logo

ইউক্রেন নিয়ে জুয়া : কোথায় চলেছে রাশিয়া এবং পশ্চিম

রড্রিক ব্রেথওয়েট | Monday, 7 February 2022


পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো শতকের পর শতক জুড়ে অবিরত বৃহৎ প্রতিবেশির হেনেস্তার অসহায় শিকার হয়েছে। রাশিয়া দীর্ঘদিন হেনস্তা করা থেকে বিরত থাকবে, ঠেকে শেখা দেশগুলোর এমন কোনো বিশ্বাসই নেই। তাদের কাছে বেদনাদায়ক সত্যটি হলো, একমাত্র ন্যাটোর সদস্য পদই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।

পশ্চিমের অনেকেই অতীত বিভীষণী তৎপরতায় ক্ষুব্ধ- মিউনিক, ইয়াল্টা, হাঙ্গেরি, প্রাগ- তারাই রয়েছে এ দলে। যতদ্রুত সম্ভব ন্যাটো জোটে যোগদানের  তৎপরতাকে সমর্থন করে তারাই। একই ভাবে সমর্থন জানায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বসবাসকারী পোলিশ এবং (লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়ার) ব্যাল্টভাষীদের বংশধরসহ অন্যান্যরা। মার্কিন নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতেই বসতি গড়েছে তারা। 

তবে ন্যাটোয় যোগ দেওয়ার এ তৎপরতাকে ভিন্ন চোখে দেখে রুশরা। অতীতে পরমাণু-সংঘাতের আশঙ্কা দূর হওয়ার তৎপরতাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিল তারা। অনেকে রুশ নাগরিক ভেবেছিল, তারা “স্বাভাবিক একটি দেশ” পাবে। সেখানে সরকার তাদের কামনা-বাসনার প্রতি নজর দেবে কিন্তু এর বাইরে তাদের জীবন-যাত্রায় আর নাক গলাবে না । আরো ভেবেছে, তাদের উদ্দীপনা-আশা-ভরসার প্রতি অকাতর সক্রিয় সমর্থন দেবে পশ্চিম।

পরবর্তীতে তারা বুঝতে পারে যে তাদের ইচ্ছা করেই পথ-ভ্রান্ত করা হয়েছে। তাদের স্বদেশ ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র করেছে আমেরিকা। কেবল রুশরাই নয়, পশ্চিমের অনেকের মধ্যেই একই চিন্তার বিকাশ ঘটেছে। নিজ নিজ বইয়ে এ বিষয়ে নানা আলামত নিয়ে এসেছেন ভ্লাদিস্লাভ জুবোক এবং অধ্যাপক মেরি সারোত্তে।

কেবল সদস্যদেশগুলোর প্রতিরক্ষা স্বার্থে সামরিক জোটটি গড়া হয়েছে বলে দাবি করে ন্যাটো। কিন্তু আমেরিকা এবং তার মিত্র দেশগুলো প্রথমে সার্বিয়া, তারপর আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলার পর সে দাবিকে অবিশ্বাস্য হিসেবে গণ্য করে রাশিয়া। সোভিয়েত শাসনের সময় ভুগেছেন এবং এ শাসনাবসানে আনন্দিত হয়েছে এমন অনেক উদারপন্থী রুশ বন্ধুসহ অনেকেই ভয় করতে থাকেন যে এরপরই ন্যাটো জোটের শিকার হবে খোদ রাশিয়া। তখনও পশ্চিমি ভাষ্যকাররা দাবি করতে থাকে রাশিয়া যে সময়ে ভেঙ্গে পড়ছে সে সময় দৈনিক টিকে থাকার লড়াইয়ের মতো আরো অনেক কিছু নিয়ে তাদের উদ্বিগ্ন হওয়া বা মাথা ঘামানো উচিত। তারা পরিস্থিতিকে অতি সরলীকরণ করেছে। রুশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তখন ন্যাটো নিয়ে যে চাপা উদ্বেগ বিরাজ করছিল তা ছিল যথার্থ। পুতিন যখন ক্ষমতায় এলেন তখন একে উসকে দেওয়ার কোনো দরকারই ছিল না। বরং এ উদ্বেগকে নিজ লক্ষ্য পূরণে নিশ্চিত ভাবেই ব্যবহার করেন তিনি।

দুই পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে আটকে না পড়ে পাশ কাটিয়ে চলার ক্ষমতা বা সুযোগ কখনোই ইউক্রেনের ছিল না। সারোত্তে তাঁর ‘নট ওয়ান ইঞ্চ বইয়ে বলেন, পশ্চিমা নীতিনির্ধারকরা ভালো করেই জানেন যে, ইউক্রেনকে ন্যাটোভুক্ত করা হলে তাতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট আর রাশিয়ার মধ্যে দূরত্ব কমে যাবে। পাশাপাশি, রুশ যে সব লাল রেখা আছে তার মধ্যে সর্বাধিক লাল রেখাটি ডিঙ্গানো  হবে। এ সত্য জানা সত্ত্বেও কট্টরপন্থী মার্কিনিরা বারবার ইউক্রেনকে সদস্যপদ দেওয়া সংক্রান্ত কথাবার্তাকে সফল ভাবে ন্যাটোর ইশতেহারে যোগ করতে পেরেছে। যদিও ইউক্রেন অদূর ভবিষ্যতে ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে বলে মোটেও বিশ্বাস করে না তারা।

এসব ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করে সারোত্তে দৃঢ় ভাবে মনে করেন,  ঘটনাগুলোর অন্য পরিসমাপ্তি ঘটতে পারত। সম্ভবত শান্তির জন্য অংশীদারিত্বের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় নিরাপত্তার একটি টেকসই পথ সৃষ্টি হতো। এ নয়াপথ রাশিয়াকেও সন্তুষ্ট করতে পারত। অন্যদিকে জুবোকের ধারণা, গর্বাচেভের চেয়ে আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কোনো নেতা যদি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং (সোভিয়েত) সাম্রাজ্যের  সমস্যাগুলো দক্ষহাতে সামাল দিতে পারতেন তা হলে টিকে যেত সোভিয়েত ইউনিয়ন। তাঁর কলাপস’ বইতে এমনটিই দেখিয়েছেন তিনি। 

কিন্তু রুশরা যেমন বলে, ইতিহাসের কোনো শর্তসূচক বিষয় নেই। আমরা যেখানে আছি সেখানেই আছি। ইতিহাসের লব-কুশি বা  খেলোয়াড়রা হয়তোবা ভিন্ন ভিন্ন পছন্দ করতে পারত। কিন্তু  তাদেরও ছিল সীমাবদ্ধতা। নিজস্ব চরিত্র বিকাশ, নিরেট তথ্য, উচ্চ আবেগ, বিরোধপূর্ণ স্বার্থ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অদম্য চাপ মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে সীমাবদ্ধতার দেয়াল। শেষ পর্যন্ত দ্বন্দ্বগুলি মৌলিক ছিল তা মানতে হবে। কিন্তু বিকল্প ফল লাভের প্রত্যাশা মোটেও বাস্তবানুগ ছিল না।

ইউক্রেন নিয়ে পুতিনের জুয়া খেলাকে এখন মোকাবেলা করবে পশ্চিম। সোভিয়েত পরমাণু সক্ষমতা মার্কিন সক্ষমতা অনুরূপ এই সমতা স্বীকারে বাধ্য করতে ১৯৬২ সালে কিউবায় একটি বেপরোয়া প্রচেষ্টায় নামেন নিকিতা ক্রূশ্চেভ। এ প্রচেষ্টার ফলে বিশ্বকে বিপর্যয়ের কাছাকাছি ঠেলে দেন তিনি। মার্কিন শক্তির মুখে অপমানজনক পশ্চাদপসরণে বাধ্য হন ক্রূশ্চেভ। ইউক্রেন থেকে ন্যাটোর পিছিয়ে আসার লিখিত নিশ্চয়তা এখন দাবি করছে পুতিন।  মার্কিন সিনেটে সে রকম কোনো দাবি কখনোই অনুমোদন করবে না সে কথা অনুধাবন করতে হবে পুতিনকে। অন্যদিকে মস্কোর বিবেকবান অনেক ভাষ্যকারও স্বীকার করেন, ইউক্রেনে একটি সামরিক অভিযান রাশিয়ার নিজ স্বার্থকে মারাত্মক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেবে।

মস্কোর রেড স্কয়ারে এক সামরিক কুচকাওয়াজে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

এদিকে, যে দেশের জন্য কোনো দায় নেই তার জন্য লড়াইয়ের ঝুঁকি নেওয়া মোটেও পশ্চিমের উচিত হবে না। পূর্ব ইউরোপের আরেকটি দেশ ছেড়ে দিলে তাতে মার্কিনি বা পশ্চিমিদের নিজ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো ব্যাপক ক্ষতিতে পড়তে পারে বলে যে যুক্তি দেওয়া হবে তাও তারা সরাসরি খারিজ করে দেয় এ দলের মানুষগুলো।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা একান্ত প্রয়োজন। আমেরিকা কিউবার সার্বভৌমত্বকে সম্মান করবে বলে মৌখিক আশ্বাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে সেখান থেকে সরে আসেন ক্রূশ্চেভ।  আমেরিকা এখনও পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশ, যদিও এ সময়ে ভৌগলিক অবস্থান রয়েছে দেশটির বিরুদ্ধে। এটা মনে করা যেতে পারে কিউবার জন্য ক্রূশ্চেভের যেমন আশ্বাসবাণী জুটেছিল ইউক্রেনের জন্যও তেমন শক্তিশালী এক আশ্বাসবার্তা দিতে পারে বদ্ধপরিকর আমেরিকা।  সহিংসতার বদলে কূটনীতির মাধ্যমে নিজ অর্জন নিশ্চিত করতে পারে আমেরিকা।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]

আরো পড়ুন: ইতিহাসের চোখে ইউক্রেন : সংঘাতের পথ সৃষ্টির উপাখ্যান