logo

খাদ্য ঘাটতির ‘আশঙ্কা নেই’, অংক কষে জানালেন খাদ্যমন্ত্রী

Tuesday, 29 March 2022


ইউক্রেইন যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও দাম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও চলতি অর্থবছর দেশে খাদ্য ঘাটতির কোনো শঙ্কা দেখছেন না খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে অংক করে তিনি দেখিয়েছেন, জনসংখ্যার হিসাবে যে চাহিদা, তার চেয়ে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেশি হওয়ার কথা। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।

সরকারি দলের সদস্য আলী আজমের প্রশ্নের জবাবে খাদ্যমন্ত্রী জানান, দেশে ২০২০-২১ অর্থ বছরে খাদ্যশস্যের কোনো ঘাটতি ছিল না, ২০২১-২২ অর্থ বছরেও ঘাটতি হওয়ার ‘কোনো আশঙ্কা নেই’।

তার দেওয়া হিসাব অনুাযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয় ৪০৭ দশমিক ০৭ লাখ টন (৩৯৪ দশমিক ৮১ লাখ টন চাল এবং ১২ দশমিক ২৬ লাখ টন গম) খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (এইচআইইএস-২০১৬) অনুসারে মানুষের দৈনিক গড় খাদ্যশস্য গ্রহণের পরিমাণ ৩৮৭ গ্রাম (চাল ৩৬৭ দশমিক ২ গ্রাম এবং গম ১০ দশমিক ৮ গ্রাম)।

সে হিসেবে ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬৯ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ধরলে (প্রাক্কলিত) মোট খাদ্যশস্যের প্রয়োজন ছিল ২৩৯ দশমিক ১৪ লাখ টন (চাল ২২৬ দশমিক ৯০ লাখ টন এবং গম ১২ দশমিক ২৪ লাখ টন), যা ২০২০-২১ অর্থবছরে খাদ্যশস্যের মোট উৎপদানের তুলনায় কম।

আবার দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক দশমিক ৩৭ শতাংশ বিবেচনা করলে ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি দেশের মোট জনসংখ্যা দাড়াবে ১৭১ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন (প্রাক্কলিত)। সে হিসেবে দেশে খাদ্যশস্যের মোট চাহিদা হবে ২৪২ দশমিক ৩০ লাখ টন। সেটাও ২০২১-২২ অর্থবছরের খাদ্যশস্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম।

এই হিসাব থেকে মন্ত্রী উপসংহার টানছেন, “দেশে খাদ্য ঘাটতির কোনো আশঙ্কা নেই।”

সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ মমতা হেনার প্রশ্নের জবাবে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, আগামী ১ এপ্রিল থেকে অভ্যন্তরীণ গম সংগ্রহ এবং ২৮ এপ্রিল থেকে বোরো সংগ্রহের মৌসুম শুরু হবে।


বিএনপির মোশারফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, আসন্ন বোরো মৌসুমে সরকার সাড়ে ছয় লাখ টন ধান, ১১ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ৫০ হাজার টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

‘বাজার সহনীয় পর্যায়ে আসতে শুরু করেছে’

সরকারি দলের শফিউল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল ও সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নানামুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে।

“সম্প্রতি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের ফলে পণ্য মূল্য স্থিতিশীল ও সহনীয় পর্যায়ে আসতে শুরু করেছে।”

জাতীয় পার্টির রুস্তম আলী ফরাজীর এক প্রশ্নের উত্তরে বাণিজ্য মন্ত্রী বলেন, দেশে প্রায়ই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীর দাম হঠাৎ করে উর্দ্ধমুখী হয়ে যায়। এর কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি। অনেক সময় প্রাকৃতিক কারণে উৎপাদন ব্যহত হলেও দেশের বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়।

মন্ত্রী বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল ও সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় সভা, ‘দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা ও পূর্ভাবাস সেল’-এর মাধ্যমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেড কমিশন, টিসিবি, এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

এছাড়া জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ঢাকাসহ সকল মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। এ অধিদপ্তর প্রত্যেক মাসে সারাদেশে তিনশর বেশি বাজার পরিদর্শন ও অভিযান পরিচালনা করছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “পণ্যের মূল্য নিয়ে কেউ যাতে মনোপলি বা অলিগোপালি অবস্থার সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য প্রতিযোগিতা কমিশন কাজ করে যাচ্ছে।”

সরকারি দলের সাংসদ এম আব্দুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সম্প্রতি দেশের বাজারে ভোজ্য তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করায় ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল ও সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।”

বাণিজ্য ঘাটতি ১৬ হাজার মিলিয়ন ডলার

সরকারি দলের এবাদুল করিমের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানান, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পরিমাণ ৪৫ হাজার ৩৬৭ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার এবং আমদানির পরিমাণ ৬১হাজার ৬০৯ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার।

তাতে ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ২৪২ দশমিক ০১ মিলিয়ন ডলার। এই ঘাটতি কমিয়ে আনতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

সংরক্ষিত আসনের লুৎফুন নেসা খানের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ‘নানা কার্যক্রম’ গ্রহণ করায় ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমশ কমছে। ২০১০-২০১১ অর্থবছরে ভারতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫১২ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে তা বেড়ে এক হাজার ২৭৯ দশমিক ৬৭ ডলারে উন্নীত হয়েছে।

“ভারতের সঙ্গে কমপ্রিহেন্সিভ ইকনোমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) সম্পাদনের বিষয়ে যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সিইপিএ সই হলে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোসহ ভারতে বাণিজ্য সম্প্রসারণ আরও তরান্বিত হবে।”

২০ দেশে বাণিজ্যিক মিশন

গণফোরামের এমপি মোকব্বির খানের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের ২০টি দেশে এখন বাংলাদেশের বাণিজ্যিক মিশন রয়েছে।

মিশনগুলো হলো অস্ট্রেলিয়া (ক্যানবেরা), বেলজিয়াম (ব্রাসেলস), কানাডা (অটোয়া), চীন (বেইজিং ও কুনমিং), ফ্রান্স (প্যারিস), জার্মানি (বার্লিন), ভারত (দিল্লী ও কলকাতা), ইরান (তেহরান), জাপান (টোকিও), মিয়ানমার (ইয়াংগন), মালয়েশিয়া (কুয়ালালামপুর), রাশিয়া (মস্কো), দক্ষিণ কোরিয়া (সিউল), সিঙ্গাপুর (সিঙ্গাপুর), স্পেন (মাদ্রিদ), সুইজারল্যান্ড (জেনিভা), যুক্তরাষ্ট্র (ওয়াশিংটন ও লস এঞ্জেলেস), যুক্তরাজ্য (লন্ডন), সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই) এবং সৌদ আরব (জেদ্দা)। এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৭ হাজার ৬৪৭ দশমিক ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বৈদেশিক বাণিজ্য ও লেনদেন ভারসাম্য রক্ষায় সরকার ‘বিভিন্ন কর্মসূচি’ গ্রহণ করেছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।