logo

ক্যান্ডিফ্লসের মিষ্টি স্বাদে!

ইশতিয়াক খান কাব্য | Thursday, 14 July 2022


ছেলেবেলার বা স্কুলজীবনের অন্যতম আকর্ষণ ‘হাওয়াই মিঠাই’ চেনেন না, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। কেবল বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বেই বেশ সমাদৃত এই হাওয়াই মিঠাই বিশ্বব্যাপী পরিচিত ‘ক্যান্ডিফ্লস’ নামে। ক্যান্ডিফ্লসকে উত্তর আমেরিকাসহ কিছু দেশে বলা হয় ‘কটন ক্যান্ডি’। আবার ইউরোপের কিছু অঞ্চলে একে বলা হয় ‘ফেয়ারী ফ্লস’। সরু কাঠির উপর একখন্ড মেঘের আদলে তৈরি ক্যান্ডিফ্লস শিশু-কিশোর থেকে তরুণ-তরূণী কিংবা বয়োঃবৃদ্ধ, সকলেরই বেশ পছন্দের!

ক্যান্ডিফ্লস এর ইতিবৃত্ত

চৌদ্দ শতকে প্রথম ইতালীতে ক্যান্ডিফ্লসের উৎপত্তি ঘটে। এরপর তা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইউরোপে। বাংলাদেশে ক্যান্ডিফ্লস প্রথম আসে পর্তুগীজদের হাত ধরে, আঠারো শতকের দিকে। প্রথমে ক্যান্ডিফ্লস ঘরোয়াভাবে চিনির ঘন রস থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে সুতোর মতো তৈরি করে বানানো হতো। এই পদ্ধতিতে আঠারো শতক পর্যন্ত তৈরি করা হলেও তা লাভজনক ছিল না। উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় ক্যান্ডিফ্লস সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিল না। এজন্য এটিকে ধরা হতো উচ্চবিত্তদের বিলাসী খাদ্যপণ্য হিসেবেই।

উনিশ শতকের শেষ দিকে ১৮৯৭ সালে সর্বপ্রথম মার্কিন নাগরিক ও ডেন্টিস্ট উইলিয়ম মরিসন ও জন সি. ওয়ারটন ক্যান্ডিফ্লস তৈরির যন্ত্র তৈরি করেন। শুরুতে জনপ্রিয়তা না পেলেও ১৯০৪ সালে ক্যান্ডিফ্লস তৈরির এই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের প্রসার বৃদ্ধি শুরু হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯২০ সালে এর নাম দেয় ‘কটন ক্যান্ডি’। এরপর আস্তে আস্তে ক্যান্ডিফ্লস এত জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৭ ডিসেম্বরকে ‘ন্যাশনাল কটন ক্যান্ডি ডে’ হিসেবে পালন করতে থাকে। বর্তমানে বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে বেশ কিছু কোম্পানি ক্যান্ডিফ্লস তৈরি করে। টটসি রোল অব কানাডা লিমিটেড বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্যান্ডিফ্লস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।

ক্যান্ডিফ্লস যেভাবে তৈরি হয়

ক্যান্ডিফ্লস খুব সহজেই বানানো যায়। একটি বিশেষায়িত মেশিন, চিনি, তেল আর রঙ করতে চাইলে প্রয়োজন ফুডগ্রেড কালার। চলন্ত মেশিনের উপর গোলাকার জায়গায় ছোট ছিদ্রতে দেওয়া হয় এই উপকরণগুলো। মেশিনের ঘূর্ণায়নের কারণে যে তাপ তৈরি হয় সেটি থেকেই প্রস্তুত হয় ক্যান্ডিফ্লস। এক কেজি চিনি থেকে হাফ কেজি বা ৫০০ গ্রামেরও বেশি ক্যান্ডিফ্লস বা হাওয়াই মিঠাই তৈরি করা যায়।

উন্নত বিশ্বে বেশ গোছানোভাবেই ক্যান্ডিফ্লস তৈরি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ হয়ে থাকে। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যেসব ক্যান্ডিফ্লস তৈরি হয় সেগুলোতে উইলিয়াম মরিসনের তৈরি মেশিনের আদলে তৈরিই বড় মেশিন ব্যবহার করা হয়।  

১৯৪৯ সালের পর ইউরোপ ও আমেরিকার ফুডচেইনে ক্যান্ডিফ্লসের অফিশিয়াল প্রবেশ ঘটলেও এর স্বাদে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। জাপানের টোকিও থেকে আমেরিকার লস এঞ্জেলেস, পূর্ব থেকে পশ্চিমের সব খানেই ক্যান্ডিফ্লসের জনপ্রিয়তার কোনো কমতি নেই!

বাংলাদেশে ক্যান্ডিফ্লস

আমাদের দেশে ক্যান্ডিফ্লস পরিচিত ‘হাওয়াই মিঠাই’ নামে। এটি খেতে যেমন মজার, দেখতে তার থেকেও বেশি আকর্ষণীয়। বাংলাদেশের প্রায় সবখানেই কাঠিতে পেঁচিয়ে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায় ক্যান্ডিফ্লস। পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন মেলা, স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় এরিয়াগুলোতে নিয়মিতই চোখে পড়বে তুলোর মত হাওয়াই মিঠাই। আমাদের দেশে বড় পরিসরে এটি তৈরি না হলেও ছোটো পরিসরে অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হাতে তৈরি হয় মজাদার ক্যান্ডিফ্লস। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশেও ক্যান্ডিফ্লস বর্তমানে চিরায়ত ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইশতিয়াক খান কাব্য বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের তথ্য ও যোগাযোগ প্রকৌশল বিষয়ে অধ্যয়নরত।

ishtiakkhankabbo@gmail.com