logo

কিনসুগি: খুঁতকে অলঙ্কার করে যে শিল্প

অনিন্দিতা চৌধুরী | Saturday, 20 March 2021


কোনো মানুষই নিখুঁত না। ভুল করা এই খুঁতযুক্ত মানবজাতির অন্যতম বড় একটি বৈশিষ্ট্য। ভুলের সঙ্গে নিত্য বসবাস করলেও ভুল নিয়ে খুব একটা স্বচ্ছন্দ হতে পারে না মানুষ। না নিজের ভুল নিয়ে, না অপরের ভুল নিয়ে। ভুলচুক হলে তা শোধরানোর চাইতে বেশি তৎপরতা দেখা যায় তা লুকানোর ক্ষেত্রে, যেন কেউ না দেখলে সে ভুল গায়েব হয়ে যাচ্ছে! অনেকটা ছোটবেলায় পড়া সেই নীতি গল্প, যাতে চোখ ঢেকে ফেললেই বিপদ চলে যাবে ভেবেছিল এক দুষ্টু খরগোশ। চোখ ঢাকলে বিপদ যায় না, বরং আরও কাছে চলে আসে। ভুলের ক্ষেত্রেও অনেকটা তেমন। ভুলের কথা ভুলে গেলে আসন্ন সময়ে সে ভুল করার আশংকা বেড়ে যায়। আর যদি উল্টোটা করা হয়, তবে অনেকটাই সামলে চলা যায়।

‘ওয়াবি-সাবি’ একটি জাপানি দর্শন, যার মূলকথা হচ্ছে ‘খুঁত উদ্‌যাপন’। এ বিমূর্ত দর্শনের মূর্ত রূপ হচ্ছে ‘কিনসুগি,’ চারশ বছরের অধিক পুরোনো জাপানি শিল্প। কিন এবং সুগি— এই দুটি জাপানি শব্দের সমন্বয়ে শব্দটি এসেছে। ‘কিন’ অর্থ সোনালি এবং ‘সুগি’ অর্থ জোড়া লাগানো। এ থেকেই খানিকটা আঁচ করা যাচ্ছে, কিনসুগির কাজকর্ম কী হতে পারে।

বাসনকোসন ভেঙে গেলে আমরা সাধারণত কী করি? মেঝে থেকে ভাঙা টুকরোগুলো তুলে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিই। জাপানিরা এর একটা বিকল্প ভেবে নিয়েছে, আর সে বিকল্পের নাম হলো কিনসুগি। এর শুরুটা সাধারণ এক দুর্ঘটনার মধ্য দিয়েই হয়েছিল। আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দীর দিকে এ পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়।

আশিকাগা ইয়োশিমাসা ছিলেন জাপানের তৎকালীন সামরিক শাসক। একদিন তার প্রিয় চায়ের কাপ হাত থেকে পড়ে ভেঙে যায়। তিনি এটি চীনে পাঠান মেরামত করার জন্য। কিন্তু সেখান থেকে বলে দেওয়া হয়, কাপটি মেরামতযোগ্য নয়। কিন্তু ইয়োশিমাসা ছিলেন কিছুটা নাছোড়বান্দা স্বভাবের। তিনি জাপানি মেরামতকারীদের দিয়ে একবার চেষ্টা করে দেখতে চাইলেন। মেরামতকারীরা তার দৃঢ়তা দেখে বেশ অবাক হলো এবং ঠিক করল, তারা তার প্রিয় কাপটিকে মহামূল্যবান করে তুলবে।

কাপটির ভাঙা জায়গা তারা গলিত রেজিন এবং স্বর্ণচূর্ণ দিয়ে পরিপূর্ণ করে তুলল। সে থেকেই শুরু কিনসুগি শিল্পের। জাপানিদের বিশ্বাস, কিনসুগি যে যুগে শুরু হয়েছিল, সে শাসনকাল জাপানের অন্যতম সমৃদ্ধ সময় ছিল।

সাধারণকে অসাধারণ করে তোলার শিক্ষা পাই কিনসুগি থেকে। প্রথমবার যে মেরামতকারী শিল্পীরা একটি সাধারণ পানপাত্রকে গড়ে তুলেছিল অন্যতম মূল্যবান বস্তু হিসেবে, সেই তাদের পদরেখা ধরে আজও কিনসুগি শিল্পীরা ভঙ্গুর জিনিসপত্রকে নতুন নতুন রূপে সজ্জিত করে তোলে। একজন মহান কিনসুগি শিল্পী অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেন তার কারিগরির মাধ্যমে। কাজ শুরু করার আগে তারা পাত্রটিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং এর গঠন সম্পর্কে জানেন। তারা এও নিশ্চিত করেন, স্বর্ণরেখা যেন কোনোভাবেই আসল পাত্রের রূপকে মলিন না করে দেয়, কেননা পাত্রটির অতীত রূপই তাঁর প্রকৃত রূপ। জাপানে এখনো বহু কিনসুগি স্টুডিও আছে, যাতে ভাঙা পাত্র নিয়ে গেলে কিছুদিনের মধ্যে স্টুডিওতে থাকা কারিগরেরা তা মেরামত করে দেন।

কিনসুগি শিল্প আমাদের অনেক কিছুই শেখায়। দৈনন্দিন জীবনদর্শনের অনেক দ্বিধাই এ শিল্প ভুলে যেতে বলে। নিজেদের খুঁত এবং ভুলগুলোকে উদ্‌যাপন করতে বলে কিনসুগি। এ শিল্প আমাদের এও বলে, নিজের কিংবা অপরের মাঝে থাকা কোনো দুর্বলতা, খুঁত বা ভুল সিদ্ধান্ত যাতে সারা জীবনের জন্য জেঁকে না বসে এবং আমরা নিজেরাই যেন নিজেদের ক্ষত সারিয়ে তুলতে পারি আশার সোনালি রেখায়। কিনসুগির পাত্রে থাকা সোনালি রেখাগুলো তো আমাদের ব্যক্তিত্বের ফাটল, যা ভবিষ্যৎ জীবনে আমাদের চলার পথকে আরেকটু বাস্তব করে তোলে, দৃঢ়তা দেয় আমাদের আসন্ন পদক্ষেপকে। কিনসুগি অতীতকে বোঝে, বর্তমানকে আলিঙ্গন করে এবং ভবিষ্যৎকে সুন্দর করে গড়ে তোলার আহ্বান জানায়।