কেমন হবে মেটাভার্স প্রযুক্তি
মোঃ ওমর ফারুক তপু | Wednesday, 22 December 2021
যদি বলা হয় বাংলাদেশে বসেই কেউ কানাডা কিংবা আমেরিকায় বসবাস করা কোনো আত্মীয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সরাসরি যোগ দিতে পারবেন, তাদের সাথে একসাথে নেচে গেয়ে করতে পারবেন আনন্দ, অথবা যদি বলা হয় ঘরে বসেই পছন্দের কোনো পোশাক ট্রায়াল দিয়ে কিনতে পারবেন- ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে বেশ কিছুটা বেগই পেতে হয়।
তবে এসব কিছু এখন আর শুধু কল্পনার পর্যায়েই থাকছে না। এমন প্রযুক্তির বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়ে গেছে, যার ফলে অনলাইন ভার্চুয়াল জগৎ হবে বাস্তব পৃথিবীর মতোই।
যুক্তিবিদরা দাবি করছেন যে, বাস্তবের চেয়েও অধিক আকর্ষণীয় হতে যাচ্ছে এই জগৎ। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবী নাকি হয়ে আসবে আরও ছোট, এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের দূরত্ব ঘুচে যাবে নিমিষেই। আর যে প্রযুক্তি এই যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসবে তার নাম ‘মেটাভার্স।’
মেটাভার্সের এই ধারণা নতুন কিছু নয়। ১৯৯২ সালে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীলেখক নিল স্টিফেনসন তার উপন্যাস ‘স্নো ক্র্যাীশ’ এ সর্বপ্রথম মেটাভার্স শব্দটি ব্যবহার করেন। সেখানে তিনি এমন একটি ত্রিমাত্রিক জগৎ উপস্থাপন করেন, যেখানে একজন ব্যক্তি অবতারের মাধ্যমে আরেকজন ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
মেটাভার্স নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের কল্যাণে। কিছুদিন আগেই তিনি জানান যে তার কোম্পানির নাম ফেসবুক থেকে পরিবর্তন করে ‘মেটা’ রাখতে যাচ্ছেন এবং মেটাভার্স নিয়ে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা থেকেই নাকি এ পরিবর্তন।
জাকারবার্গের ভাষ্যে, “মেটাভার্স এমন একটি জগৎ হবে, যার মধ্য দিয়ে আপনি এক অন্তহীন জগতে প্রবেশ করতে পারবেন। আপনার মতো অনেকেই সেখানে উপস্থিত থাকবে, হাসবে, খেলবে, কাজ করবে। সেখানে যোগাযোগ হবে বহুমাত্রিক।”
সাধারণ মানুষের কাছে এ প্রযুক্তিকে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির মতো মনে হলেও এটি আসলে আরো বিস্তৃত। প্রযুক্তিবিদদের মতে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির সাথে মেটাভার্সের তুলনা আজকের দিনের স্মার্ট-ফোনের সাথে আশি-নব্বইয়ের দশকের মোবাইল ফোনের তুলনা করার মতো।
বর্তমানে ভিআর বলতে যা বোঝায় তার ব্যবহার মূলত অনলাইন গেমিং পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। কিন্তু মেটাভার্সের মাধ্যমে অফিস-আদালতের কাজ থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামে খেলা দেখা, সরাসরি কনসার্ট কিংবা সিনেমা হলে সিনেমা উপভোগ করা, এমনকি বন্ধুদের সাথে আড্ডাটাও দেওয়া যাবে।
কিন্তু ভিআর প্রযুক্তির সাথে যে মেটাভার্সের একদমই মিল নেই তাও কিন্তু বলা যাচ্ছে না। মেটাভার্সে প্রবেশের মূল উপকরণ অগমেন্টেড রিয়্যালিটি গ্লাস হবে বলে অনেকেই ধারণা করছেন, যা ইতোমধ্যে ভিআর প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অর্থাৎ, চোখে একজোড়া গ্লাস এবং কানে হেডসেট লাগানোর মাধ্যমেই প্রবেশ করা যাবে নতুন এক জগতে।
ইউরোপে এই মেটাভার্স প্রযুক্তি তৈরি করার জন্য ফেসবুক সম্প্রতি ১০ হাজার কর্মী নিয়োগের কথা ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি তারা বিনিয়োগ করছে প্রচুর অর্থ, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির জন্য তৈরি করেছে অকুলাস হেডসেট যা প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোর হেডসেটের তুলনায় দামে কম।
যদিও ফেসবুকের নাম পরিবর্তনের জের ধরেই মেটাভার্স নতুন করে আলোচনায় এসেছে, কিন্তু মাইক্রোসফট, এনভিডিয়া, অ্যাপল, গুগল, রোব্লক্স এবং ফোর্টনাইট নির্মাতা এপিক গেইমস কোম্পানিও মেটাভার্স তৈরিতে কাজ করছে।
এনভিডিয়ার ওমনিভার্স প্ল্যাটফর্মের ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড কেরিসের ভাষ্যে, “মেটাভার্সে ভার্চুয়াল জগৎ তৈরির জন্য কিছুদিনের মধ্যেই অনেক কোম্পানি চেষ্টা করবে, ঠিক যেভাবে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে অনেক কোম্পানি কাজ করছে। এখন আমরা যেমন এক ওয়েবপেজ থেকে আরেক ওয়েবপেজে যাই, ঠিক তেমনি হয়তো তখন এক কোম্পানির মেটাভার্স থেকে আরেক কোম্পানির মেটাভার্সে যাওয়া হবে। “
এছাড়া এপিক গেমস মেটাভার্স তৈরির উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। মাইক্রোসফট কোম্পানিও তাদের ‘মেশ’ নামক প্ল্যাটফর্মে মেটাভার্স নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। মাইক্রোসফট টিমসের মধ্যে তারা নতুন এ প্রযুক্তি সংযুক্ত করবেন বলে জানা গিয়েছে।
তবে কবে নাগাদ এ প্রযুক্তি আসতে পারে এ ব্যাপারে এখনও কেউ নির্দিষ্ট করে দিনক্ষণ বলতে পারেন নি। তবে প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, মেটাভার্স তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হলেও কিছু বাধা বিপত্তি রয়ে গেছে এখনও। কিন্তু বাজারে ফাইভ-জি চলে আসলেই সেসব সমস্যার সমাধান ঘটবে, এমনটা আশা করছেন তারা।
এসব ছাপিয়ে যে বিষয়টি সবার মাঝে উদ্বেগের সৃষ্টি করছে তা হলো তথ্যের সুরক্ষা। ফেসবুক যেভাবে ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবস্থাপনা করে আসছে তা নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ফেসবুক যদি মেটাভার্সে পরিণত হয় সেক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের আরও অনেক বেশি তথ্য থাকবে। এর সুরক্ষা নিশ্চিত না করা গেলে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা।
অদূর ভবিষ্যতে মেটাভার্স হয়ত জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে চলেছে। কিন্তু মেটাভার্স মানুষের মাঝে যে আসক্তি সৃষ্টি করবে তা থেকে বের হয়ে মানুষ আসল পৃথিবীর কতটা থাকবে তা নিয়ে ভাবাও সময়ের দাবি!
মোঃ ওমর ফারুক তপু বর্তমানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
jafinhasan03@gmail.com