logo

খুশির বাকসো আইসক্রিম

ইশরাত জাহান তৃষা | Wednesday, 8 September 2021


ঘন্টার টিংটিং শব্দ শুনলে প্রথমে স্কুলের ছুটির ঘণ্টা মনে পড়লেও দ্বিতীয়টি অবশ্যই আইসক্রিম ওয়ালার আসার বার্তা। এখন অধিকাংশ মানুষই নিজেদের ফ্রিজে আইসক্রিম সংগ্রহ করে থাকেন, কিন্তু দশ-বারো বছর আগেও ঘরে ঘরে ফ্রিজ থাকার কথা ভাবাটা ছিল স্বপ্নের মতো। খুঁজলে হাতেগোনা কিছু দোকানে ফ্রিজ থাকতো, কিন্তু থাকতো না তেমন কোনো ভিন্ন স্বাদের রকমফের। তখন এই আইসক্রিমওলার ঘণ্টার টিংটিং শব্দ বাচ্চা-বুড়ো সবার মুখে হাসি ফোটাতো।

আইসক্রিমের চাহিদা এবং সহজলভ্যতার কারনে আগেকার ১ টাকা দামের বরফ আইসক্রিমের সাথে আজকের প্রজন্ম খুব একটা পরিচিত নয়। ইতিহাসের বই পড়লেই জানা যায় শায়েস্তা খাঁ-র শাসন আমলে ১ টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। আর এখন ১ টাকার নোটের সাথেই পরিচিতি নেই। এক টাকায় আইসক্রিম পাওয়া যেত, এটাও ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তাজ্জবের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে হয়তো।

হ্যাঁ, এক টাকায় পাওয়া যেত রঙিন বরফ আইসক্রিম, দুই টাকায় দুধ নারকেলের আইসক্রিম, তিন টাকায় পাওয়া যেত সেভেন-আপ আইসক্রিম আর ৫ টাকায় মিলতো মালাই।

এখন বিভিন্ন নামকরা কোম্পানি আইসক্রিম বাজারজাতকরণ করে থাকে। আজকাল আইসক্রিম খাওয়ার জন্য আইসক্রিম পার্লারের সুব্যবস্থা আছে। পাড়ার মোড়ের দোকানেই মিলে যায় বিভিন্ন ফ্লেভারের আইসক্রিম। আর আইসক্রিম বানানো তো এখন খুবই সহজ। ইউটিউব খুলে রেসিপি সার্চ করলেই আইসক্রিম বানানোর রেসিপি সামনে চলে আসে। সহজেই বানিয়ে ফেলা যায় ভ্যানিলা, চকলেট, স্ট্রবেরি ফ্লেভারের আইসক্রিম। আজকের এ লেখায় শুরুটা স্মৃতিময় অতীত দিয়ে হলেও শেষটা হবে বর্তমান বাজারের জনপ্রিয় আইসক্রিমগুলো নিয়ে।

চকবার

স্বল্পমূল্যে মুখরোচক আইসক্রিমের মধ্যে চকবারের নামটাই সবার আগে মনে পড়ে। ভ্যানিলা আইসক্রিমের ওপরে চকলেটের আবরণ দেয়া এই আইসক্রিম ছোটদের অনেক বেশিই পছন্দ। আইসক্রিম ও চকলেট দুটোরই চাহিদা মেটাতে সক্ষম এই আইসক্রিম।

কোণ

বাজারে একাধিক ফ্লেভারের কোণ আইসক্রিম পাওয়া গেলেও ভ্যানিলা ও চকলেট ফ্লেভারকে হার মানাতে পারেনি কেউই। চকলেট চিপস্ ও পিনাট সমৃদ্ধ কোণ আইসক্রিমের সর্বত্র জয়জয়কার।

কাপ

ছোট কাপ আইসক্রিমই প্রথম ভ্যানিলা আইসক্রিম। নিত্যনতুন ফ্লেভারের সাথে পাল্লা দিয়ে অনেকের মনে জায়গা দখল করে রেখেছে এই কাপ আইসক্রিম।

স্টিক বা কাঠি

এখন পাওয়া যায় উন্নত মানের ললি স্টিক ও দুধ মালাই আইসক্রিম। স্টিক আইসক্রিমের মধ্যে ফ্লেভারের কোনো শেষ নেই। ম্যাংগো, অরেঞ্জ ও লেমন ফ্লেভারের আইসক্রিম আমাদের দেশে বেশি প্রচলিত।

ফ্যামিলি আইস কেক

আইসক্রিমের নাম ‘ফ্যামিলি আইস কেক’ মানেই এটি জন্মদিনের কেক নয়। পরিবারের সকলের জন্য আইসক্রিম কিনতে হলে এই ফ্যামিলি আইস কেকই উপযুক্ত। পরিমাণে ঠিক বলে আবার স্বাদেও পিছিয়ে নেই।

কাস্টমাইজড

আইসক্রিম পার্লার গুলোতে বাজারে কিনতে পাওয়া কোম্পানির আইসক্রিমগুলো থাকে না। থাকে তাদের নিজস্ব রেসিপির কিছু আইসক্রিম। ভোক্তা চাহিদা অনুযায়ী, তারা আইসক্রিম তৈরি করে দিয়ে থাকে। আইসক্রিমে ব্যবহৃত ওয়াফেল এর স্বাদ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। একই বাটিতে একাধিক ফ্লেভার থাকায় কাস্টমাইজড আইসক্রিমের চাহিদাও এখন বাড়তে শুরু করেছে।

ফালুদা

ফালুদা সাধারণত তৈরি করা হয় সাগুদানা, দুধ ও বিভিন্ন ফল দিয়ে। ফালুদার সাথে আইসক্রিম মিশিয়ে বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় পরিবেশন করা হয় ফালুদা আইসক্রিম। রেস্তোরাঁ ভেদে ফালুদা আইসক্রিমের ফ্লেভারেও কিছু ভিন্নতা থাকে।

বাজারে, রেস্তোরাঁয় বা আইসক্রিম পার্লারে রকমারি আইসক্রিম পাওয়া গেলেও বাড়িতে নিজেদের বানানো আইসক্রিমের সাথে সেগুলোর তুলনা হয় না। বাড়িতে সহজেই বানিয়ে ফেলা যায় এমন ভিন্ন কিছু আইসক্রিমের কথা এবার জানা যাক।

ফ্রোজেন ইয়োগার্ট

ফ্রোজেন ইয়োগার্ট আমাদের দেশে খুব বেশি পরিচিত নয়। ইয়োগার্টের সাথে পরিমাণ মতো চিনি বা মধু দিয়ে অনবরত বিট করে ফ্রোজেন ইয়োগার্ট আইসক্রিম তৈরি করা হয়। ইয়োগার্ট ফুলেফেঁপে ওঠা পর্যন্ত বিট করার পর ফয়েল পেপার বা পলিথিন দিয়ে ঢেকে ফ্রিজে ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য রেখে দিতে হবে। ৩০ মিনিট পর আইসক্রিম বাটি বের করে আরেকবার বিট করে ২ ঘণ্টার জন্য রেখে দিতে হবে। তারপর ইচ্ছে মতো সাজালেই তৈরি হয়ে যাবে তা।

কুলফি

আইসক্রিমের জগতে কুলফির আগমনই প্রথম। কিন্তু বর্তমানে উচ্চমূল্যের কারণে অনেকেই এড়িয়ে চলেন। কিন্তু এই কুলফি সহজেই বাড়িতে বানানো যায়। কুলফি বানানোর জন্য একটি পাত্রে ২ কাপ দুধ ও স্বাদ অনুযায়ী চিনি দিয়ে জাল দিতে হয়। সেই দুধ এককাপ পরিমাণ হয়ে আসলে নামিয়ে একদম ঠাণ্ডা করে, আমের স্বাদ চাইলে তা মিষ্টি আমের সাথে ব্লেন্ড করে কুলফির ছাঁচে ভরে ফ্রিজে রাখতে হয় । ভালোমতো জমে গেলেই পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায় মজাদার ম্যাংগো কুলফি।

লক্ষনীয় বিষয় হলো, আইসক্রিম মুখরোচক ও তৃপ্তিদায়ক খাবার হলেও এর খাদ্যগুন নেই বললেই চলে। আইসক্রিমে থাকে অতিরিক্ত মাত্রায় ফ্যাট, যা আমাদের শরীরে মেদের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ছোটদেরকে আইসক্রিম দেবার আগে অবশ্যই যাচাই করে নেওয়া উচিত, তাদের দাঁতে ক্যাভিটিজ আছে কি না। অতিরিক্ত আইসক্রিম ক্যাভিটিজের কারণ হতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আইসক্রিম খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরিমিত পরিমাণ আইসক্রিম যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, আবার অধিক মাত্রায় আইসক্রিম খাওয়াও বয়ে আনতে পারে স্বাস্থ্যজনিত নানা সমস্যা।

 

ইশরাত জাহান তৃষা বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ, দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

Email: israttrishaf3@gmail.com