logo

কিনৎসুগি – ভাঙা পাত্র মেরামতের জাপানি সুবর্ণ এক পদ্ধতি

তাহসীন প্রাচী | Thursday, 21 July 2022


কিনৎসুগি – জাপানি শব্দটির বাংলা অনুবাদ করলে বেশ কাব্যিকই দাঁড়াবে - সুবর্ণ নিরাময়। কয়েক শতাব্দী পুরনো এই শিল্পের উদ্দ্যেশ্যও এমন অনন্যই বটে। শখের কোনো সিরামিকের পাত্র ভেঙে পড়লে সাধারণ বাড়িতে যেন তা স্থান পায় ফেলে দেওয়ার তল্লাটে, তবে জাপানে প্রায়ই এর বিপরীতটা হতে পারে। প্রিয় পাত্রটি ভেঙে গেলে বা ফেটে গেলে তা ফেলে না দিয়ে তা মেরামতের এক অনিন্দ্য পন্থা জাপানিরা চর্চা করে আসছে। অনেকে আবার চাইতেও পারেন যাতে তাদের সাধের সিরামিকটি ভেঙে যাক, কারণ তাহলেই তা মেরামত করতে পারবেন। আর ফাটল ধরা অংশগুলোয় পড়বে সোনার স্পর্শ!

ভাঙা বা ফেটে যাওয়া সিরামিকের পাত্রকে গুঁড়া স্বর্ণ, রুপা (এখন প্লাটিনামও) এবং বার্নিশের উপকরণ দিয়ে নতুন রূপে একেকটি শিল্পদ্রব্যে পরিণত করে সংরক্ষণ করে রাখার চল জাপানে প্রায় ৫০০ বছর ধরে চলে আসছে। জাপানি উরুশি বার্নিশ নামে এক ধরনের বিশেষ বার্নিশ ব্যবহৃত হয় এই প্রক্রিয়ায়, সাথে যুক্ত হয় পছন্দনীয় মূল্যবান ধাতুর চূর্ণ। এই বার্নিশটি এতটাই টেকসই যে সিরামিকের ভাঙা অংশগুলোকে অক্ষতভাবে জুড়ে রাখতে পারে দীর্ঘদিন।

কিনৎসুগির শুরুটার পেছনের ইতিহাস বেশ আকর্ষণীয় বটে। মুরোমাচি যুগে এই শিল্পের উৎপত্তি বলে ধারণা করেন অনেক ইতিহাসবিদ। মার্কিন শিল্পবিশারদ ও সমালোচক ব্লাক গোপনিকের মতে, ১৫ শতকের শেষার্ধে জাপানি জেনারেল শোগউন আশিকাগা ইয়োশিমিতোসুর তার প্রিয় চায়ের পাত্রটি ভুলবশত ভেঙে ফেলেন। প্রিয় পাত্রটি সারাতে চীনে পাঠান তিনি। তবে চীন থেকে তা ফিরে আসে কোনোভাবে মেরামত করা, অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু উপাদান ব্যবহার করে।

এরপর এর পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব বর্তায় জাপানি কারিগরদের কাঁধে। জেনারেলের পাত্রটি আরো দৃষ্টিনন্দন করে তোলার জন্য তারা ব্যবহার করেন স্বর্ণচূর্ণ! এভাবে ভাঙা পাত্র জুড়তে মূল্যবান ধাতুর ব্যবহার জাপান জুড়ে হয়ে ওঠে জনপ্রিয়। জাপানি ধনাঢ্য সংগ্রাহকরা ইচ্ছাকৃতভাবেই অনেকে সিরামিকের পাত্র ভেঙে মেরামত করিয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।

কিনৎসুগির প্রধানত তিন ধরনের পদ্ধতি দেখা যায় – ‘ক্র্যাক’ পদ্ধতি, ‘পিস’ পদ্ধতি এবং ‘জয়েন্ট কল’। ক্র্যাক পদ্ধতিতে ভাঙা টুকরোগুলোর যতটা সম্ভব কম অংশ আবৃত করে স্বর্ণের গুঁড়া এবং বার্নিশ ব্যবহার করা হয়। পিস পদ্ধতিতে যদি সিরামিকটির কোনো খন্ড একেবারেই না পাওয়া যায় তবে পুরোটাই স্বর্ণ ও বার্নিশ ব্যবহার করে পূর্ণ করে দেওয়া হয়। জয়েন্ট কল পদ্ধতিতে শূন্যস্থান পূরণের জন্য ভিন্ন আকারের একটি বা কয়েকটি টুকরো বসানো হয় যা অনেকটা প্যাচওয়ার্ক ধাঁচ তৈরি করে।

আধুনিক যুগে প্রযুক্তির সাথে সাথে যুক্ত হয়েছে আরো কিছু পদ্ধতি যেমন গোল্ড লাস্টার ডাস্ট বা ক্রাকলগ্লেজ ফিনিশিং উপাদান ব্যবহার। স্বর্ণের গুঁড়া বাদেও রেজিন, তামার গুঁড়া, রুপার গুঁড়া, মাইকা বা অভ্রের গুঁড়া অথবা শুধু বার্নিশ উপকরণ দিয়েও পাত্র বা সিরামিক উপাদান মেরামত করা হচ্ছে।

কিনৎসুগি কিভাবে করা হবে তা নির্ভর করে পাত্রটি কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে তার ওপর। জাদুঘরে বা সংরক্ষণের জন্য করা কিনৎসুগি স্বর্ণ দিয়েই করা হয়, জাপানি ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানিয়ে।

কিনৎসুগি একটি শিল্প হলেও এর শিল্পোদ্দেশ্যের সাথে জড়িয়ে আছে জীবন যাপনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার মতো দর্শন। ভাঙা কিছু মেরামতে ব্যবহৃত হয় স্বর্ণ, সেই ভেঙে পড়া অংশ হয়ে পড়ে আগের চেয়েও বেশি সুন্দর, মহিমান্বিত।  

‘ওয়াবি-সাবি’ নামক একটি দর্শনের কথা প্রচলিত জাপানে। এই দর্শনমতে, সকল অপূর্ণতাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে সেই অপূর্ণতার মাঝেও সুন্দরের উপস্থিতিকে জানান দেয়, জীবনের সকল অসম্পূর্ণতা, অস্থায়ীত্ব, অপূর্ণতাকে সঙ্গী করে তাকে শক্তি হিসেবে জ্ঞান করে জীবনে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। এখানে ভাঙা অংশটিকে ধরা হয় জীবনের কোনো ঘটনাকে এবং সেই ঘটনার ফল ভালো-খারাপ যা-ই হোক, তা নিয়েই জীবনে চলতে থাকতে হয় – সোনালি মেরামতের এই পাত্রগুলো এই দর্শনেরও জানান দেয়।

এছাড়া ‘মোতাইনাই’ বা ‘কত অপচয়!’ ধারণার সাথেও এর কিছুটা সম্পর্ক আছে বলে ধারণা করা হয়। অপচয় না করে পুনর্ব্যবহারে উৎসাহিত করাও এই শিল্পের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

কিনৎসুগির সাথে একটি সিরামিকের হৃৎপিণ্ড প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়। মূলত যেকোনো ভাঙা জিনিস, তা হোক না কেন সিরামিকের পাত্র বা মানবজীবনের কোনো পীড়াদায়ক ঘটনা যা বিচূর্ণতার অনুভূতি দিয়ে মানুষের মানসজগতে ভেঙে পড়া – তা জীবনেরই অংশ ধরে নিয়ে তাকে মেরামত বা নিরাময়ে যত্নশীল হওয়া যায়। এই নিরাময়ে যত্ন, পরিবর্তন, পীড়াকে যখন মানুষ গ্রহণ করে তা নিয়েই জীবনে এগিয়ে চলতে থাকে – তখনই তা হয়ে ওঠে তার সৌন্দর্য। পূর্ণতা পায় কিনৎসুগি বা সোনালি নিরাময়ের উদ্দেশ্য।

তাহসীন প্রাচী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

amipurbo@gmail.com