল্প পরিমাণে ক্যাফেইন সমৃদ্ধ পানীয় পান করা নিরাপদ।
ঔষধপত্র
গর্ভাবস্থায় কোনো ঔষধ সেবনের পূর্বে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। এমনকি নাপা বা এসিডিটির জন্য সচরাচর যে ঔষধগুলো সেবন করা হয়ে থাকে সেগুলোও এই সময় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ না করাই ভালো।
এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ব্যথানাশক ঔষধ, যেমন - অ্যাসপিরিন, ইবুপ্রুফেন, ন্যাপ্রোক্সেন সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে। এই ঔষধগুলো সেবনের ফলে গর্ভস্থ শিশুর শরীরে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
উঁচু জুতা-স্যান্ডেল/হাই হিল পরিধান
গর্ভকালীন সময়ে উঁচু জুতা-স্যান্ডেল পড়া সম্পূর্ণভাবে বাদ দিতে হবে। সময়ের সাথে সাথে গর্ভস্থ শিশু বেড়ে উঠে এবং শরীরের ওজন বেড়ে যায়।
এসময় সহজে ও সাবধানতার সাথে চলাফেরা করার জন্য এ ধরনের উঁচু জুতা-স্যান্ডেল পড়া যাবে না। চলাফেরার সময় সবসময় শরীরের ভারসাম্য ঠিক নাও থাকতে পারে, তাই ঝুঁকি এড়িয়ে চলার জন্য সমতল পৃষ্ঠের আরামদায়ক জুতা-স্যান্ডেল পড়া ভালো।
দীর্ঘসময় ধরে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা
গর্ভাবস্থায় দীর্ঘসময় ধরে যেকোনো একভাবে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা উচিৎ নয়। বসে থাকার সময়ে চেষ্টা করতে হবে পা দুটোকে অপেক্ষাকৃত একটু উঁচু করে রাখার। দীর্ঘসময় একইভাবে থাকলে বা পা ঝুলিয়ে বসে থাকলে পা ও পায়ের গোড়ালি ফুলে যেতে পারে, পায়ে পানি আসতে পারে এবং রক্ত চলাচলে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গরম পানিতে গোসল
অনেকেই এসময় গরম পানি দিয়ে গোসল করে থাকেন। এতে করে শরীরে ব্যথা থাকলে বেশ আরাম পাওয়া যায়। তবে প্রথম তিনমাস এটা করা অনুচিত, নতুবা গর্ভাবস্থায় সন্তানের নানা রকম জটিলতা তৈরি হতে পারে। গরম পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পানির তাপমাত্রা যদি ১০৪഼ ফারেনহাইট তাপমাত্রার কাছাকাছি বা বেশি হয় তাহলে তা এড়িয়ে চলাই উত্তম।
চুলে রং করা থেকে বিরত থাকা
অনেকে চুলের সৌন্দর্য বাড়াতে বিভিন্ন পার্লার বা সেলুনে গিয়ে চুলে কৃত্রিম রং করে থাকেন। গর্ভাবস্থায় চুলের রং করা থেকে বিরত থাকাই ভালো। গর্ভাবস্থায় শরীরে প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খানিকটা ভিন্নভাবে প্রতিটি জিনিসের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকে, চুলের রং শোষণের ক্ষেত্রেও ভিন্নরূপ ঘটতে পারে। এছাড়াও রঙে রাসায়নিকের মাত্রা বেশি থাকলে তা শরীরের ক্ষতি তথা গর্ভস্থ সন্তানের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে।
প্রাকৃতিকভাবে চুলে রং করার জন্য মেহেদী পাতা ব্যবহার করা যেতে পারে যা সম্পূর্ণ নিরাপদ।
ঘরের জিনিসপত্র পরিষ্কার করা
ঘরের জিনিসপত্র পরিষ্কার করার সময় সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমত, ধুলাবালি পরিষ্কারের পূর্বে ঘরের দরজা-জানালা সম্পূর্ণ খুলে দিতে হবে। জিনিসপত্র পরিষ্কারের ক্ষেত্রে পরিষ্কারক পদার্থ বা কেমিক্যাল ব্যবহারের পূর্বে বোতলের গায়ের লেবেলটা ভালো করে পড়ে নিতে হবে। যদি তাতে গর্ভবতী নারীদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতার কথা লেখা থাকে তাহলে তা ব্যবহার করা যাবে না বা খুবই সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হবে।
এছাড়াও ঘরের আনাচে কানাচে, বাথরুমে, আলমারীতে কাপড়ের ভাঁজে ন্যাপথলিন দেওয়া হয়। অধিকমাত্রায় ন্যাপথলিনের সংস্পর্শে আসলে তা রক্তকোষ ধ্বংস করে দেয় এবং হেমোলাইটিক অ্যানিমিয়ার কারণ হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়- ক্ষুধামন্দা, অবসন্নতা, বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া এ ধরনের সমস্যাগুলোও দেখা দেয় এবং গর্ভস্থ শিশুর জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পড়ার ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাই করতে হবে
নতুন মা হওয়ার ক্ষেত্রে সবটাই একদম নতুন। গর্ভাবস্থা, গর্ভে শিশুর বেড়ে উঠা, ভালো-মন্দ সবকিছু নিয়েই তাই একজন গর্ভবতী মহিলার জানার আগ্রহ থাকে তুমুল। একজন হবু মা বিভিন্ন বই, ম্যাগাজিন, ইন্টারনেট ঘেটে নানান ধরনের তথ্য জানার চেষ্টা করে থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে এসব মাধ্যমে এই বিষয়গুলো নিয়ে অনেক সময় প্রচুর বিতর্কিত তথ্য থাকে।
তাই বিভিন্ন মাধ্যম থেকে কোনো কিছু জেনে বিশ্বাস করার পূর্বে তা ভালো করে যাচাই করতে হবে নতুবা গর্ভজাত সন্তান অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতার সম্মুখীন হতে পারে। সবচেয়ে ভালো হয় কোনো কিছু জানার থাকলে অভিজ্ঞদের কাছে জিজ্ঞেস করা বা চিকিৎসকের কাছ থেকেও জেনে নেওয়া।
ম্যাসেজ বা ব্যায়াম
গর্ভাবস্থায় ম্যাসেজ নেয়া বা ব্যায়াম করলে শরীর ভালো থাকে, তবে এক্ষেত্রে প্রথমে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সাধারণত যে ধরনের ব্যায়াম বা কাজগুলো বর্জনীয় তা হচ্ছে-
- উঠবস করা
- ভার উত্তোলন করা
- লাফ দেওয়া
- চলতে চলতে হঠাৎ করে তীব্রবেগে দিক পরিবর্তন করা
- পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এমন ব্যায়াম করা
এসব ব্যায়ামের ফলে শরীরের জোড়াগুলোতে চাপের সৃষ্টি হয় এবং জরায়ুতেও চাপ পড়তে পারে, যা অনেকসময় নির্ধারিত সময়ের পূর্বে প্রসব ব্যথা উঠা বা রক্তক্ষরণের কারণ হতে পারে।
দূরপাল্লার ভ্রমণ
যেসব গর্ভবতী নারীদের গর্ভকালীন সময়ে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা, যেমন-উচ্চ রক্তচাপ, রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার শঙ্কা, মিসক্যারেজ হওয়ার সম্ভাবনা বা অন্যান্য ধরনের সমস্যা রয়েছে তাদেরকে দূরে ভ্রমণ যেতে নিষেধ করা হয়। যেকোনো ধরনের সমস্যা হলে যাতে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যেতে পারে, এজন্য বাড়িতেই নিরাপদে থাকতে বলা হয়।
বাড়িতে রং করানো
বাড়িতে যখন নতুন রং করা হয় তা থেকে নিঃসৃত গ্যাস একজন গর্ভবতী মা বা তার গর্ভের সন্তানের জন্য খুব পরোক্ষ ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষত, গর্ভাবস্থার প্রথম ৩ মাসে যখন শিশুর অঙ্গ–প্রত্যঙ্গগুলো গঠন হওয়া শুরু হয় তখন এই সামান্য পরিমাণ ক্ষতিই শিশুটির জন্য ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় বাড়িতে রং না করাই ভালো।
বিড়াল পোষা
বিড়ালের পায়খানায় টক্সোপ্লাজমা গোন্ডি নামক এক ধরনের পরজীবী থাকে যা মানবদেহে টক্সোপ্লাজমোসিস নামক এক ধরনের সংক্রমণের জন্য দায়ী। বিশেষত, গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে এই ইনফেকশনে আক্রান্ত হলে গর্ভের শিশুর ব্রেইন ড্যামেজ হতে পারে এবং অন্ধ হয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। তাই গর্ভাবস্থায় বিড়ালের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা বা বাড়িতে বিড়াল না রাখাই ভালো।
এক্স-রে ও অন্যান্য বিকিরণের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা
এক্স-রে ও অন্যান্য রশ্মির বিকিরণ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে হবে। চিকিৎসকগণও গর্ভাবস্থায় এগুলো এড়িয়ে চলতে উপদেশ দেন, চিকিৎসার প্রয়োজনে অনেক সময় তারা এর বিকল্প হিসেবে অন্যান্য পথ বাতলে দেন। বারবার এ ধরনের বিকিরণের সংস্পর্শে আসলে দেহের কোষ ধ্বংস হয়ে যায় এবং ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
কীটনাশক স্প্রে
ঘরে পোকামাকড় নিধনের জন্য অনেকসময় বিভিন্ন ধরনের স্প্রে ব্যবহার করা হয় যা এক কথায় ‘বিষ’। তাই গর্ভাবস্থায় এগুলোর ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে। অন্যথা মিসক্যারেজ, নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই প্রসব ব্যথা এবং বাচ্চার জন্মগতভাবে কিছু ত্রুটির শিকার হতে পারে।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com