logo

একটি প্রজন্মের ক্যাম্পাস জীবনের জমাখরচের হিসাব নিকাশ

খাজা মাঈন উদ্দিন  | Saturday, 7 August 2021


৩৩ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা এক নতুন জীবন শুরু করেছিলাম। আমরা তখন তারুণ্যের উন্মাদনা ভরা এক মহা রোমাঞ্চকর জগতের মধ্যে। এমন এক রোমান্টিসিজমের মধ্য দিয়ে তখন আমরা যাচ্ছিলাম যেন মনে হতো, জীবন–জগত–সমাজে অসম্ভব বলে কিছুই নেই।

উচ্চশিক্ষা যে জ্ঞান ও চিন্তার বহুরৈখিক দিগন্ত উন্মোচন করে তা প্রমাণ করাই তখন আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা এমন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সময়টা পার করেছিলাম যে, সে সময়ে ক্যাম্পাসে রাখা প্রত্যেকটি পদক্ষেপ আজও স্মৃতিমেদুর বিষয় হয়ে আছে।

১৯৮৮ সালের ৮ আগস্ট আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ক্লাসটি হয়েছিল লেকচার থিয়েটার গ্যালারিতে। আমি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র ছিলাম। আমার সাবসিডিয়ারি বিষয় ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞান। প্রথম ক্লাসটি হয়েছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানেরই। নতুন সহপাঠীদের অনেকেই আন্তরিকভাবে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে এসেছিল। কলা অনুষদের অন্য সাবজেক্টগুলোর শিক্ষার্থীরা যখন অন্য সাবসিডিয়ারির ইংরেজি ক্লাস করতে আসলো, তখন সেই সুবাদে আমাদের মধ্যে আরও চেনাশোনা হলো। জানাশোনা হতে শুরু করল। পরের ছয় বছর আমরা সহপাঠীরা রীতিমতো মিষ্টি কিনে সবার মধ্যে বিলি–বন্টন করে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিন উদযাপন করেছি।

ক্যাম্পাস ছাড়ার এতগুলো বছর পরও আজ পুরোনা বন্ধুরা সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রতিটি ঘটনার উচ্ছ্বাসময় মুহূর্তগুলো মনে করিয়ে দেয়। ওই সময়ের সবচেয়ে আনন্দের বিষয় ছিল, এই শিক্ষার পরিসরটি শহুরে তারুণ্য কিংবা গ্রামীন জীবন থেকে উঠে আসা উজ্জলতম ও মেধাদীপ্ত একটি প্রজন্মের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করেছিল। শিক্ষকেরা আমাদের যেসব বইপত্তর পড়তে বলতেন তার বাইরে আমরা বন্ধুরা একজন আরেকজনকে নানা ধরনের পড়াশোনায় উদ্বুদ্ধ করতাম। এভাবে টাঙ্গাইলের নাগরপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম সুদামপাড়া থেকে উঠে আসা একটি লাজুক ছেলে তার চেনাজানা পারিবারিক আবহের বাইরের এক বৈচিত্রপূর্ণ বিরাট জগতের সঙ্গে পরিচিত হলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, আইআর ডিপার্টমেন্টের সেমিনার লাইব্রেরি, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, পাবলিক লাইব্রেরি, ব্রিটিশ কাউন্সিল, আমেরিকান সেন্টার (ইউসিস), গ্যাটে ইনস্টিটিউট, আলিয়ঁস ফ্রঁসেস, আইআইএসএস, নিউ মার্কেট ও নীলক্ষেতের  বাইয়ের দোকান—এসবই ছিল আমাদের পাঠ্যবই বহির্ভুত বৈশ্বিক পাঠভিত্তিক চিন্তা ও মনন সাধনার পীঠস্থান। আর আবাসিক হল ও খোলা জায়গায় আমাদের যে আড্ডা হতো, তা ছিল জানাবোঝা, পারস্পরিক জ্ঞান বিনিময়, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক  পরিশোধন এবং ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার প্রস্তুতি পর্বের গবেষণাগার। এই আড্ডা শুধু ব্যক্তির উন্নয়নে নয়, জাতিগঠনের চিন্তায়ও তা ভূমিকা রেখেছে। এইসব আড্ডার বদৌলতেই আমি ছাত্রজীবনে দৈনিক এবং সাময়িকীতে সৃজনশীল কিছু লিখতে চেষ্টা করেছিলাম।

আমরা সে সময় এতটা সিরিয়াস ছিলাম যে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অসুস্থ এক বন্ধুকে দেখতে গিয়ে সেখানে উপস্থিত থাকা এক কোর্স টিচারের সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত এক গুরুগম্ভীর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে ফেললাম। সে এক আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভরা দিন ছিল আমাদের!

মনে পড়ছে, একবার এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে আমরা কয়েকজন দেখা করতে গিয়েছি। তাঁর বাসায় যাওয়ার পর আমাদের মধ্য থেকে একজন আচমকা সেই বাড়ির ব্যালকনিতে নাচা শুরু করে দিল। আমরা বন্ধুরা খুব কমসময়ই নিঃসঙ্গ মুহূর্ত পার করেছি। ওই সময় আমরা যতগুলো সজ্জন মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলাম এখন তাদের সবাইকে খুব বেশি মনে পড়ে। বাংলাদেশের আর্থ–সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে এটি আমাদের সুযোগেরও অধিক কিছু ছিল। যখনই আমরা কোথাও গিয়েছি, তখন লোকরা আমাদের দিকে প্রশংসাসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলত, ‘ওই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।’

আমি মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি, আমরা জাতির কাছ থেকে যতটুকু নিয়েছি তার বদলে কতটুকু দিতে পেরেছি? ১৯৮০ এর  দশকের শেষের দিক থেকে ১৯৯০ এর দশকের শুরুর দিকের বাতায়ন হয়ে উঠে আসা প্রজন্ম কিছু জাতীয় চেতনার কথা উচ্চারণ করেছিল। এই প্রজন্মটি মানুষের অধিকারের বিষয়ে সোচ্চার হয়েছিল। গণতন্ত্রের দাবিতে এই সময়টায় বাংলাদেশ ছিল উত্তাল। গোটা বিশ্বই তখন গণতন্ত্রের জন্য একটা সংগ্রামমুখর সময় পার করছিল। আমরা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের ঘটনা এবং ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর প্রতি নিবিড়ভাবে মনোযোগী ছিলাম।

যে সংস্কৃতি মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে, যে পরিবেশ–প্রতিবেশ মানুষকে মানসিকভাবে বামন করে ফেলে আমরা সেই সংস্কৃতি ও পরিবেশ এ জীবনে আশা করিনি। আমরা যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলাম তা এখনো অর্জিত হয়নি বলে আমাদের অনুশোচনা করার কিছু নেই। ইতিহাস শুধু গুটিকয় কিংবা একটিমাত্র যুগ নিয়ে চলে না। আমরা জানি, বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নকে আবার প্রজ্জলিত করতে হবে, অনাগত দিনগুলোকে কীভাবে গঠনমূলক উৎকর্ষে উন্নীত করা যায় তা আমাদেরই ঠিক করতে হবে। ব্যক্তিগত পরিমণ্ডল বিবেচনায় বলতে পারি, আমার বেশিরভাগ বন্ধুই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি করেছে। সাংবাদিকতায় সামান্য অবদান রাখতে পেরে আমিও নিজেকে ধন্য মনে করি।

যাই হোক, আমাদের সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা (ওই সময় কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না) অনেক শিক্ষার্থী আছেন যাঁদের মনে এমন আক্ষেপ আছে, সমাজে অবদান রাখতে হয়তো তাদের আরও ভালো অবস্থান জরুরী ছিল। এসব মানুষকে ধৈর্য ধরে বাস্তবতার সঙ্গে তাদের নিজ নিজ চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। মনে রাখা দরকার, যতক্ষণ মানুষ তার বিবেকের কাছে পরিষ্কার, ততক্ষণ সে মহান। আমাদের প্রজন্মের কাছে অন্তত একটি উজ্জ্বলতম ক্যাম্পাস জীবনের অতীত ঐশ্বর্য রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, সেই ঐশ্বর্যের আভা ম্লান হয়ে যায়নি। আমাদের স্বপ্নময় দিনগুলো সেই আভাতে উদ্ভাসিত হওয়ার সময় এখনো আছে।

khawaza@gmail.com