logo

একজন আসির আরমান আর একা বেঁচে থাকতে শেখার গান

সঞ্জয় দত্ত | Saturday, 2 April 2022


আসির আরমান। কখনো তিনি ওপারে বসে তারার মাজারে তার প্রিয়তমার জন্য শিরনি দেন। কখনোবা ঘুম বন্ধক রাখেন দিলরুবার টিপে। আবার কখনো এক বুক আক্ষেপ নিয়ে গলায় তোলেন, এটা মানুষই পারে ভাই মানুষই পারে, ফুসলিয়ে বুকে তোলে ভাগাড়ে ছুঁড়ে।

গানগুলো তিনি নিজেই লেখেন, সুর করেন এবং গেয়ে যান প্রাণভরে।

শুরুর গল্প

পারিবারিক ভাবেই পেয়েছেন সংস্কৃতির আগর ঘ্রাণ। বাবা ছিলেন খ্যাতনামা ছড়াকার ও বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত গীতিকার। সে সুবাদে পদ্যে তালের তালিমের ওস্তাদ তার বাবাই।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে মাজার সংলগ্ন এলাকায় গ্রামীণ আনন্দে বড় হওয়া আসির প্রায়ই কানে মাখতেন আধ্যাত্মিক ঘরানার সংগীত। দশম শ্রেণীতে মায়ের কিনে দেয়া গিটার যেন তাকে আরও বেশি উজ্জীবিত করে। কলেজে (চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট) বাজিয়েছেন গিটার, আলাদা রোমাঞ্চ ছিল তাকে ঘিরে।

সংগীতের শুরুর যাত্রা প্রসঙ্গে আলাদা করে আসির বলেন সালাম ভাইয়ের কথা। তার দেয়া ৮০ জিবি (গিগাবাইট) বিশ্বজোড়া গানের ভান্ডার তাকে বিস্তর ভাবিয়েছে, শিখিয়েছে অনেক কিছু। রকিব নামে আরেক বাউল সাধক তাকে দিয়েছে বাউলিয়ানার সুধা। সংগীতের শুভ যাত্রায় অনুপ্রেরণার আধেয় হিসেবে রাহুল আনন্দ, কনক আদিত্যসহ আরও অনেকের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা জানান তিনি। 

নিজের কোনো ব্যান্ডদল প্রসঙ্গ

“চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পর ভর্তি হই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু সেখানকার পরিবেশে নিজেকে খুঁজে পেতে বেশ বেগ পোহাতে হয়। তখন এক বন্ধু বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় স্থানীয় এক বড় ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কথা বলে।”

স্থানীয় বড় ভাইয়েরা যেমন হয়, তিনি (প্লাবন) তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। ধীরে ধীরে তার সাথে ওঠাবসা বাড়ে আসিরের। একটা সময় তার মনে হয় এই সেই লোক যাকে হয়তো তিনি খুঁজেছেন বারবার। আত্মিক মেলবন্ধনও জমে ওঠে দারুণ। পরে তাকে সংগীত নিয়ে নিজের আগ্রহের কথা জানান আসির। তাদের একটা ব্যান্ডদল দাঁড় করানোর প্রস্তাব দেন তিনি।

পরে 'মায়া নহর' নামে বন্ধুদের নিয়ে তৈরি করেন ব্যান্ডদল। যদিও খুব বেশিদিন দলটি নিয়ে পথচলা হয়নি। অতঃপর জলের গানে বাজিয়েছেন তিন বছর।  

একক গানের গল্প

একা বেঁচে থাকতে শেখো প্রিয় গানের মধ্য দিয়ে তার জনপ্রিয়তা বাড়ে। কিন্তু শ্রোতারা কি জানতেন, গানের শিল্পী যে নিজেই চাইতেন না গানটি সবাই শুনুক?

“একদিন রুবায়াত ও রুসলানের (দ্য রেহমান ডুয়ো) দাওয়াতে যাওয়া হয় ওদের বাসায়। একদম যেন ধরে - বেধে রেকর্ড করার তাগাদা দেয় তারা। ওদের বাসায় চমৎকার একটি লাইটের দিকে আমাকে ঠেলে দিয়ে হাতে গিটার ধরিয়ে বলে, ‘এত এত গান লিখে ফেলে রাখবি তুই? আজকেই শুরু কর, এখনই গাইতে হবে তোকে!’ বন্ধুর কথা না রাখি কেমন করে?”

গানটি আপলোডের পরের গল্প সবার জানা। গানটি আসিরের বুক থেকে সংক্রামক হয়ে ছড়িয়ে গেলো সবার বুকে। এখানেও শিল্পী পেয়েছেন অন্যরকম যন্ত্রণা। তার কিছু সবার হয়ে গেলো যে। তিনমাস বন্ধ রাখেন ফেসবুক। নিজের ভেতরে ডুব দিয়ে বুঝলেন, আমার চাইতে সবার শব্দটার মধ্যেই তো শিল্পের আনন্দ।

গাইছেন তার প্রিয় গান। ছবি: ফেসবুক

শিল্প এবং অর্থ নিয়ে তার ভাবনা

“দিনশেষে ক্ষুধা লাগে। ক্ষুধা কাটাতে টাকা লাগে। শিল্পী যদি তার কর্ম থেকে বিনিময় বলতে কিছুই না পায় তবে শিল্পের সার্থকতা থাকে না। শিল্প বাঁচাতে শিল্পীকে আগে বাঁচানো দরকার। আক্ষেপের কথা হলো, দেশে এখনো অনেকেই আছেন যারা ফ্রি-তে গান খোঁজেন, যা সত্যিই পীড়া দেয়,” দুঃখ করে বলছিলেন আসির।

সংগীত কি বাংলাদেশে পুরোদস্তুর পেশা হিসেবে নেয়া যায়? আসির বলেন, “স্কুল পর্যায় থেকে শুনি, আর্ট মানে এক্সট্রা কারিকুলাম। অর্থাৎ, সকল কিছুর ফাঁকে ফাঁকে করার জিনিস। অথচ, সংগীতই হোক আর সিনেমা কিংবা ছবি আঁকাই হোক, পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই তার আলাদা কদর রয়েছে। এগুলোও যে পেশা হিসেবে নেয়ার জিনিস, পড়ার বিষয়, আমাদের দেশে এখনো এমন পরিবেশ প্রতিষ্ঠা পায়নি। আধুনিক জামানায় তা বড্ড হতাশার।”

কপিরাইট প্রসঙ্গ

“দেশ নিয়ে নেতিবাচক কিছু বলতে কষ্ট লাগে। কিন্তু না বললে তো পরিবর্তনটুকু আসে না। একটা কিছু তৈরি করতে যে পরিমাণ খাটাখাটুনি করতে হয় তার বিনিময়ে যদি প্রাপ্যটুকুও সঠিকভাবে বুঝে না পাই, তখন কেমন লাগে তা বলে বোঝানো মু্শকিল।”

“কারো গান থেকে কী পরিমাণ উপার্জন হয় তা দেখার মতো কোনো ড্যাশবোর্ড এখনো দেশে তৈরি হয়নি। ফলে আমি বাধ্য হয়ে দেশের বাইরে কিছু জায়গায় আমার গানগুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি,করছি।”

গান গাওয়া আর ভবিষ্যৎ ভাবনা

নিজের সাথে যা ঘটে বা যা কিছু খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে দেখেন, তা নিয়েই কিছু একটা লেখার চেষ্টা করেন আসির। তিনি নিজেকে স্বভাব কবি মনে করেন না। অনেক দূরের কিছু খুব বেশি না জেনে তিনি গানে আনতে পারেন না বলে জানান। নিজের গানগুলোকে তাই তিনি নিজের অভিজ্ঞতার দান মনে করেন।

“আমি আমার সব কাজ নিজ হাতে করতে চাই। সুতরাং, একক গান নিয়েই ভাবনা থাকবে বেশি। তবু যদি কোনোদিন প্রয়োজন বোধ করি, সেক্ষেত্রে ব্যান্ড নিয়ে ভাবতে পারি। পেশাগত জায়গা থেকে আমি ফটোগ্রাফি করি। আর যা না বললেই নয়, আমি সবার আগে একজন বাদ্যযন্ত্রী,” বলেন আসির।

‘ভালোবাসুক বা ছুড়ে ফেলুক, তবু আমাকে জানুক’

সম্প্রতি আসির একটি গানের ভিডিও আপলোড করেছেন তার ইউটিউব এবং ফেসবুক পাতায়। গানের কথাগুলো এমন—

বয়োসন্ধির ঝাঁঝে বইছে কিশোরী হাওয়া, আমাদের ঠিক করা ছিল যেন কোথায় যাওয়া।

তবে গানটির মধ্যভাগের দু'টো লাইন আসিরের বেশি পছন্দের - ‘দম ছেড়ে হুম বলো; হুমকির মতো লাগে, ক্ষুদ্ধ কপালভাজে প্রেমাকুতি দারুণ লাগে।’

শ্রোতা প্রসঙ্গে আসির বলেন, “শিল্পীর জন্য শ্রোতা সবসময়ই আশীর্বাদ তুল্য। তবে আমি আমার কাজের ক্ষেত্রে আমার ভাবনাকেই সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করি। আমি চাই, আমার ভাবনাটাকে শ্রোতা জানুক, ভালোবাসুক অথবা ছুঁড়ে ফেলুক। ক্ষতি নেই।”

আসিরের গানে প্রেম, বিদ্রোহ, আক্ষেপ সমস্তকিছুই থাকুক, শ্রোতাদের হৃদয়ে তার প্রতিটি গান জায়গা করে নিক আর শ্রোতারা তার গানের মাঝে খুঁজে পাক একা বেঁচে থাকার শিক্ষা। 

সঞ্জয় দত্ত ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। 

sanjoydatta0001@gmail.com