এখনো চিঠি লেখেন তারা
অনিন্দিতা চৌধুরী | Tuesday, 15 March 2022
যোগাযোগের রূপ-প্রকৃতি বারবার বহু মোড় নিয়ে বদল হয়েছে আমাদের ভাবের আদান-প্রদানের ভঙ্গিমা। চিঠি একসময় নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল, যা কিনা এখন মোটামুটি বিলুপ্তই বলা চলে।
তবু এই ডিজিটাল যুগে ফোন-ম্যাসেজ-ইমেইলের ফাঁকফোঁকরে কোথাও একটু আয়েশ করে চিঠি লেখা হয়, শহুরে বাতিরা নিভে যাবার আগে খামে পোরা হয় কথাদের।
যে কথা হয়নি বলা তেমন করে, সে কথারই পরোয়ানা হয়ে যায় একটা চিঠি। আজকের এ লেখায় আমরা এমন কিছু ব্যক্তির বক্তব্য তুলে আনবো, যারা এখনো সময় পেলে কোনো এক বিশেষ ছুতোয় লিখে ফেলেন চিঠি।
প্রথম সারির একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সাব-এডিটর নুসরাত জাবীন চিঠি লেখেন মাঝে মাঝে। তবে চিঠি দেয়ার চাইতে চিঠির উত্তর পেতে বেশি ভালো লাগে তার। চিঠি হাতে আসা, খাম খোলার মধ্যে লুকিয়ে থাকে বিশেষ এক আবেদন। চিঠি এত প্রিয় হলেও তিনি মনে করেন, চিঠির যুগে ফিরে যাওয়াটা বেশ কঠিন হবে।
এই ইলেকট্রনিক সময়ে টেক্সটিং বা চ্যাটিংয়ে আমরা এত দ্রুত উত্তর পেয়ে যাওয়ায় অভ্যস্ত যে এত বেশি অপেক্ষা করা বোধহয় সইবে না। তবু ব্যস্ততার ফাঁক গলে একটু সময় খুঁজে নিয়ে অপেক্ষার খাম খুলতে ভালোবাসা এই ব্যক্তিটি জানিয়ে দেন, “এই মেসেঞ্জারের যুগেও চিঠি পেতে চাই”।
‘ভারতের মাদ্রাসা’ শিরোনামে গতবছর পাঠক মহলে প্রশংসিত একটি বই লিখেছেন লেখক মীর হুযাইফা আল মামদূহ। চিঠি লেখার উপভোগ্যতা নিয়ে তার ভাবনা অন্যরকম।
“চিঠির উপভোগ্য বিষয় হচ্ছে, লেখার শৈলী, ধরন। আমি যখন চিঠি লেখি, চেষ্টা করি, তাতে নতুনত্ব আনতে। বলায়, বাক্যে, বাক্যের থ্রোয়িং-এ, নানা কিছুতে। যা আমি সাধারণ, অফিসিয়াল কোথাও ব্যবহার করতে ইতস্তত করি, সেটাও চিঠিতে চেষ্টা করি। আর প্রেমের চিঠির ক্ষেত্রে যেহেতু ‘কনভিন্স’ করার ব্যাপার থাকে, ফলে, সেটার পরিবেশনা সুন্দর করবার একটা ব্যাপার থাকে। এটা আমাকে লেখায় ঋদ্ধ করে। আনন্দিত করে।”
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সহযোগী আফসানা প্রীতি জানান, চিঠি কেন এখনো তার এত প্রিয়- “আমার মনে হয় কাগজ-কলমের সাদাকালোতে আমরা যে অভিব্যক্তি করতে পারি, সেই অনুভূতি আসলে চ্যাটবক্সে আসে না। আমি কাছের মানুষদের লিখতে দারুণ ভালোবাসি।
“আর সুযোগ পেলে কাগজ-কলম নিয়ে লিখেই ফেলি, যা যা বলতে চাই। কিন্তু আমার চিঠির উত্তর পেতে বেশি ভালো লাগে। এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যখন মুহূর্তের মধ্যেই বার্তা পাওয়া সম্ভব, তখন আমার খামবন্দী চিঠির জন্য অপেক্ষা খুব উপভোগ্য লাগে। সেই চিঠিগুলো বহুদিন পর যখন ধুলোমাখা তাকে বা হঠাৎ পুরনো কোনো বইয়ের মধ্যে পাই, তখন খুব আনন্দ হয়! আমার কাছে মনে হয়, একেকটি চিঠি আসলে অনেক অনুভূতি, গল্প ও না বলা কথার মিশেল।”
চিঠি নিয়ে তার মায়ের সাথে একটি মিষ্টি অভিজ্ঞতাও ভাগ করেন, “একবার আম্মু খুব বকা দিয়েছিলো। আমি একটি চিঠিতে তার প্রতি আমার কষ্ট আর অভিমানের কথা লিখে রান্নাঘরে রেখে দিয়েছি। আম্মু সেটি পেয়ে পরে অনেক আদর করে দিয়েছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সুজন সেনগুপ্তের লেখা চিঠিগুলো বেশিরভাগ মাধ্যম হিসেবে পায় আধুনিক প্রযুক্তিকেই। কাগজ-কলমে তেমন একটা না লিখলেও তিনি চিঠি লেখার জন্য ব্যবহার করেন বিভিন্ন অ্যাপ।
“আমি একটি অ্যাপ ব্যবহার করি। ওটাতে বিদেশের মানুষদের কাছে চিঠি পাঠানো যায়। তারা সে চিঠির উত্তর দেয়, এভাবে চিঠি চালাচালি শুরু হয়। মজার ব্যাপার হলো, এক্ষেত্রে চিঠি পাঠালে তা উদ্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছাতে দূরত্ব অনুযায়ী সময় নেয়। যেমন, পাশের দেশ ভারতে চিঠি পাঠালে তা এক-দু ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যায়। আবার ব্রাজিলের কোনো কলমবন্ধুকে চিঠি পাঠালে তা তার হাতে পৌঁছাতে দু’দিন পর্যন্ত লাগে।
চ্যাটিংয়ের সাথে পার্থক্য হলো অপেক্ষার ব্যাপারটা। এখানে চিঠির জন্য অপেক্ষা করার একটা অনুভূতি তৈরি হবে। স্লোলি নামের এই অ্যাপটিতে দেখা যাবে একটি চিঠি আসছে, কিন্তু সেটি পড়তে হলে দুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
“এ অপেক্ষাকাল মাঝেমধ্যে বেশি ঠেকে, নির্ভর করে আপনার ওই বন্ধুর সাথে সম্পর্ক কতটা গভীর হয়েছে। তবে কিছুদিন পর চাইলে, দু’পক্ষের পারস্পরিক সম্মতিতে একে অপরের সাথে অন্য যেকোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্ত হতে পারেন।”
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-এর প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট সুমাইয়া জাহিদ মনে করেন, চিঠি মানে সবসময় ‘না বলতে পারা কথা’ নয়। যার সাথে প্রতিদিন দেখা হয় বা ফোনে কথা হয়, চিঠি দেয়া যায় তাকেও।
সামনাসামনি বা মোবাইল ফোনের কথোপকথনে যে কথা বলার সুযোগ আছে- চিঠিতে তিনি সেগুলোই লিখে দিতে ভালোবাসেন। তার মতে, মূল পার্থক্যটা এই লিখে দেয়াতেই।
চিঠি লেখার সময় যে যত্ন থাকে, তাই যেন চিঠিকে বিশেষ করে তোলে তার কাছে। তার ভাষায়, “খুব সাধারণ কথাও তাই চিঠিতে হয়ে ওঠে অনেক আবেগী, অনেক অনুভূতিপূর্ণ।”
প্রতিদিনের জীবনে চিঠি এখন আর আগের মতো ‘জরুরি’ নেই ঠিকই, তবু যারা এখনো চিঠি লিখতে ভালোবাসেন, তাদের মাধ্যমে যোগাযোগের এই সুন্দর মাধ্যমটি বেঁচে থাকুক, পূরণ হোক এমন কবিমনের এমন আকুল আবেদনও-
“করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও
আঙ্গুলের মিহিন সেলাই- ভুল বানানেও লিখো প্রিয়।”
অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
anindetamonti3@gmail.com