logo

কোভিডের সাথে বসবাস: শিখতে বাকি বিস্তর

সৈয়দ মূসা রেজা | Monday, 10 January 2022


বিশ্বমারির কবলে পড়ে জীবনযাত্রা কী হবে না হবে তা কেবল ভাইরাসই নির্ধারণ করেনি। বরং আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে তা নির্মিত হয়েছে। এখানেই থেমে যাননি ফাইনান্সিয়াল টাইমসের নিয়মিত প্রদায়ক ও ব্রিটিশ-ভারতীয় বিজ্ঞান সাংবাদিক অঞ্জনা আহুজা। দ্য টাইমসের সাবেক কলাম লেখক আহুজা দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, প্রসপেক্ট, নিউ সায়েন্টিস্ট এবং রেডিও টাইমসেও লেখেন। ২০১৩ কমেন্ট অ্যাওয়ার্ড তাকে সেরা বিজ্ঞান ভাষ্যকার নির্বাচন করে।

ঠিক দুবছর আগে অঞ্জনা আহুজা প্রথম লেখেন, ব্যাখ্যা মেলে  না এমন এক ভাইরাসঘটিত নিউমোনিয়ায় চীনের এক শহরে আক্রান্ত হয়েছে ৫৯ ব্যক্তি। ওই শহরের নামও আগে কখনোই শোনেননি অঞ্জনা। জীবিত পশু বাজারের সঙ্গে ভাইরাসটির সম্পর্ক আছে বলে সে সময় মনে করা হচ্ছিল। তাতে সার্স-১ ভাইরাসের উৎপত্তির ঘটনাই মনে হলো অঞ্জনার। অমঙ্গলের অস্পষ্ট আশঙ্কা তাঁর মনে দানা বাঁধলেও শেষ পর্যন্ত ঘটনা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা একবারও ভাবতে পারেনি তিনি । সে থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউিএইচও) হিসাবে ৩০ কোটি মানুষ এ ভাইরাসের শিকার হয়েছে। আর অকালে ঝরে গেছে ৫৪ লাখ ৬০ হাজার মানুষের প্রাণ।

দুবছর চলছে। ২০২২ সালের শীত এসেছে অতীতের পথ ধরেই। যুক্তরাজ্যের হাসপাতালগুলো ভরে গেছে কোভিড-১৯এর রোগীতে। করোনা ভাইরাস নিয়ে পরিস্থিতি তুলে ধরতে যেয়ে ব্রিটিশ দুই উপদেষ্টা প্যাট্রিক ভ্যালান্স এবং ক্রিস হুইটি গ্রিক পৌরাণিক কাহিনির ক্যাসেন্ড্রার মতোই পূর্বাভাস আউড়ে যান। এ সময় তাঁদের চেহারা পাথরের মতো নিরাসক্ত দেখায়। (প্রধানমন্ত্রী) বরিস জনসন কেবল কাল্পনিক আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এরা সবাই সগৌরবে টিভি পর্দা জুড়ে থাকেন। করোনার ব্যাপক বিস্তারের দিনগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যব্যাপী স্কুল আবার খোলার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ সিদ্ধান্ত নিতে যেয়ে গত জানুয়ারির মতোই ধারাল ছুরির খোঁচা অনুভব করতে হচ্ছে।

তবুও এটি হলো ২০২২, ২০২০ বা ২০২১ নয়। টিকা এবং ভাইরাসরোধী ওষুধের সম্মিলিত শক্তির গুণে উঁচু-আয়ের দেশগুলোতে বিশ্বমারির খেলার ধরণ বদলে গেছে। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা বিছানায় ব্যাপক হারে তাঁরাই শুয়ে আছেন যাঁরা টিকা নেননি। বিশ্বমারির সমস্যায় হাবুডুবু খাওয়ার সময় আমরা যা কামনা করেছি, আমাদেরকে তাই এনে দিয়েছে বিজ্ঞান।

বিজ্ঞান সাংবাদিক অঞ্জনা আহুজা

এরপরও, সত্যিই, শেখার আছে আরো বাকি বলে মন্তব্য করেছেন অঞ্জনা আহুজা। এফটিতে তিনি লিখেছেন: প্রথমত, টিকা রোগকে আরো কঠিন হওয়ার এবং রোগীকে অকালে মারা যাওয়া হাত থেকে রক্ষা করছে। তবে টিকাই বিশ্বমারিকে খতম করার একমাত্র নিদান নয়। রোগের সংক্রমণ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে টিকা, পুরো বন্ধ করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, বর্তমান কালে বিশ্বের সাথে ব্রিটেনের আন্তঃসংযোগ রয়েছে। কিন্তু যাদের সাথে ব্রিটেনের আন্তঃসংযোগ সেই দুনিয়ার বেশির ভাগকেই এখনো দেওয়া হয়নি টিকা। এ দুইয়ের যোগফলে ভাইরাসের বিস্তার ধারা অব্যাহত থাকছে। এতে ভাইরাসের নতুন ধরন সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকছে সাড়ে ষোলআনাই। অমিক্রনের মতোই নতুন ধরন হয়ত  প্রতিরক্ষার প্রাচীরকে পাশ কাটিয়ে শরীরে ঢোকার সক্ষমতা রাখবে।

গোটা বিশ্বকে টিকার আওতায় আনা এবং সংক্রমণ ঠেকিয়ে দেওয়ার অকাট্য যুক্তি হিসেবে এ কথা বলা হচ্ছে অনেক দিন থেকেই। কিন্তু পুরো দুনিয়াকে টিকার নিরাপদ চাদরে মুড়ে দেওয়াহানুজ দুর আস্ত- এখনো অনেক দূরের বিষয়। আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল দেশ হলো নাইজেরিয়া। এ পর্যন্ত দেশটির চার শতাংশের মতো পূর্ণ বয়সিকে পুরোপুরি টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। অক্টোবরে হুশিয়ারি শুনিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এতে বলা হয়েছে, ‘টিকা নিয়ে এই মহা অসাম্যের মূল্যবাবদ বিশ্বকে আগামী পাঁচ বছর ধরে সইতে হবে পাঁচ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি।

সংক্রমণর ঠেকানোর কথা বলতে গেলে, প্রথমেই বলতে হবে যে আমরা কমবেশি সবাই জানি যে বায়ুবাহিত ভাইরাসের গতি ধীর করে দিতে হলে ব্যবহার করতে হবে মুখোস (মাস্ক)। খোলামেলা হাওয়া যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখতে হবে।দূর-কাজকরতে হবে। নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। রোগ কিভাবে ছড়ায় সে দিকে নজর রাখতে হবে। আক্রান্ত বা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন ব্যক্তিদেরকে নিঃসঙ্গ করতে হবে। তাদেরকে করতে হবে সঙ্গরোধ। প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।টিকা যোগ অন্যান্যবাভ্যাকসিন প্লাসমানে জীবনযাত্রা অচল করে দেওয়া বা লকডাউন নয়। বরং ভাইরাস ঠেকানোর একটি পথ বলে উল্লেখ করেছেন আহুজা।

সব দেশ এ ব্যবস্থাপত্র মেনে চলেনি। এ সব দেশের মধ্যে ইংল্যান্ড রয়েছে। দেশটি নিজের মর্জিমাফিক এলোমেলো পথে চলেছে। অতি-সংক্রামক অমিক্রমের কঠিন সময়েও উপরের পদ্ধতিগুলো মানতে অনীহা দেখাচ্ছেন জনসন। তিনি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে পাশ কাটিয়ে চলছেন। এতে ইংল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বিপন্ন বিস্ময় বোধ করছে। ডেল্টার তুলনায় অমিক্রন হয়ত হতে পারে কম মারাত্মক । তারপরও রোগীর জন্য হাসপাতালের বিছানার প্রয়োজন অনিবার্য হয়ে ওঠে। তার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের জনশক্তিকে লাগাতে হয়। কোভিডসৃষ্ট রেকর্ড জনশক্তির গরহাজিরার কবলে পড়েছে ইংল্যান্ড। হাসপাতালগুলো স্বাভাবিক সেবা তৎপরতা সিকেয় তুলতে বাধ্য হয়েছে। জরুরি অবস্থায় পড়ায় তলব করতে হয়েছে ব্রিটেনের সেনা চিকিৎসকদের। ৬ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার দেশটিতে নতুন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যেয়ে ঠেকেছে ১ লাখ ৮০ হাজারে! পরীক্ষা করার  সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোকে জনশক্তির ঘাটতি পূরণে রোগীকে নিঃসঙ্গ রাখার সময়সীমা কমিয়ে আনা হয়েছে। কম মাত্রায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা মানেই হলো, ভাইরাসের গতিবিধির ওপর কম নজরদারি। নজরদারিহীন ভাইরাসের বিস্তার ঘটছে যে সব দেশে, সেখানে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাতকে লং কোভিড বা দীর্ঘ(দিন) কোভিডে ভোগাসহ নানা নরক-যন্ত্রণার বোঝা বইতে হবে উল্লেখ করে আহুজা বলেন, পরিণামে দেখা দিতে পারে, কোভিডের নতুন নতুন ধরন। এ ছাড়া, সে সব দেশকে গমন নিষেধের লাল-তালিকায় পড়তে হতে পারে। গণ-সংক্রমণের মধ্য দিয়ে বাড়তি কোনো নিরাপত্তা মেলে না। ভাইরাসের নতুন নতুন সংক্রমণের ঢেউয়ের বিরুদ্ধে কোনো নিরাপত্তার ঢাল তৈরি হয় না। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে কোভিড-১৯এর, এমন কী হালকা ধরনের কোভিডের বিরুদ্ধে সুন্দর করে বাঁচতে হলে ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে।

বিজয়ীই একমাত্র সব সুফল ভোগ করবে বলে স্বাস্থ্য ও সম্পদের খাতে লোকশ্রুতি চালু আছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো এখনো তাই অন্ধের লাঠির মতো আঁকড়ে রেখেছে। ভাইরাসের বিস্তার নিম্ন মাত্রায় রাখতে পেরেছে দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানের মতো দেশগুলো। তাতে স্বাভাবিক জীবন-যাত্রা বন্ধ করে দেওয়া বা লকডাউনকে পেরেছে ঠেকাতে। দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা পাঁচ কোটি ২০ লাখ এবং কোভিডে প্রাণ দিয়েছে ছয় হাজারেরও কম। এর বিপরীতে যুক্তরাজ্যে এ ভাইরাস কেড়ে নিয়েছে দেড় লাখ মানুষের জীবন। ১৯১৮এর স্প্যানিশ ফ্লুতে যুক্তরাষ্ট্রে মারা গিয়েছিল পৌনে সাত লাখ মানুষ। এবারে সে সংখ্যা অতিক্রম করে গেছে। প্রতিহত করা সম্ভব সে রকম রোগে সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশে এতো ব্যাপক হারে মানুষের অকালে প্রাণ হারানোর ঘটনা দেখার জন্য বিশ্ব হয়ত প্রস্তুত ছিল না।  

ভাইরাসের প্রকোপ কমাতে চাই রাজনৈতিক নেতৃত্ব- এই মন্তব্য করে আহুজা আরো লিখেছেন: এর মধ্যে স্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্বস্ত বার্তা দেওয়া এবং দ্রুত কাজ করার সদিচ্ছাও অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বমারি নিয়ে নির্ভুল উপাত্ত পাওয়া কঠিন কিন্তু ভাইরাসকে ঠেকানোর নীতি ভালো হওয়া চাই।

সর্বশেষ শিক্ষা নিতে অনেকেরই দীর্ঘ সময় লেগেছে।  আহুজার মতে, সে শিক্ষাটি হলো এই যে বিশ্বমারির কবলে পড়ে জীবনযাত্রার ধরণ কী হবে তা কেবল ভাইরাসই নির্ধারণ করেনি বরং আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে তা নির্মিত হয়েছে। আমরা সবাই আমাদের বিশ্বমারি-পূর্ব আশা, বিশ্বাস, কুসংস্কার এবং আতঙ্কে সওয়ার হয়ে বিশ্বমারির প্রকোপে এসে পড়েছি। আমাদের অনেকেই কখনোই ভাবেননি যে, শতাব্দীকালের সবচেয়ে খারাপ বিশ্বমারির মুখে দাঁড়িয়ে  আমাদের অনেক স্বজন-সহকর্মী কোভিড -১৯ কে চালিয়াতি বলে দাবি করবেন। নিরাপদ এবং কার্যকর টিকাকে চায়ের কাপের ঝড়ে উড়িয়ে দেবেন, টিকা নিতে বাধা দেবেনছড়িয়ে দিতে থাকবেন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। এখানেই শেষ নয়, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং সেবিকাসহ চিকিৎসা পেশার জনশক্তিকে দুশমন জ্ঞান করবেন।

লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের টিকা নিয়ে আস্থা তৈরির প্রকল্প অঞ্জনা আহুজাকে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে শেখায়। ভিন্ন চিন্তাধারার মানুষগুলোকে বিচারের পাল্লায় তোলার বদলে তাদের সাথে নিয়ে কাজ করতে শিখিয়েছে। এভাবেই তিনি বুঝতে শেখেন, তাঁর পরিচিত এক চিন্তাশীল যুবক নিজের রাজনৈতিক বিদ্রোহের অংশ হিসেবে কোভিড টিকাকে প্রত্যাখ্যান করছে। 

কারো কারো বেলায় টিকা প্রত্যাখ্যানের সাথে বিজ্ঞানকে অবিশ্বাস করা না করার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। বরং তাঁরা এক মহাসংকটের মুখে দাঁড়িয়ে শক্তিহীন হয়ে পড়েছে এবং নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় অবিরাম ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছেন।  রেকর্ড সংক্রমণের পর্যায়ে দাঁড়িয়ে টিকাবর্জনকারীদেরকেটে পরতেবলার জোরাল সিদ্ধান্ত নেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখরন। এ পর্যায়ে অনেকেই টিকার প্রথম ডোজের জন্য সারিতে দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু আহুজাসহ অনেকেই দাঁড়াচ্ছেন তৃতীয় ডোজটির জন্য। তাই এ কথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে দ্রুত বিশ্বমারি ঠেকাতে শুধুই সহানুভূতি সহায়তা করবে না।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে]