উৎপল-বিউটির উদযাপনের লগ্ন এখন শোকের মঞ্চ
এফই অনলাইন ডেস্ক | Monday, 4 July 2022
ছাত্রের মারধরে প্রাণ হারানো উৎপল কুমার সরকারের পরিকল্পনা ছিল, এবার ৩০ জুন বিয়ে বার্ষিকীটা ধুমধাম করে উদযাপন করবেন। স্বজনদের সম্মিলন ঘটাবেন বাড়িতে।
স্বজন সম্মিলন সেখানে হবে, তবে তা বিয়েবার্ষিকীতে নয়, হবে উৎপলের শ্রাদ্ধে। বিয়ের তিন বছর পূর্ণ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে উৎপলের স্ত্রী বিউটি রাণী নন্দীকে বরণ করতে হয়েছে অকাল বৈধব্য।
এ দম্পতির তৃতীয় বিয়ে বার্ষিকীর একদিন পর উৎপলের সেই পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন বিউটি। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার এলংজানী গ্রামে উৎপলদের বাড়িতে গত শুক্রবার তার সঙ্গে কথা হয়। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
সমাজের নিয়ম মেনে বিউটির পরনে এখন বৈধব্যের বেশ; সাদা শাড়িটি তিনি পরেছেন কুঁচি না দিয়েই। সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেলা হয়েছে। খুলে রাখা হয়েছে মঙ্গলসূত্র। বৈবাহিক জীবনের চিহ্ন হিসেবে তিন বছর আগে হাতে পরেছিলেন যে শাঁখা-পলা, তাও ভেঙে ফেলা হয়েছে বৈধব্যের রীতি মেনে।
বিউটির শোক সংক্রমিত হয়েছে স্বজন আর প্রতিবেশীদের মধ্যেও। সেই শোকে মিশে আছে ক্ষোভ, রোষ, উষ্মা। উৎপলের এমন করুণ, নিষ্ঠুর মৃত্যু কেউ মানতে পারছেন না।
গত ২৫ জুন দুপুরে আশুলিয়ার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে স্কুলমাঠে ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে আহত করে ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই ছাত্র আশরাফুল ইসলাম জিতু। দুদিন পর সাভারের এনাম মেডিকল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান উৎপল।
তার স্ত্রী বিউটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সেদিন সকালে নাস্তা করে বাড়ি থেকে বের হল উৎপল। আমি উপবাস ছিলাম। মন্দিরে গিয়ে পূজা দেবার মানত ছিল। উৎপল বেরিয়ে যাওয়ার পর দাদার বাসায় যাই। সেখানে পূজার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকায় আমার মোবাইল ছিল বন্ধ। উৎপল যে দুপুরে আহত হল, ঘটনাটা আমি শুনলাম সন্ধ্যায়।”
খবর পেয়ে বিউটি ছুটে যান সাভারের এনাম মেডিকেলে। উৎপল তখন অচেতন।
“মৃত্যুর আগে জ্ঞান আর ফেরেনি। তাই আর জিজ্ঞেস করতে পারিনি, ওকে ছাড়া একা একা কেমন করে কাটাব আমি,” বলছিলেন বিউটি।
উচ্চারণগুলো এমনই শোকের যে পূজায় কী মানত ছিল, বিউটির কাছে তা আর জানতে চাওয়া গেল না।
প্রায় সমবয়সী এই দম্পতির কোনো সন্তান নেই। ৩৫ বছর বয়সী বিউটি জানান, সার্টিফিকেট অনুযায়ী উৎপল বরং তার চেয়ে কয়েক মাসের ছোটো। পড়াশোনায় তারা সমসমায়িক।
শিক্ষা সনদ অনুযায়ী উৎপলের জন্ম ১৯৮৭ সালে; বিউটির ১৯৮৬। তবে বিউটি জানালেন, পারিবারিক কুষ্ঠি বিচারে উৎপল তার থেকে বছর দুয়েকের বড়।
একজন শিশুর জন্মের সময় কোন ঘরে কোন গ্রহ অবস্থান করে, সেটি ধরে জীবনের সকল কিছু গণনার জ্যোতিষ বিদ্যা হল কুষ্ঠি বিচার। হিন্দুদের বিয়ের সময় কুষ্ঠি মেলানোর রীতি আছে। সাধারণত বর ও কনের কুষ্ঠির ১৮ থেকে ২৪টি দিক মিলে গেলে বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়।
বিউটির পড়াশোনার শুরু সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে। ইতিহাসে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন ঢাকায় ইডেন কলেজ থেকে। আর উৎপলের বিষয় ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞান। দুজনেরই এসএসসি ২০০২ সালে।
২০১৪ সালে মাস্টার্স শেষ করে দুই বছর পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুবিভাগে অতিরিক্ত সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি পান বিউটি। বর্তমানে আছেন বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) অধিশাখায়।
আর পরিবারের সবার ছোট উৎপল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়েই আট ভাইবোনের বিশাল সংসারের অনেক দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বলে তার ভাইদের সঙ্গে আলাপে জানা গেল।
“মৃত্যুর আগে জ্ঞান আর ফেরেনি। তাই আর জিজ্ঞেস করতে পারিনি, ওকে ছাড়া একা একা কেমন করে কাটাব আমি,” বলছিলেন বিউটি।
নিজে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি একটু একটু করে ভাইদের সবার স্বচ্ছলতা আনার জন্য কাজ করছিলেন তিনি। দুই ভাই অসীম কুমার সরকার ও অসিত কুমার সরকারকে আশুলিয়ায় নিয়ে গিয়ে দর্জির দোকান দিয়ে কাজ শুরু করিয়ে দিয়েছিলেন।
উৎপলদের সবার বড় ভাই অজয় কুমার সরকার ও চতুর্থ ভাই আশুতোষ সরকার ঢাকায় আলাদা দুটি টেক্সটাইল মিলে চাকরি করেন। তাদের দুজনের চাকরিও উৎপলের জোগাড় করে দেওয়া।
ভাইয়ের ছেলে অভিষেক সরকারকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করানোর দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন উৎপল। এত দায়িত্ব সামলে নিজের সংসারটা আর ভালো করে গোছানো হয়ে ওঠেনি।
উৎপল আর বিউটির বিয়ে হয় ২০১৯ সালের ৩০ জুন, দুই পরিবারের পছন্দে। ঘটকের মাধ্যমে বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানালের বিউটি।
তিনি বলেন, “আমাদের বিয়ের পরও উৎপল আশুলিয়ায় থাকত। আমিও চাকরির প্রয়োজনে ঢাকায় দাদার বাসায় ছিলাম। ছুটির দিন ছাড়া ওর দেখা পাওয়া যেত না। মাত্র আট মাস আগে মিরপুরের মধ্য পাইকপাড়ায় বাসা ভাড়া নিয়ে একসাথে থাকা শুরু করেছিলাম।”
করোনাভাইরাসের মহামারীও এই দম্পতির নতুন সংসারে কিছুটা ছন্দপতন ঘটিয়েছিল। স্ত্রীর কাছে উৎপল ছিলেন আস্থার জায়গা। যে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে পরস্পরকে বলতেন। সেইসব সুখস্মৃতি এখন অনেক বেশি কষ্ট জাগাচ্ছে বিউটির বুকে।
“আমি কোনো কিছু করতে চাইলে ও (উৎপল) আমাকে সাপোর্ট করত। ওর মাঝে আমি সব সময় পজেটিভ চিন্তা-ভাবনা দেখতাম। নেগেটিভ কিছু চিন্তায়ও আনতে জানত না মানুষটা। ওকে হারায়ে আমি গভীর চিন্তায় পড়েছি। আগামী দিনগুলোতে কী হবে, কীভাবে চলবে বাকি জীবন? কিছু ভেবে পাচ্ছি না।”
উৎপল কুমার সরকারের গ্রামের বাড়ি উপমহাদেশের বিখ্যাত লাহিড়ীদের নামাঙ্কিত লাহিড়ী মোহনপুর এলাকায়। এই লাহিড়ীদেরই একজন হলেন বিখ্যাত সংগীত শিল্পী বাপ্পী লাহিড়ী।
পরিবারের সবার ছোট উৎপল আট ভাইবোনের বিশাল সংসারের অনেক দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
লাহিড়ী মোহনপুর রেলওয়ে স্টেশন লাগোয়া চলনবিলের ঘাট থেকে আরও অন্তত পাঁচ কিলোমিটার নৌকায় পাড়ি দিয়ে যেতে হয় উৎপলের বাড়ি এলংজানী গ্রামে। চলনবিলের এ অংশটি পড়েছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলায়। ধারণা করা হয়, এই উল্লাপাড়া নাম থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'পোস্টমাস্টার' গল্পে উলাপুর গ্রামের কথা এসেছে।
উল্লাপাড়া থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে রবীন্দ্রস্মৃতিবিজড়িত শাহজাদপুর। আর শাহজাদপুর সদর থেকে আরও ১০ কিলোমিটার দূরে জামিরতা গুদিবাড়ি এলাকায় বিউটি রাণী নন্দীর বাড়ি। সেখান থেকে উৎপলের বাড়ির দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটারের মত।
বিউটি এখন এলংজানী গ্রামে উৎপলের স্বজনদের সঙ্গে অশৌচ পালন করছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বললেন, “উৎপল চেয়েছিল সবাইকে নিয়ে ম্যারেজ ডে করবে। ম্যারেজ ডে আর করা হল না আমাদের। এখন সবাই আসবে উৎপলের আদ্যশ্রাদ্ধ করতে।”
অশৌচ পালন শেষে প্রথম দিন মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানাবার যে আনুষ্ঠানিকতা, তাকেই আদ্যশ্রাদ্ধ বলে। হিন্দু শাস্ত্রের বিধান অনুসারে আদ্যশ্রাদ্ধের অধিকারী হল পরিবারের বড় ছেলে। উৎপলের কোনো সন্তান নেই বলে শ্মশানে তার মুখাগ্নি করেছেন ভাইয়ের ছেলে অভিষেক সরকার; শ্রাদ্ধেও তাকেই অধিকারীর দায়িত্ব নিতে হবে, সেটাই রীতি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে অভিষেক বলেন, “কাকার মুখাগ্নি আমি করেছি। কাকার কাছে আমি সব সময়ই নিজের সন্তানের মত ছিলাম। আমি পরিবারের একমাত্র পুত্র সন্তান। বোনদের কাকে কোথায় ভর্তি করা হবে, বাবা-কাকারা কে কী করবে, সব ঠিক করে দিত ছোট কাকা। নিজে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, আমাকে সেখানেই ভর্তি করে দিয়েছিল।”
কাকার সেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েই গণিত নিয়ে পড়ছেন অভিষেক। উৎপলের পড়াশোনা শেষ হয় ২০১১ সালে। ২০১৩ সালে তিনি চাকরি নেন আশুলিয়ার হাজী ইউনুস আলী স্কুল ও কলেজে। প্রায় দশটি বছর তার সেখানেই কেটেছে।
ওই প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন শিক্ষ উৎপল। শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে শাসন করেছিলেন বখে যাওয়া শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম জিতুকে। সেই দায়িত্ব পালনই তার মৃত্যু ডেকে এনেছে।
বিউটি রাণী নন্দী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জিতু ও ওর বাবা গ্রেপ্তার হইছে। কিন্তু জিতুর পিছনে অন্য কারোর কোনো হাত আছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার। ও তো একা এমন ঘটনা ঘটায়নি।”