কর মওকুফের ফায়দা লুটছে মধ্যস্বত্যভোগীরা
দৌলত আকতার মালা | Saturday, 6 March 2021
পণ্যের লভ্যতা, উৎপাদন, পণ্য মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য অস্থিতিশীল থাকার কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের উপর কর মওকুফের সুবিধা থেকে ক্রেতারা বঞ্চিত হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা বলেছেন, কর মওকুফের কারণে প্রতি বছর বিশাল অংকের রাজস্ব পরিমাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার। কিন্তু ভোক্তারা নয়, এ মওকুফের ফায়দা লুটছে কিছু মধ্যস্ততাকারী।
যদিও কর মওকুফের কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগার মোট কী পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, সে ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কর ছাড়ের সকল তথ্য মজুদ না থাকায় এ ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা একটি কঠিন কাজ।
বিশ্ব ব্যাংকের পূর্বের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিভিন্ন খাতে কর মওকুফের কারণে মোট জিডিপির প্রায় ২.৫ শতাংশ পরিমান ক্ষতির হিসেব গুনছে সরকার।
এনবিআর এ ব্যাপারে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করে জানিয়েছে, বর্তমানে আরো বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে কর মওকুফ করা হয়েছে বিধায় ক্ষতির পরিমাণ উল্লিখিত পরিমাণের চেয়ে অধিক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কর মওকুফের ক্ষেত্র বৃদ্ধির কারণ হিসেবে শিল্পায়ন, কৃষকদের সুবিধা প্রদান ও সরকারি পর্যায়ে গ্রহণ করা কিছু বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনবিআর দীর্ঘদিন যাবত অপরিহার্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য যেমন চাল, পেঁয়াজ, চিনি, ভোজ্যতেল ও ডালের উপর কর মওকুফের এ সুবিধা প্রদান করে আসছে। বাজারে পণ্যের মূল্যের হেরফের দেখা দিলেই সংবিধিবদ্ধ নিয়ামক আদেশ জারির মাধ্যমে কর মওকুফের ঘোষণা প্রদান করে থাকে এনবিআর।
কিন্তু মূল্য পরিস্থিতির উপর করের নিম্নগতির খুব কম প্রভাব থাকে, যদিও সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগসমূহ এবং বেসরকারি খাতের লোকজন মূল্যবৃদ্ধির চক্র থামানোর জন্য প্রায়ই কর কর্তৃপক্ষের কাছে কর হ্রাসের প্রত্যাশা রেখে থাকে।
কর কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা যায়, বর্তমানে কলাই ও মসুর ডাল এবং ছোলা ব্যতীত অন্য কোনো নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে কর মওকুফের সুবিধা প্রদান করা নেই।
বর্তমানে, চাল, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেল আমদানির ক্ষেত্রে যথাক্রমে ২৫.৭৫, ১০ ও ১৯ শতাংশ এবং চিনির জন্য ৬০ শতাংশ কর প্রযোজ্য হয়ে থাকে। পূর্ব নির্ধারিত করের পরিমাণের কারণে পণ্য মূল্যের উপর কোনো প্রভাব না পড়ায় সরকার চালের কর ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে।
এনবিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কৃষকদের অধিকার রক্ষা, স্থানীয় বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতের কর পূরণে এমনটা করা হয়েছিল বলে।
কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক ক্রেতার কাছ থেকে পণ্যের উচ্চমূল্য আদায় করছেন এবং কর মওকুফের এ সুযোগের অসদ্ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তাগণ।
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি, স্থানীয় বাজারে চালের মূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য একটি দর নির্ণয় সভায় এনবিআর চাল আমদানির জন্য ধার্যকৃত করের পরিমাণ ৬২.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫.৭৫ শতাংশ করেছে।
কর পরিশোধের ক্ষেত্রে বিস্তর পরিমাণ কর মওকুফ করা হলেও স্থানীয় বাজারে চালের মূল্যের উপর তার খুব একটা প্রভাব পড়তে দেখা যায় নি। বিধিবদ্ধ নিয়ামক আদেশ জারির পর ক্রেতার ক্রয়মূল্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে স্থানীয় বাজারে কেবলমাত্র ২ শতাংশ কর মওকুফের দৃশ্যপট সুস্পষ্ট হয়েছে।
শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চাল আমদানীর ক্ষেত্রে কর মওকুফ বাস্তবায়নের পর ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ পর্যন্ত এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ১৪৩ কোটি টাকা।
৭ জানুয়ারি থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৫.৭৫ শতাংশ কর প্রদান হারে মোট আমদানি হয়েছে ২৮২,৩২৮.২৮ টন চাল, যার মূল্যমান ৯৯১ কোটি টাকা। এখানে উল্লেখ্য যে, এই সমপরিমাণ চাল যদি ৬২.৫ শতাংশ হারে কর প্রদানের মাধ্যমে আমদানি করা হতো, তাহলে জাতীয় কোষাগারে আরো ১৪৩ কোটি টাকা কর মূল্য জমা পড়ত।
ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশের পেঁয়াজ আমদানিকারকরা ২২ সেপ্টেম্বর,২০২০ থেকে ০৬ জানুয়ারি, ২০২১ পর্যন্ত বিশেষ কর মওকুফ সুবিধা পেয়েছে। এ সময়ের মধ্যে প্রায় ২৪৪,৫৬৮ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে, যার কর মূল্য ৮২২ কোটি টাকা এবং এর ফলে রাজস্ব খাতে ৪১ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।
সম্প্রতি বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য পণ্যের সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যের ওঠানামাকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ ভোক্তা সমিতির সভাপতি, গোলাম রহমান। তিনি বলেন, সঠিক কর নিরূপণের মাধ্যমে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার এ যাবত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে আমার মনে হয় না।
বাজার স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে ২ শতাংশ হারে কর পরিশোধে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা হয়েছিল। এর সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, চাল আমদানিকারকদের জন্য ২৫ শতাংশ হারে কর পরিশোধ অনেকটা বেশি হয়ে যায়।
তিনি আরো বলেন, কেবলমাত্র স্থানীয় বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্যই নয়, বরং কৃষকদের স্বার্থেও সঠিক কর নিরূপণ করা প্রয়োজন।
অসাধু ব্যবসায়ীদের সুযোগ গ্রহণ প্রসঙ্গে জনাব রহমান বলেন, পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই অসাধু ব্যবসায়ীদের কর্মকাণ্ড রোধ করা যেতে পারে।
স্থানীয় বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার পাম ও সয়াবিন তেল বিক্রির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য(এমআরপি) নির্ধারণ করে দিয়েছে। যদিও ক্রেতারা অভিযোগ করছেন যে এখনও দোকানদাররা এমআরপি না মেনে তাদের কাছে অধিক মূল্যে তেল বিক্রি করছেন।
বাজার পরিদর্শন করে দেখা গেছে যে বর্তমানে ভোজ্য তেল গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশী মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা ও পাইকারি ক্ষেত্রে, উভয়ক্ষেত্রেই ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত টন প্রতি সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৩,৫০০ টাকা, যা তিন দফায় মোট বেড়েছে ১,০০০ টাকা।
সরাসরি মিল থেকে সংগ্রহের ক্ষেত্রে, ডিস্ট্রিবিউটরদের জন্য এবং খুচরা বিক্রির ক্ষেত্রে সরকার লিটার প্রতি সয়াবিন তেলের দাম সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে যথাক্রমে ১০৭ টাকা, ১১০ টাকা এবং ১১৫ টাকা।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস প্রতিনিধি শুল্ক বিভাগের রেকর্ডকৃত তথ্য যাচাই করে দেখেছেন, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা উচ্চ মূল্যে তেল বিক্রি করছে।
শুল্ক বিভাগের চটগ্রাম শাখার তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই-জানুয়ারি এই সময়ের মধ্যে পাম ওয়েল আমদানি করা হয়েছে ৫২৫,২০৮ টন যেখানে তার আগের বছর আমদানি করা হয়েছিল প্রায় ৮৭৬,৪৩৫ টন।
গত জুলাই-জানুয়ারিতে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি করা হয়েছে ৩৬৭,৯৩৬ টন, যা তার আগের বছর আমদানি করা হয়েছিল ৩৪২,৩৩৫ টন।
বিগত কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম ঊর্ধমুখী রয়েছে।
মসুর ও কলাই ডালে কর সম্পূর্ণরূপে মওকুফ করা হলেও বছরে এর দাম বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এ বছরে কলাই ডালের আমদানির পরিমাণ বেড়েছে। গত অর্থ বছরে কলাই ডাল আমদানীর পরিমাণ ছিল ১৭৯,১১৪ টন, যার আমদানি পরিমাণ বেড়ে চলমান অর্থ বছরে দাঁড়িয়েছে ২৯০,৩৮৪ টনে।
পোল্ট্রি খাতেও বিশাল পরিসরে কর সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। গত এক মাসে মুরগির দাম বাড়ানো হয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ।
শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী গত জানুয়ারি পর্যন্ত ৬০,৩৩১ টন চিনি আমদানি করা হয়েছে, তার আগের বছর, যার পরিমাণ ছিল ৫৭,৬৯৫ টন।
নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য নির্ধারণ ও তদারকির জন্য জাতীয় পর্যায়ে গঠিত সমিতির আহবায়ক সদস্য হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ বাণিজ্য ও শুল্ক কমিশনের চেয়ারম্যান, মুন্সি শাহাবুদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, কর মওকুফের ফলে মূল্যহ্রাসের সুবিধা ভোগ করার অধিকার প্রত্যেক ক্রেতার পাওয়া উচিত। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি করের পরিমাণ কমানোর পরে স্থানীয় বাজারে মূল্য হ্রাসের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কোন প্রকার উদ্যোগ গ্রহণ করছে না।
তিনি আরো জানান, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের অবৈধ মজুদ এবং সরবরাহকারী ও ক্রেতার মাঝখানে সুযোগ গ্রহণকারী তৃতীয় পক্ষের অনুসন্ধানে তারা মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করে দেখেছেন।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অভ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক, ডক্টর আহসান এইচ মনসুর বলেন, রাজস্ব খাতে লোকসান ঠেকাতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যের উঠানামার সাথে রপ্তানির সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য একটি প্রশমিত কর ব্যবস্থা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, “কর মূল্যের সাথে স্থানীয় বাজারের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বা হ্রাসের একটি সম্পর্ক রয়েছে। কর মূল্য বৃদ্ধি পেলে তাৎক্ষণিকভাবে তা পণ্যের বাজার মূল্যকে প্রভাবিত করে। অপরদিকে কর মূল্য কমে গেলে বাজার মূল্যের উপর এর প্রতিফলন ঘটতে অনেক সময় লাগে। এর জন্য দোকানদারদের সরাসরি দোষারোপ করা যায় না, কারণ পণ্য গুদামজাত করার ক্ষেত্রে কিছু বাজারনীতি থাকে।”
তিনি আরো বলেন, বিশেষত রপ্তানিকৃত পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে কর হ্রাসের ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বাজার মূল্য কমানো সম্ভব।
এছাড়াও, করের পরিমাণ কমানো হলেও চালের বাজারদর কমেনি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ধানের উৎপাদন সম্পর্কে সরকারকে ভুল তথ্য প্রদানের কারণে এমনটা হয়েছিল।