logo

একজন আলী কেনানের উত্থান পতন: রাজনৈতিক আবহে মাজার ব্যবসার চিত্র

অর্থী নবনীতা | Friday, 28 January 2022


‘একজন আলী কেনানের উত্থান পতন’ উপন্যাসের সূচনাটা হয় একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামকে কেন্দ্র করে। উপন্যাসের লেখক আহমদ ছফা কালজয়ী নানা সাহিত্যকর্মের জন্য হয়ে উঠেছেন পাঠকমহলের প্রিয়মুখ। 

১৯৮৯ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসে গল্পের আবহে তিনি মূল কাহিনী বর্ণনা করেছেন। গল্পের মূল চরিত্র আলী কেনান –এর জীবনের উত্থান-পতনের মাধ্যমে আমাদের সমাজে শিকড় গেঁড়ে রাখা মাজার ব্যবসার আসল লেবাস উন্মোচন করেছেন। আবার একই সাথে দেখিয়েছেন যে, নেতিবাচক পথে যতই অহংকার বা দাম্ভিকতা নিয়ে চলা হোক না কেন, তার পতন অবধারিত।  

‘হয় মারো না হয় মরো’ ভাবধারার আলী কেনান প্রচন্ড দাম্ভিক ও চতুর একজন মানুষ। উপন্যাসের একদম শুরুতেই এর প্রমাণ মেলে। ঘটনার ব্যাপ্তি ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। উপন্যাসের প্রথম অংশে দেখা যায় প্রভাবশালী গভর্নরের ছত্রছায়ায় এসে চরের বাসিন্দা আলী কেনানের উত্থানের গল্প। 

গভর্নর সাহেবের জীবন বাঁচানোর মধ্য দিয়ে আলী কেনানের জীবনে সৌভাগ্যের চাঁদের উদয় হয়। আলী কেনানের এমন আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার সুবিধা আলী কেনানের ও তার পরিবার অনেক দিন পর্যন্ত ভোগ করে। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে সেই গভর্নর সাহেবই তাকে রাস্তায় ফেলে দেন।

উপন্যাসের দ্বিতীয় অংশে ধসে যাওয়া আলী কেনান আবার নতুন করে সংগ্রাম শুরু করে। ভিক্ষাবৃত্তি থেকে শুরু করে সে মাজার ব্যবসা দিয়ে আখের গোছানোর চেষ্টা করতে থাকে। আর এখানেই সে মানুষের মানসিক দুর্বলতার জায়গাকে পুঁজি করে। তার ভাষ্যে, মাজারে মানুষ আসবেই। কারণ মানুষ ভাবে সে দুর্বল, অসহায় এবং একই সাথে উচ্চাকাঙ্ক্ষী।  

এভাবে আহমদ ছফা এমন ভণ্ড ব্যবসায়ীর মুখোশ উন্মোচন করে দেন। সমাজে এইসব ভণ্ড মাজার ব্যবসায়ীর প্রভাব বিস্তারের ফলে সমাজের মানুষের ধর্মীয় অন্ধত্ব ও গোঁড়ামিই দায়ী তা সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেন। অতি চালাক ও সাবধানী মানুষ আলী কেনান খুব হিসাব করে মাজার ব্যবসাকে প্রতিষ্ঠিত করে তোলে। কিন্তু তার মধ্যে সব সময় দুর্বলতা উঁকি মারতো। 

ছমিরন ও তার মেয়ে আঞ্জুমন দুটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র যারা আলী কেনানের দুর্বলতার জায়গায় আরো প্রবল ভাবে কড়া নাড়তে থাকে। কিন্তু একসময় এই ফুলে ফেঁপে ওঠা আলী কেনানের প্রতিপত্তি ধুলিস্মাৎ হয়ে যায়।

এই উপন্যাসের আরেকটি বিশেষ দিক হচ্ছে আলী কেনান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের মধ্যে সম্পৃক্ততার জায়গা আনয়ন। উপন্যাসে গণঅভ্যুত্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রেক্ষাপট বিবৃত হয়েছে। আহমদ ছফা বঙ্গবন্ধুর প্রভাবের সাথে আলী কেনানের প্রভাব- প্রতিপত্তি আবার একই সাথে এত প্রভাবের পরেও বঙ্গবন্ধুর নির্মম মৃত্যু এবং আলী কেনানের সব হারিয়ে পুনরায় ধসে যাওয়ার সম্পর্ক দেখিয়েছেন। 

আলী কেনান নিজেও বঙ্গবন্ধুর সাথে নিজের মিল খুঁজে পান। সে নিজেকে জয়বাংলার দরবেশ বলে মনে করে। মাজারের একটি ঘরকে জয়বাংলার অফিস বানায় সে। এটা আলী কেনানের ইতিবাচক দিক। সে মনে করে,  বাংলাদেশে সে আর শেখ মুজিব ছাড়া কোনো ‘বাঘের বাচ্চা’ নেই। কিন্তু সব শেষ হয়ে যায় আলী কেনানের পতনের মধ্য দিয়ে। তার জাগতিক মোহই তাকে একসময় নিঃশেষ করে দেয়। 

এই উপন্যাসের যেমন আছে রাজনৈতিক গুরুত্ব, সাথে আছে সমাজের মাজার সংস্কৃতির মূলোৎপাটন। দাম্ভিকতা নিয়ে কখনোই টিকে থাকা যায় না। এভাবেই করুণ পরিণতি নিয়ে শেষ হয় উপন্যাসটি। বইটি পড়া শুরু করলে, শেষ না করে পারা যায় না। এক প্রকার মিশ্র অনুভূতি পাঠককে বার বার নাড়া দিতে থাকে।

অর্থী নবনিতা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

aurthynobonita@gmail.com