logo

কৃষকের ঘাড়ে আড়াই দশক ধরে লোকসানের বোঝা 

ইয়াছির ওয়ারদাদ | Sunday, 7 February 2021


ধান উৎপাদন বিগত আড়াই দশক ধরে দেশের কৃষকদের জন্য মূলত একটি অলাভজনক কৃষিখাতে পরিণত হয়েছে।

১৯৯৫ সাল থেকে আমন ও বোরো ধানের প্রতিটি মৌসুমে ধান ও চাল উভয়েরই দাম প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একটি সরকারি সমীক্ষায় এমন চিত্র উঠে এসেছে। 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) পরিচালিত ওই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে উৎপাদন ব্যয় গড়ে ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সময়টাতে কৃষকদের নিট মুনাফা প্রতি বছর ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মিল মালিকরা চাল ও চালজাতীয় অন্যান্য পণ্যে প্রতি কেজিতে ৪.৬ থেকে ৯.৫ টাকা লাভ করেছে।

সম্প্রতি বিএআরসি আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে 'বাংলাদেশে ধানের প্রাপ্যতা ও দামের অস্থিরতা: ২০২০ সালে একটি আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা' শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। ২০২০ সালে চাল, পেঁয়াজ এবং আলুর দাম বৃদ্ধির কারণ নিয়ে গবেষণা প্রকাশের জন্য এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিএআরসি।

বাজারে 'উদ্বৃত্ত' এবং 'দাম'- এ দুটোর মধ্যকার যোগসূত্র বিবেচনায় নিয়ে এ প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে কিছু নির্দিষ্ট মহল 'চাহিদা ও সরবরাহ' নয়, বরং প্রধান পণ্যদ্রব্যটির দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা উপভোগ করে।

বিএআরসি'র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, "দামের তালিকাটিতে দেখা যায়, মধ্যস্তরের ব্যবসায়ীরা, বিশেষত মিল মালিক, আড়তদার এবং পাইকাররা অতিরিক্ত মুনাফা ভোগ করেছে"।

গবেষণাটিতে কৃষি, খাদ্য, পরিকল্পনা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো জড়িত ছিল। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআরআরআই) কৃষি অর্থনৈতিক বিভাগ এ গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছে।

টিমের সদস্য ও বিআরআরআইয়ের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ড. মোহামদ্দ সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন, কৃষকরা ২০১৯ ও ২০২০ সালে বোরো ধানের মৌসুমের প্রথম দু'মাসের মধ্যে তাদের ৭৫-৭৭ শতাংশ ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল। তিনি ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানান, কৃষকদের কাছে ধান একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ করার সুযোগ না থাকার বিষয়টি মধ্যসত্ত্বভোগীদের বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিতে সহায়তা করে।

সিদ্দিকুর রহমান আরও বলেন, তারা একটি মৌসুমে ধানের দেশীয় সংগ্রহ বাড়িয়ে আড়াই মিলিয়ন টন পর্যন্ত বাড়ানোর পরামর্শ দেন, যেখানে সরকারি ধানের মাসিক মজুদ সবসময় কমপক্ষে ১.২৫ মিলিয়ন টন থাকা উচিত।

তিনি আরও বলেন, এ জাতীয় সরকারি হস্তক্ষেপ বাজারে একটি ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের প্রাক্তন গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেছেন, ধান ও ধানের বাজার- উভয় স্থানেই বড় মিলারদের আধিপত্য রয়েছে।

তিনি ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, এ আধিপত্যের জন্য সরকারের পর্যাপ্ত পরিমাণে ধান উৎপাদন করার ব্যর্থতা দায়ী। এর ফলে কৃষক ও ভোক্তা উভয় পক্ষই বঞ্চিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, "কৃষকরা লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অপরদিকে গ্রাহকরা ফসলের মৌসুমে পর্যাপ্ত সরবরাহ ও কম দাম থাকা সত্ত্বেও বেশি দাম দিতে বাধ্য হচ্ছেন।" তিনি বলেন, গত বোরো মৌসুমে কৃষকরা এপ্রিল-জুনে বিভিন্ন জাতের ধানের প্রতি মণের জন্য ৬৫০-৮৫০ টাকা পান, আগস্ট-অক্টোবর মাসে সে দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,১০০-১,৩৫০ টাকায়।

আসাদুজ্জামান বলেন, দেশের বিপণন নেটওয়ার্ক অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার।

কৃষকদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন আনতে এবং বাজারের যেকোনো অস্থিরতা রোধ করতে বাংলাদেশের উচিত থাইল্যান্ড ও ভারতের মতো কমিউনিটি ভিত্তিক সঞ্চয়স্থান তৈরি করা।

ভ্যালু-চেইন বিশেষজ্ঞ ও কৃষি-অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডি বলেন, দেশের ৪৬ শতাংশেরও বেশি কৃষক ভূমিহীন। তিনি পর্যবেক্ষণ করে দেখেন, তারাই অস্থিতিশীল বাজারের সবচেয়ে ভুক্তভোগী অংশ।

কেনেডি বলেন, কৃষকদের ন্যূনতম মুনাফা অর্জনে সহায়তা করার জন্য মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস (এমএসপি) নিয়ে একটি আইনী অধিকার প্রতিষ্ঠা করা দরকার।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ৩৩ ডেসিমালের কম পরিমাণ জমি থাকা কৃষকরা সহজে কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন না।

কেনেডি বলেন, ফসল কাটার মৌসুমে দরিদ্র কৃষকদের জন্য আনুষ্ঠানিক ঋণ গ্রহণের সুবিধা থাকা উচিত, যাতে তারা তাদের পণ্যটি পরবর্তী দর কষাকষিরার জন্য জমা রাখতে পারেন।

৩ কোটি ৬০ লাখ টনের বেশি ধান উৎপাদন করে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদক দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো অনুযায়ী, ১ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি খামারী পরিবার ধান চাষে জড়িত রয়েছে।