logo

উচ্চশিক্ষার জন্য

তানজিম হাসান পাটোয়ারী | Monday, 26 July 2021


বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার একটি আগ্রহ সবসময় থাকে। বিশ্বের নামকরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর কিংবা পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে নিজেকে একজন প্রথম সারির গবেষক হিসেবে দেখার স্বপ্ন থাকে তাদের মাঝে। কিন্তু বিদেশে যাওয়া তো আর বললেই হয়ে যায় না, এর জন্য একইসাথে লাগে যোগ্যতা, কঠোর পরিশ্রম এবং ধৈর্য।

প্রথমেই বিষয় নির্বাচন

উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গমনে প্রথমেই যে বিষয়টি ঠিক করতে হবে, সেটি হলো, আপনি কোন বিষয়ের উপর পড়তে চান। যদি স্নাতক পর্যায়ে আবেদন করতে চান, সেক্ষেত্রে বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনার যে বিষয়ে গবেষণা অথবা ক্যারিয়ার তৈরি করার ইচ্ছা রয়েছে, সেই বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিবেন। আর স্নাতকোত্তর অথবা পিএইচডির জন্য আবেদনের ক্ষেত্রে স্নাতক পর্যায়ে পড়ার সময় যে বিষয়ের উপর আগ্রহ খুঁজে পেয়েছেন, সেটি নির্বাচন করতে পারেন। তাছাড়া বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী এর চাহিদা, কর্মক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি বিষয়গুলোকেও বিবেচনায় রাখতে পারেন।

চাই ইংরেজিতে দক্ষতা

উচ্চশিক্ষায় বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ দেয়া। এক্ষেত্রে আইএলটিএস বিশ্বব্যাপী বেশ স্বীকৃত। আইএলটিএস-এ ভালো স্কোর আপনাকে ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বেশ সাহায্য করবে। তবে কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আইইএলটিএস এর পরিবর্তে জি আর ই/ জিম্যাট/ সেট/ টোফেল-এ ভালো নম্বর তুলতে হয়। এক্ষেত্রে একটি বিষয় জেনে রাখা ভালো, আপনি যে টেস্টই দেন না কেন, এর প্রস্তুতি আপনাকে এর আরো অনেক আগে থেকেই শুরু করে দেয়া উচিত। সাধারণত স্নাতক প্রথম বর্ষ থেকে যদি প্রস্তুতি শুরু করতে পারলে সময় নিয়ে বেশ গুছিয়ে সব শেষ করতে পারবেন।

কোথায় যাবেন?

এরপরই আপনাকে যে বিষয়টি ঠিক করতে হবে, সেটি হচ্ছে- কোন দেশে পড়তে যাবেন। বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপ এবং আমেরিকা বেশ প্রসিদ্ধ। এছাড়া এশিয়ার মধ্যে চীন, মালয়েশিয়া, এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও এখন অনেক শিক্ষার্থীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। দেশ ঠিক করার পরই ঠিক করতে হবে, সে দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি পড়বেন। এক্ষত্রে বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান, শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণার পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রাখতে পারেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান সম্পর্কে জানার জন্য স্পেনভিত্তিক সিমাগো স্কপাস র‍্যাংকিং, যুক্তরাজ্যভিত্তিক কিউএস র‍্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান কততম স্থানে রয়েছে, সেটি দেখতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করে সেটির জন্য আবেদন না করে যদি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্বাচন করেন, সেক্ষেত্রে আপনার চান্স পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।

 

একজন শিক্ষার্থী কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করবেন, সেগুলো ঠিক করার পর ঐ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তির আবেদনের সময় সম্পর্কে জেনে নিতে হবে। কারন একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন একেক সময় শুরু হয়। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যায়।

আর্থিক প্রস্তুতি নিন

এসব বিষয়ের পাশাপাশি আপনাকে খরচের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। যে দেশে পড়তে যাবেন, সে দেশের জীবনযাত্রার মান কেমন, ভরণ-পোষণ কতটা ব্যয়বহুল- এসব বিষয়ে একটি ছক কষে নিতে হবে ভর্তির আগেই। আর আপনি যদি স্কলারশিপ পান, তাহলে ঐ স্কলারশিপের টাকা আপনার কোন কোন খরচগুলো মেটাবে, বা ঐ স্কলারশিপের টাকা দিয়ে আপনার পক্ষে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব কি না- এগুলোও জেনে নিতে পারেন।

আর যে স্কলারশিপ পেয়ে আপনি সে দেশে যাচ্ছেন, তার মেয়াদ কতদিন , সেটি নবায়ন করা যাবে কি না, বা গেলেও কী কী যোগ্যতার উপর ভিত্তি করে সেটি নবায়ন করা যাবে- সেগুলো জেনে নিতে হবে। চাইলে উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে মেইল পাঠিয়ে আপনার প্রশ্নগুলো করতে পারেন। ফিরতি মেইলের সাহায্যে তারা আপনাকে উত্তর পাঠিয়ে দেবেন।

সাধারণত মাস্টার্স বা পিএইচডির ক্ষেত্রে ভালো সিজিপিএ, গবেষণাপত্র, এবং আইইএলটিএস/ জিআরই/ জিম্যাট/ সেট/ টোফেল-এ ভালো স্কোর করলে স্কলারশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। বর্তমানে কিছু কিছু দেশে পড়ালেখার পাশাপাশি খণ্ডকালীন চাকরি করার সুযোগ থাকে। সেটি পেলে ঐ দেশে আপনার জীবনযাপন করা আরেকটু সহজ হবে।

এরপর আসি আর্থিক সামর্থ্যের বিষয়টিতে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে গেলে আবেদনকারীকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আবেদনকারীর অভিভাবকের অ্যাকাউন্টে আছে, এমন তথ্য নিশ্চিত করতে হয়। সাধারণত ভিসা আবেদনের সময় এটি করতে হয়। এর অর্থ হলো, বিদেশ গমনের পর কোনো শিক্ষার্থী যদি আর্থিক সংকটে পড়েন, তখন উক্ত টাকা ঐ ব্যাংক একাউন্ট থেকে শিক্ষার্থী খরচ করবে। আমাদের দেশে সাধারণত মাতা-পিতার ব্যাংক অ্যাকাউন্টকে এক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া হয়।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

ভিসা আবেদনের সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে হবে। সেখানে আপনার যাবতীয় সব একাডেমিক সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদ, পাসপোর্ট, স্টেটমেন্ট অব পারপাস (বিদেশে পড়তে যাওয়ার কারণ) ইত্যাদি জিনিসগুলো দেখাতে হবে। সব ঠিক থাকলে আপনি বিদেশে গিয়ে আপনার স্বপ্নের বিশ্ববিদালয়ে পড়ার সুযোগ পাবেন।

এ বিষয়ে কথা হয় মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি পুত্রা থেকে ২০২০ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞান (সফটওয়্যার প্রকৌশল) এর উপর স্নাতক শেষ করা আকিফ ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, “একজন শিক্ষার্থী বিদেশে স্কলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে তার একাডেমিক ফলাফল এবং গবেষণাপত্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি জিআরই অথবা জিম্যাট-এ একটি ভালো স্কোর বিষয়টিকে আরো সহজ করে দেয়। তাই বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে আগ্রহী হলে অবশ্যই একজন শিক্ষার্থীকে তার স্নাতক পর্যায় থেকেই সিজিপিএ বাড়ানো ছাড়াও এসব বিষয়গুলোর উপর প্রস্তুতি শুরু করতে হবে।”

স্কলারশিপের সুযোগ

প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন স্কলারশিপ দিয়ে থাকে। কিছু স্কলারশিপ রয়েছে, যেগুলো পেলে একজন শিক্ষার্থীকে বিদেশ গিয়ে একটি পয়সাও নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয় না। এরকমই কিছু স্কলারশিপ হলো কমনওয়েলথ স্কলারশিপ, ক্যামব্রিজ গেটস স্কলারশিপ, কাতারের হাম্মাদ বিন খলিফা ইউনিভার্সিটি স্কলারশিপ, আইডিবি স্কলারশিপ, আজারবাইজান সরকারি স্কলারশিপ, সাস্কাচুয়ান স্কলারশিপ ইত্যাদি। এসব স্কলারশিপের আওতায় একজন শিক্ষার্থী টিউশন ফি, মেডিকেল ফি, ভিসা ফি, এবং মাসিক হাতখরচের অর্থ পেয়ে থাকেন।

বাংলাদেশে স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের গবেষণার সুযোগ কতটুকু, এ বিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র তাকবীর হোসাইনের সঙ্গে, যিনি বর্তমানে শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী করতে ‘চিটাগাং ইউনিভার্সিটি রিসার্চ অ্যান্ড হায়ার স্টাডিজ সোসাইটি’ নামক একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, “গত দুই বছর যাবত আমি ‘দি রেড গ্রিন রিসার্চ সেন্টার’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। আমি মনে করি, রসায়ন এবং জীববিজ্ঞানের ছাত্রদের গবেষণার জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে। কারণ এখানে কাজ করার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী অনেককিছু হাতে-কলমে শিখতে পারেন।”

 

তানজিম হাসান পাটোয়ারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

tanjimhasan001@gmail.com