ইংকটোবার: আঁকিয়েদের রঙের উৎসব
অনিন্দিতা চৌধুরী | Wednesday, 27 October 2021
একটি মাস, অন্য যেকোনো মাসের মতোই সাধারণ তার আসা-যাওয়া। তবু বিশ্বজুড়ে আঁকিয়েদের এ মাস শুরুর আগেই শুরু হয়ে যায় রং-তুলি-ক্যানভাস কিংবা খাতা-কলম-পেন্সিল নিয়ে তোড়জোড় প্রস্তুতি।
মাসটির নাম অক্টোবর, আর আঁকিয়ে সমাজে এত উত্তেজনার কারণ হচ্ছে এই মাস জুড়ে চলা ‘ইংকটোবার’ একটি অনলাইন ছবি আঁকার চ্যালেঞ্জ।
এক নজরে
নাম থেকে সহজেই বুঝে নেয়া যাচ্ছে, ইংরেজি ‘ইংক’ (কালি) এবং অক্টোবর মাসের নাম একত্রে জুড়ে দিয়ে জন্ম হয়েছে এ নাম।
এর তিনটিমাত্র ‘থাম্ব রুল’ আছে-- কালি দিয়ে ছবি আঁকা, তা অনলাইনে পোস্ট করা এবং নির্ধারিত হ্যাশট্যাগ ‘#INKTOBER’ দেয়া।
এমনিতে ইংকটোবার দুই ধরনের। প্রথমটি, অর্থাৎ, ‘ক্লাসিক ইংকটোবার’ই বেশি জনপ্রিয়। তবে আরেকটি ধরনও আছে যার নাম ‘ইংকটোবার ৫২।’
তাসের প্যাকেটে যেমন ৫২টি তাস থাকে, তেমনি বছরে থাকে ৫২টি সপ্তাহ। সেই প্রতিটি সপ্তাহে একটি প্রম্পট ধরে মোট ৫২টি ছবি আঁকার ধরনটি হচ্ছে এই দ্বিতীয় ইংকটোবার।
যারা এক মাসে দুদ্দাড় সব ছবি না এঁকে, রয়েসয়ে বছর জুড়ে রঙতুলির খেলায় মেতে থাকতে চান, তাদের জন্য এই চ্যালেঞ্জ।
অধিক প্রচলিত ইংকটোবারের কথায় আসা যাক। ৩১ দিনে ৩১টি ছবির এই চ্যালেঞ্জের নামের বেলায় শুধু কালির কথা আছে মানে এই নয় যে ইংকটোবার মানেই সাদা-কালো।
ইচ্ছেমতো রঙ ছড়ানোর সুযোগ আছে এই চ্যালেঞ্জে। জলরং, পেন্সিল কিছুতেই নেই মানা। আঁকাআঁকির চর্চাটাকে জিইয়ে রাখাই ইংকটোবারের মূল চেতনা। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার না করেও কোনো আঁকিয়ে এই চ্যালেঞ্জে অংশ নিতে পারবেন।
আঁকাআঁকির ইতিবাচক চর্চাকে উদ্দেশ্য করে ২০০৯ সালে জেক পার্কার নামের এক ভদ্রলোক এই চ্যালেঞ্জ শুরু করেন। এই চ্যালেঞ্জটিকে তাই ‘মিলেনিয়াল’ বললে ভুল হবে না।
শিল্পকে যথাসাধ্য মুক্তভাবে চর্চা করতে এর চেষ্টার কমতি নেই। এ নিয়ে সবার সুবিধার জন্য এর উদ্যোক্তা জেক পার্কার একটি হ্যান্ডবুকও লিখে ফেলেছেন- ‘ইংকটোবার অল ইয়ার লং: ইওর ইনডিসপেন্সেবল গাইড টু ড্রয়িং উইথ ইংক পেপারব্যাক’ নামে।
যেমন ইচ্ছা তেমন
নামে ‘চ্যালেঞ্জ’ হলেও এটি বেশ খোলামেলা এক আহ্বান, যা কেবল দক্ষদের জন্যই নয়, নতুনদের জন্যও বেশ ভালো সুযোগ হয়ে দেখা দেয়।
আর চ্যালেঞ্জের জুড়ে দেয়া প্রম্পটের তালিকা তাদের সাহায্য করে যারা অনেকদিন ধরে ঠিক কী নিয়ে আঁকবেন তা বুঝতে পারছেন না। মাসব্যাপী চর্চা করে গেলে একটা অভ্যাসও গড়ে ওঠে যাতে পরবর্তী দিনগুলোতে নিজের আঁকিয়ে সত্ত্বাকে জাগিয়ে রাখা অপেক্ষাকৃত সহজ হয়।
“ইংকটোবারের কোনো অফিশিয়াল স্থান বা সম্মেলন নেই। আপনি যেখানে বাস করেন এবং আঁকেন, সেখানেই ইংকটোবার।”-- এমন কসমোপলিটান আহ্বানে আঁকিয়েরা যে বিশ্বগ্রামের (গ্লোবাল ভিলেজ) দিনগুলোতে দেশের সীমানার পরোয়া না করে ছবি এঁকে যাচ্ছেন, তা নিঃসন্দেহে শিল্পজগতের এক ইতিবাচক দিক।
আঁকিয়ের কথা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতোকোত্তর শিক্ষার্থী এবং আঁকিয়ে তিয়াসা ইদরাক ইংকটোবার নিয়ে বলেন, “ইংকটোবারের সবচেয়ে বড় ব্যাপারটা হচ্ছে চর্চা। প্রতি বছর ঘুরেফিরে এই চ্যালেঞ্জ আসলে নতুনভাবে আঁকার অনুপ্রেরণা পাই। আসলে মাসব্যাপী আঁকার একটা অভ্যাস গড়ে উঠলে মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবেই উৎসাহ পায় এবং আঁকিয়েরা একে অন্যকে দেখেও অনুপ্রাণিত হয়।”
তিয়াসার আরেকটি ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে এই যে ইংকটবারের প্রম্পটগুলো নিয়ে একেকজন একেকভাবে কাজ করে।
“এই চ্যালেঞ্জের মূল প্রম্পটগুলো ইংকটোবারের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট- ইংকটোবার ডট কমে দেয়া হয়ে থাকে। তবে অনেকেই নিজের মতো করে প্রম্পট সাজিয়ে নেন পুরো অক্টোবর মাসজুড়ে।”
তিয়াসার কথার জের ধরে ঘুরে আসা হলো সেই ওয়েবসাইটটি, যা থেকে ইংকটোবারের সকল নির্দেশনা-নিয়ম-নীতি ইত্যাদির ঘোষণা দেয়া হয়। প্রম্পটের একটি তালিকা তারা দেন ঠিকই, তবে সে তালিকা নিয়ে বাঁধাধরা নেই কোনো।
এমনকি ধারাবাহিকতা মেনে প্রতিদিনের প্রম্পট নিয়ে আঁকতেও হবে না, আঁকিয়ে চাইলে নিজের গল্প বলার সুবিধের জন্য উল্টেপাল্টে নিতে পারেন সেগুলো এবং অনেকেই ইতোমধ্যে এমনটা করেছেন।
এসব চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে নিজস্ব গল্প যেমন উঠে এসেছে, তেমনি বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির সাথে এর একটা মিশ্রণও ঘটেছে।
চর্চায় আসে সাফল্য
ইংকটোবার কিংবা অন্য যেকোনো চ্যালেঞ্জের অন্যতম প্রধান বিষয় হচ্ছে এতে অংশগ্রহণকারীদের লেগে থাকার চেষ্টা, একটানা চর্চা। জেক পার্কারও তাই বিশ্বাস করেন।
“বারবার কিছু করার মাধ্যমেই আমরা কোনো একটি বিষয় সম্পর্কে শিখতে পারি। পাঁচ সপ্তাহ ধরে একটা গভীর, জটিল ছবি আঁকা শেষ করে ওটাকে ভালো বলার মাধ্যমে কেউ ছবি আঁকায় ভালো হয় না। এরচে বরং পাঁচ সপ্তাহে ৫০০টি ছবি এঁকে একটু করে ভুল করলে সেই ভুল থেকে আপনি বেশি শিখবেন।”
অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী।
anindetamonti3@gmail.com