এগোচ্ছে রুশ বাহিনী, কিয়েভে থাকার প্রত্যয় জেলেনস্কির
এফই অনলাইন ডেস্ক | Friday, 25 February 2022
ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধ টপকে রাশিয়ার সৈন্যরা রাজধানী কিয়েভের দিকে এগিয়ে আসতে থাকলেও ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাজধানীতেই থাকার প্রত্যয় জানিয়েছেন। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
শুক্রবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি তার এ অঙ্গীকারের কথা জানান বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধ ঘোষণা করার পর বৃহস্পতিবার রাশিয়ার বাহিনী ইউক্রেইনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আক্রমণে নামে। বিস্ফোরণ ও গোলাগুলিতে কেঁপে ওঠা বড় বড় শহরগুলোর আনুমানিক এক লাখ লোক ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে; কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যুরও খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেইনের কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়ার লক্ষ্য হচ্ছে কিয়েভ দখল করা এবং দেশটির পশ্চিমাপন্থি সরকারকে উৎখাত করা।
সীমান্ত অঞ্চলগুলো থেকে কিয়েভে যাওয়ার যতগুলো পথ, তার মধ্যে বেলারুশের দিকে থেকে যাওয়ার রাস্তাই সবচেয়ে সংকীর্ণ; বৃহস্পতিবার রাশিয়ার বাহিনীগুলো ওই পথেই এগিয়ে গিয়ে কিয়েভের উত্তরে চেরনোবিলের একসময়কার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দখলে করে নেয়।
ইউক্রেইনে আক্রমণ শুরুর আগে রাশিয়া বেলারুশে মহড়ার নামে সৈন্য পাঠিয়ে রেখেছিল।
ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, “আমাকে তাদের টার্গেটগুলোর মধ্যে এক নম্বরে রেখেছে শত্রুরা, দুই নম্বরে আমার পরিবার। তারা রাষ্ট্রপ্রধানকে নিঃশেষ করে ইউক্রেইনকে রাজনৈতিকভাবে নিঃশেষ করতে চায়।
“আমি রাজধানীতেই থাকবো। আমার পরিবারও ইউক্রেইনেই আছে।”
পুতিনের দাবি, ইউক্রেইনের ‘গণহত্যার’ হাত থেকে রুশ নাগরিকসহ সাধারণ মানুষকে রক্ষায় রাশিয়া ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ চালাচ্ছে।
জেলেনস্কির নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন সিবিএসকে বলেছেন, “আমার জানামতে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এখনও ইউক্রেইনে স্বপদে বহাল আছেন। অবশ্যই আমরা ইউক্রেইনের সরকারি কর্মকর্তারাসহ অন্যান্য বন্ধুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।”
প্রায় সাড়ে ৪ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ইউক্রেইন আয়তন বিবেচনায় রাশিয়ার পরই ইউরোপের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় প্রজাতন্ত্রটির জনগণ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছিল; গত কয়েক বছর ধরে তারা যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট নেটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার চেষ্টা জোরদার করে, যা পুতিনের রাশিয়াকে ক্ষেপিয়ে দেয়।
ইউক্রেইনের ওপর হামলা ‘আসন্ন’ এবং রাশিয়া তাদের দক্ষিণের প্রতিবেশী দেশের সীমান্তে বিপুল সেনা মোতায়েন করেছে জানিয়ে উপগ্রহের ছবি প্রকাশ করে পশ্চিমা দেশেগুলো বারবার সতর্ক করে আসলেও পুতিন বেশ কয়েক মাস ধরেই ‘ইউক্রেইনে হামলার পরিকল্পনার’ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে আসছিলেন।
গত সপ্তাহ থেকে তার ‘সুর’ চড়া হতে শুরু করে; বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় ভোরের দিকে তিনি ইউক্রেইনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দেন।
রাশিয়ার এ আগ্রাসনের পর দেশটির ব্যাংক, সরকার ও অভিজাতদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। রাশিয়া ইউক্রেইনের পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা দোনেৎস্ক ও লুহানস্কের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এ দেশগুলোও ইইউর তরফ থেকে একদফা নিষেধাজ্ঞার খাড়ায় পড়েছিল।
রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি উৎপাদক দেশ; তাদের পাশাপাশি ইউক্রেইনও বিশ্বের শীর্ষ শস্য রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে আছে। করোনাভাইরাস মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টার মধ্যেই এ যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা এরই মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুন সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও নেটোর অন্য সদস্যরা ইউক্রেইনকে সামরিক সহায়তা পাঠালেও ইউরোপজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে এই আশঙ্কায় ইউক্রেইন বাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধে সহায়তা করতে কোনো সেনা পাঠায়নি।
রাশিয়ার আক্রমণের প্রথম দিনে সামরিক ও বেসামরিকসহ মোট ১৩৭ জন নিহত হয়েছে এবং কয়েকশ আহত হয়েছে বলে শুক্রবার জানিয়েছেন জেলেনস্কি।
ইউক্রেইনের বিভিন্ন জায়গায় তুমুল লড়াইয়ের মধ্যেই শুক্রবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে ও মস্কো অনতিবিলম্বে সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।
রাশিয়ার ভিটো ক্ষমতা থাকায় প্রস্তাবটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে; প্রস্তাবটির ব্যাপারে চীন কী অবস্থান নেবে তা নিয়েও অস্পষ্টতা আছে। বেইজিং এখন পর্যন্ত রাশিয়ার পদক্ষেপকে ‘আগ্রসন’ অ্যাখ্যা দেয়নি।
ইউক্রেইনে রুশ বাহিনীর আক্রমণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভ হয়েছে রাশিয়ার ভেতরও; বৃহস্পতিবার দেশটির কর্তৃপক্ষ রাস্তায় নামা শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটকও করেছে।
শুক্রবার ভোররাত থেকে ইউক্রেইনের রাজধানী কিয়েভসহ দেশটির বিভিন্ন অংশে বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে রাশিয়ার বাহিনীগুলো। তারা উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দিক থেকে কিয়েভের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেইনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভের আশপাশে রুশ সেনাদের সঙ্গে ইউক্রেইনীয় সেনাদের তুমুল লড়াই চলছে।