কামাল বিরিয়ানী: জেনেভা ক্যাম্পের সবচেয়ে জনপ্রিয় যে বিরিয়ানী
মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Monday, 18 July 2022
জেনেভা ক্যাম্পের নাম শুনলেই মাথায় চলে আসে এদেশে আটকে পড়া উর্দু ভাষাভাষিদের কথা। আরো আছে জেনেভা ক্যাম্পের অসাধারণ সব বিরিয়ানীর দোকানগুলোও৷ ভোজনরসিকরা তো শুনেছেন মামা বিরিয়ানী, বোবা বিরিয়ানী, কামাল বিরিয়ানী, সাহিদ বিরিয়ানীর নাম। এর ভেতর সবচেয়ে জনপ্রিয় যে দোকানটি, একনামে যাকে চেনে সবাই সেটি হলো কামাল বিরিয়ানি।
মোহাম্মদপুর টাউন হল থেকে হেঁটে বা রিকশায় যাওয়া যায় এখানে। অথবা ঈদগাহ মাঠ থেকে শেরশাহ সূরী রোড দিয়ে শাহজাহান রোড হয়ে যাওয়া যায়৷ শেরশাহ সূরী রোডের ৩২ নং রাস্তা থেকে হেঁটে মাত্র ৭/৮ মিনিটের পথ। ক্যাম্পের বোবার বিরিয়ানীর গলি ধরে আরো সামনে হেঁটে গেলেই পেয়ে যাবেন কামাল বিরিয়ানী।
দুদিকে দুটো দোকান- তাদেরই দুই শাখা। দুইদিক মিলে বসতে পারেন ২৫ জনের মত। আছে ভিআইপি স্পেশাল গরুর কাচ্চি (২০০ টাকা প্লেট), গরুর স্পেশাল কাচ্চি (১৩০ টাকা প্লেট), গরুর ফুল কাচ্চি (৯০ টাকা প্লেট), হাফ কাচ্চি ৬০ টাকা প্লেট।
ভিআইপি কাচ্চির বিশেষত্ব - এখানে আলাদাভাবে মুরগীর রোস্ট দেয়া হয়। জেনেভা ক্যাম্পের সব দোকানই গরুর কাচ্চির জন্য খ্যাত। তবে বাবুর্চি কামাল হোসেন কিন্তু শুরুটা করেছিলেন খাসির কাচ্চি দিয়ে।
গরুর তুলনায় খাসির মাংস নরম, সিদ্ধ হয় সহজে। তাছাড়া, ফখরুদ্দিন বা নান্নার মত ঐতিহ্যবাহী দোকানগুলো কাচ্চি বানাতো খাসি দিয়ে। কামাল হোসেন সেই স্বাদ জেনেভা ক্যাম্পের লোকদের দিতে চেয়েছিলেন।
১৯৮৪ সালের কথা। ২২/২৩ বছরের টগবগে তরুণ কামাল হোসেন তার 'ধর্মের ভাই' ছোটুকে নিয়ে শুরু করলেন 'ছোটু বিরিয়ানী।' তখন তারা খাসির কাচ্চি বানাতেন। আবার স্থানীয়দের কথা চিন্তা করে গরুর কাচ্চিও বানাতে থাকেন।
সে সময়ের ক্যাম্পের জীবন ছিলো বেশ কষ্টের ও অন্ধকারের। মাত্র নয় বছর বয়সে বাবা হারানো কামাল জন্মেছিলেন পুরান ঢাকার নবাবপুরে। অভাবের সংসার নিয়ে ঠাঁই হলো এখানে। এক কামরার ঘরে তার মা, বোন, ভাই - সবাই।
দুলাইভাইয়ের কাছে বিরিয়ানী বানাতে শেখেন তিনি। ১৯৭৬ সাল থেকে হোটেলে হোটেলে কাজ করেছেন। পড়ালেখা আর হয়ে ওঠেনি৷ রাতজেগে বিরিয়ানী বানিয়ে ভোর সকালের পর থেকে দু'টাকা প্লেট হিসেবে বিক্রি করতেন। আট বছর এভাবে বিরিয়ানি বিক্রি করে তারপর ছোটুর সাথে দোকান দেয়া। প্রথমে তাদের খাসির কাচ্চির প্লেট ছিল ছয় টাকা, দশ টাকার।
সে সময় বাংলাদেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। তিনি আট দল ও পনের দল- উভয়েরই জনসভার জায়গাগুলোয় বিরিয়ানী নিয়ে যেতেন। সেখানে বিক্রি হতে হতে তার বিরিয়ানীর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৯০ সালে ব্যক্তিগত মনোমালিন্যের জের ধরে সেই ছোটুর সাথে তার বিচ্ছেদ। এরপর নিজেরই দোকান দেয়া। প্রথমদিকে তার দোকানে বোবার বিরিয়ানির কর্ণধার বোবাও কাজ করেছেন। তখন জেনেভা ক্যাম্পে আখতার হোসেন ওরফে মামা বিরিয়ানীর খুব রমরমা। গরুর কাচ্চির জন্য তারাই তখন সবার পছন্দের শীর্ষে। এজন্য কামাল বিরিয়ানীর সাথে বোরহানি / ফিরনি ফ্রি দিতে শুরু করেন। এতে কাজ হয়। পাশাপাশি মসলায় ভিন্নতা থাকার জন্য তিনি নিজস্ব স্থান করে নেন।
২০১৫/১৬ সালের দিক থেকে এই দোকানের পসার অনেক বেড়েছে। এখন স্টাফ সর্বমোট ৩৫ জন। কামাল হোসেনের ছেলে আরাফাত হোসেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন ফুড গ্রুপ নিয়ে বেশ সচেতন৷ তিনি প্রচার-প্রচারণার ধরণে বেশ পরিবর্তন এনেছেন।
কামাল বিরিয়ানীতে ১৩০ টাকার স্পেশালে ৫/৬ পিস মাংস, এক/দুই পিস আলু থাকে। সাথে আছে শসা, মরিচ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমরা বিরানী গরু দিয়েই করি। এদিকের যে মুন্না কসাই আছেন - আমার বেয়াই হন; ওনার দোকান থেকে ডেইলি দুটা গরুর মাংস আনা হয়, আমাদের দোকানের জন্য। '
কামাল হোসেন মনে করেন গরুর কাচ্চিতে কেউ মহিষ ব্যবহার করলে সেটা ওরকম স্বাদের হবেনা। মাংসও সিদ্ধ করা কঠিন হবে।
মসলার ক্ষেত্রেও তার আছে নিজস্ব পদ্ধতি। মসলা তারা শিলপাটায় বাটেন। তিনি মনে করেন, ব্লেন্ডারে পিছলে তা স্বাদ কমিয়ে দেয়।
তিনি ছাড়াও দোকানে আছেন চারজন বাবুর্চি। প্রত্যেকের আবার আছেন চারজন সহকারি। তাদের বোরহানি ও মাংসের টিকিয়া বাড়িতেই তার পুত্রবধূর (আরাফাত হোসেনের স্ত্রী) তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়। তিনি মনে করেন, ভালো স্বাদের এটাও একটা কারণ।
বাবুর্চি হিসেবে জেনেভা ক্যাম্পের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও রান্নার অভিজ্ঞতা আছে তার৷ এফডিসির শিল্পী সমিতির নির্বাচনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তিনি রান্না করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তার রান্নার জন্য সেখানকার জ্বালানী নেন না। অন্য কোথাও গেলে নিজে কয়লা, শিলনোড়া নিয়ে যান। তার স্টাইলে তিনি কোন ছাড় দিতে চাননা।
দীর্ঘদিন ধরে দোকান করলেও কর্পোরেট ব্র্যান্ডগুলোর মত বিস্তৃত হবার ইচ্ছা নেই তার। তার ভাষ্যমতে, “আমার এখানে ডেইলি ১২ ডেগের (ডেকচি) মত বিরানী বিক্রি হয়। শুক্রবারে ধরেন ১৫ ড্যাগও হয়ে যায়। এক ড্যাগ থেকে তিন হাজার এর মত লাভ থাকে। সবাইকে দিয়ে যা থাকে তাতে আলহামদুলিল্লাহ। এক একটা পাতিল থেকে ১৫০ প্লেট বা এরচেয়ে কিছু প্লেট বেশি হয়।
তাহলে দিনে তো ধরেন ১৮০০ প্লেটের মত যায়। অন্য কোথায় বড় শাখা করলে নিজে তো সবসময় দেখতে পারব না। এই স্বাদ তখন থাকবে না। তাছাড়া খুব বেশি পড়াশোনা হয়নি। যেদিন পয়লা বিরানী বেচতে শুরু করি, সেদিনও ভাবিনাই এই জায়গায় কখনো আসতে পারবো।”
তার কথায় একমত হন পুত্র মো.আরাফাত হোসেনও। তিনি বর্তমানে দোকানের দেখাশোনা করছেন। ভবিষ্যতে কামাল বিরিয়ানীর স্বাদ অক্ষুণ্ণ রেখেই বিরিয়ানি বিক্রি করতে চান। বললেন, “আব্বা যা শিখাইছেন, যেভাবে শিখাইছেন সেইমতো চালাচ্ছি। এখন যেমন টেস্ট পান, যতদিন আমরা থাকবো এই টেস্টই থাকবে ইনশাআল্লাহ।'
মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।
mahmudnewaz939@gmail.com