logo

কত পদের চা রে!

অনিন্দিতা চৌধুরী | Friday, 19 March 2021


এক কাপে চায়ে আমি তোমাকে চাই’—কবীর সুমনের এই গানটি শোনা আছে কি? তা এক কাপ চায়ে আপনি যাকেই চান না কেন, সকালের শুরুতে বা দিন শেষে সন্ধ্যার আড্ডাবাজি মুহূর্তে এক কাপ চা আপনি যে চাইবেন, তা অস্বীকার করার অবকাশ নেই। বাঙালির চা-প্রেম একপর্যায়ে যদিও এই স্তরে ছিল না, তবে এখন তা আতিথেয়তার অন্যতম প্রকাশভঙ্গি হয়ে দাঁড়িয়েছে, ‘এক কাপ চা খেয়ে যান’...এ বাক্যের মাধ্যমে।

চায়ের কাপে ঝড় তুলে বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিয়ে আর তর্ক করেই আমাদের বেশির ভাগ লোকের শিক্ষাজীবন পার হয়ে যায়। কর্মজীবনে সে সময়গুলো নস্টালজিয়া হয়ে প্রায়ই হাতছানি দেয় চায়ের কাপে।

এই চায়েরও রয়েছে নানান ধরন, এরই মাঝে বিশ্বস্বীকৃত কয়েকটি ধরন নিয়ে আজ গল্প হবে চায়ের কাপে।

সাদা চা

এটি মূলত অপ্রক্রিয়াজাত চা। কোনো ধরনের মেশিনের ছোঁয়া ছাড়াই এটি তৈরি করা হয়। চায়ের পাতা গাছ থেকে তোলার পর রোদে শুকিয়ে তৈরি হয় সাদা চা। এর নামটা এসেছে চাপাতার তলানির সাদা অংশটুকু থেকে।

আবহাওয়া অনুকূল না সাদা চা তৈরি করা একটু কষ্টকর। তখন এটিকে ড্রায়ার মেশিনের শরণাপন্ন হতে হয়। প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা জারণ প্রক্রিয়া হয়ে থাকে। এই চা-পাতা শুকোতে কম তাপে অনেকটা সময় রাখতে হয়। অনায়াসে এক দু দিন পার হয়ে যায়। সাদা চা থেকে যে পানীয় তৈরি করা হয়, তা দেখতে ফ্যাকাশে সবুজ বা হলুদ বর্ণের হয়ে থাকে। ঘ্রাণ ও স্বাদে সবচেয়ে মৃদু হয়ে থাকে সাদা চা।

সবুজ চা

সবুজ চা কিছুটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। গাছ থেকে তোলার পর চা-পাতাগুলোতে তাপ প্রয়োগ করা হয়, খানিকটা আপেল বেক করার মতো। সবুজ চা হয় ভাপে সেদ্ধ করা হয়, নয়তো কড়াইয়ে সেঁকা হয়। পাতা যাতে সবুজ থেকে হলুদ বা বাদামির পথে না যায়, সে জন্য বৃদ্ধিকারী হরমোনের গতি থামাতে এ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।

একেক আকৃতির সবুজ চায়ের স্বাদ একেক ধরনের। তাপ প্রয়োগের পর পাতাগুলোকে পুরোদমে শুকোতে হয়। সবুজ চা স্বাস্থ্য-সচেতন ব্যক্তিদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে থাকে, কেননা এটি মেটাবোলিজমের গতি বৃদ্ধি করে।

উলং চা

এটি তৈরি করা সবচেয়ে সময়সাপেক্ষ পদ্ধতির মধ্যে একটি। উলং চায়ের প্রক্রিয়াজাতকরণের মধ্যে মৌলিক পাঁচটি ধাপ রয়েছে। প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। এতে বারবার জারণ প্রক্রিয়া চালাতে হয়। উলং চায়ের স্বাদও সাদা কিংবা সবুজ চায়ের চেয়ে জটিলতর। এতে একধরনের ফুলেল ও ফলেল স্বাদের মিশ্রণ থাকে, যা কিনা পানীয়টিকে অন্য এক মাত্রা দান করে।

ঘ্রাণ ও স্বাদের তুলিতে উলং চায়ের ক্যানভাস সব সময়ই পরিপূর্ণ থাকে বিচিত্রতা ও বৈশিষ্ট্যে।

কালো চা

এর প্রক্রিয়াজাতকরণেও পাঁচটি ধাপ রয়েছে, তবে উলং চায়ের চাইতে এর জারণ প্রক্রিয়া আরও বেশি সমৃদ্ধ ও সম্পূর্ণ। ধাপগুলোও অত জটিল নয়, বেশ সরলরৈখিক ধরনের। একদিনের ভেতরই প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পূর্ণ হয়ে যায়।

কালো চা থেকে প্রাপ্ত পানীয়ের বর্ণ বাদামি থেকে গাঢ় লালের মধ্যে থাকে। স্বাদে সবচেয়ে কড়া চা এটি। আমরা যে চা প্রতিদিন পান করে থাকি, এটি মূলত এই কালো চা। কালো চায়ের সঙ্গে দুধ চিনি মিশিয়ে তৈরি হয় আমাদের অতি পরিচিত-দুধ চা। এমনকি বর্তমানে রেস্তোরাঁগুলোতে জনপ্রিয় আইসড টিও এই কালো চা থেকেই তৈরি। এটি সবচেয়ে নিয়মিত পান করা চা।

পিউরেহ চা

চায়ের জগতে এটি যেন এক শিল্পের নাম। প্রথমে সবুজ চায়ের মতোই পদ্ধতির ভেতর দিয়ে যায় এটি। কিন্তু প্রথমে চা-পাতা শুকিয়ে নেওয়া হয় এবং পরে বিভিন্ন আকৃতি দান করা হয়। পিউরেহ চা মূলত গাঁজনকৃত চা, তবে এ গাঁজন অ্যালকোহল তৈরির প্রক্রিয়া নয়। গাঁজনের প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে চায়ের বর্ণ নির্ধারিত হয়। পিউরেহ চা সবচেয়ে বেশি সংরক্ষণ করে রাখা হয়। অনেক পুরোনো, সংরক্ষণকৃত পিউরেহ চাকেলিভিং টি’ নামে অভিহিত করা হয়।

পিউরেহ চায়ের স্বাদ খুবই উঁচু ঘরানার মনে করা হয় এবং খুব কম মানুষই এটি পান করে থাকেন। 

দু’টি কুঁড়ি একটি পাতা থেকে চায়ের কাপে আসা পর্যন্ত পেরোতে হয় অনেক পথ। এ পথের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করেই পাল্টায় চায়ের রূপ-রস-ঘ্রাণ। তাই চা-পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণের পদ্ধতি সম্পর্কে বোঝাটা বেশ জরুরি। সব ধরনের চায়ের উৎস একই, তবে গন্তব্য ভিন্ন হয় ভিন্ন ভিন্ন পথের কারণে।