logo

আলোকচিত্রের কাব্যে নিশি আকাশের কথকতা

সৈয়দ মূসা রেজা | Monday, 27 December 2021


বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ- দৃষ্টিপাতে যাযাবরের (বিনয় মুখোপাধ্যায়ের) এ উক্তি বাংলা ভাষায় প্রায় প্রবাদের আসন করে নিয়েছে। একই সুরে যদি বলা হয়, বিজ্ঞান দিয়েছে আলো, কেড়ে নিচ্ছে রাতের আকাশ, তাহলেও পড়তে হবে না অসত্য কথন এবং অতথ্য প্রচারের অভিযোগে।

ইদানীংকালে রাতের আকাশের ছবি তোলা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে সত্য এই যে বায়ু এবং আলোক দূষণের ছোবলে নিশি আকাশ সংকুচিত হওয়ার হারও বাড়ছে পাল্লা দিয়েই। এখানেই আমাদেরকে নিতে হয়দ্যা ওয়ার্ল্ড অ্যাট নাইট (সংক্ষেপে, TWAN ) কর্মসূচি’ এবং বাবাক তাফরেশির নাম।   

ইরানে জন্মগ্রহণকারী বোস্টনে বসবাসকারী তাফরেশিকেনিশি আকাশের যুবরাজ’ এর অভিধায় ভূষিত করা যায়। রাতের আকাশের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং দূষণের ভয়াবহতা থেকে একে রক্ষার আন্দোলনের অগ্রদূত তিনি। রাতের আকাশ রক্ষার গুরুত্ব পৃথিবীর কাছে নিরলস তুলে ধরছেন তিনি।   

দ্যা ওয়ার্ল্ড অ্যাট নাইট। ছবিঃ লেখক

সম্প্রতি প্রকাশিত তার বইদ্যা ওয়ার্ল্ড অ্যাট নাইট’এ রয়েছে চোখ ধাঁধানো, মনকাড়া দুইশর বেশি আলোকচিত্র। ২৫ দেশব্যাপী ৪০ আলোকচিত্রীর পরিকল্পিত অক্লান্ত কাজের ফসলই হলো এ বই। বইতে রাতের আকাশের অনবদ্য দৃশ্যাবলীকে দু’মলাটের মাঝে উপস্থাপন করা হয়েছে। বইটি সম্পর্কে এমনটা বলা হলে কম কথাই বলা হবে। ২০ দেশের ৩৪ আলোকচিত্রীকে একত্রিত করেছেন তাফরেশি। তাদের ক্যামেরার চোখে ধরা দিয়েছে, সুদূরের ছায়াপথ, গ্রহ এবং জীবনে একবারই ঘটে এমন সব মহাজাগতিক ঘটনারাজি। সুবিশাল এ তৎপরতায় কতোটা শ্রম দিতে হয়েছেতা ভাবা দুষ্কর। তার চেয়েও বড় কথা কেবল হৃদয়গ্রাহী নিশি আকাশের সৌন্দর্যে মগ্ন করার নিছক উদ্দেশ্যেই ছিল না বরং বইটি প্রকাশিত হয়েছে আরো বড় এবং মহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে। সেই লক্ষ্যে যাত্রার উপলক্ষ, বাহন, হয়ে উঠেছে বইটি।

জ্যোতির্আলোকচিত্র বিষয়ক কর্মশিবিরে বাবাক তাফরেশি। ছবিঃ লেখক

বইটির মুখবন্ধ লিখেছেন ব্রিটিশ-অস্ট্রেলীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং আলোকচিত্রী ডেভিড মালিন। ব্রিটিশ কাউন্সিলের আমন্ত্রণে ২০০৪’এ ঢাকা এসেছিলেন তিনি। সে সময় বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এবং ব্রিটিশ কাউন্সিল যৌথ ভাবে তাকে নিয়ে অনুষ্ঠান করে। অ্যাসোসিয়েশনের দফতরে যেয়ে তিনি এ সংগঠনের সদস্য হয়েছিলেন। এ সব তথ্য ফিন্সানসিয়াল এক্সপ্রেসকে দিলেন অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মশহুরুল আমীন।মহাকাশ মিলন’ নামেই বেশি পরিচিত তিনি।

বইয়ের মূল বার্তা হলো, রাতের অন্ধকারের আসমান হারিয়ে যাচ্ছে। তাকে রক্ষায় সচেতন হতে হবে, হতে হবে শিক্ষিত। একই উদ্দেশ্যে বিশ্বের মানুষকে একটি মাত্র আকাশের নিচে সমবেত করার মহান ব্রতের দৃষ্টিগ্রাহ্য ফলই হলো এ বইটি।   

রাতের আকাশের অন্তহীন সৌন্দর্য পৃথিবীর সব ধর্ম এবং সব দেশের প্রতীক হয়ে ফুটে উঠেছে এতে।

ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানসমূহ রাতের আকাশের নিচে অদেখা আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর অন্ধকারতম অঞ্চলের নিশি আকাশের আলো আমাদেরকে অবাক করে দেবে; ছায়াপথ, গ্রহ এবং নক্ষত্রমালার অপার সৌন্দর্য আবিষ্কৃত হবে। পাশাপাশি মহাজাগতিক ঘটনাবলী প্রস্ফুটিত হবে।

রাত বিশ্বকে ঢেকে দেয় কিন্তু মহাবিশ্বকে করে উন্মোচিত। রাতে দ্যুতিমান মহাজাগতিক নক্ষত্রপুঞ্জ, আকাশের গতিশীলতা, বায়ুমণ্ডলীয় নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, তৎপরতায় ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী, অরোরার অবাক করা আলো এবং অন্যান্য বিস্ময়কর দৃশ্যাবলীতে সজ্জিত হয়ে অন্ধকার আকাশের পটভূমিতে অবগুণ্ঠন উন্মোচন করে মহাবিশ্ব।

আলোক এবং বায়ু দূষণের বিষে জর্জরিত নগর জীবন আকাশের ক্ষেত্রে রাত কানা হয়ে আছে। রাতের প্রকৃতিতে দৃষ্টিশক্তিহীন জীবনের এ সংক্রমণ থেকে বহুদূরে অবস্থিত অঞ্চলগুলো অন্ধকার আসমানের সৌন্দর্য-স্পর্শে পুলকিত বোধ করার পুস্তক এটি।

মহাজাগতিক ঘটনাবলী, রয়েছে দর্শনীয় এবং অস্থায়ী ধূমকেতু থেকে শুরু করে চন্দ্র এবং সূর্য গ্রহণের দারুণ পর্ব, জ্যোতির্পর্যটনের গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত স্থান, প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যার স্মৃতিসমৃদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ এবং আধুনিক মানমন্দিরসমূহএ সব কিছুই সংযুক্ত হয়েছে আলোকচিত্রের অভূতপূর্ব এ বইতে।সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল; পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল” যে রাত নামে তাকেই তুলে ধরেছে এ বই।

‘দ্যা ওয়ার্ল্ড অ্যাট নাইট’ বইয়ের পর্যালোচনা করতে যেয়ে এফস্টপারস ডটকমের স্টাফ রাইটার মাইকেল ডিস্টেফানো বলেন, “তাফরেশির আলোচনা কয়েকবার শুনেছি তাই নিজেকে আমি যথেষ্ট ভাগ্যবান বলেই মনে করি।”(একই কথা আমারও। তেহরানে তার আলোচনা কয়েকবার শোনার সৌভাগ্য হয়েছে। রসিকতা, পরিহাস এবং ঠাট্টার মিশেল দেওয়া সূক্ষ্ম রসবোধ ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের মিশ্রণে  কথক হিসেবে তুলনাহীনই হয়ে উঠেছেন । শ্রোতাদের টেনে ধরে রাখার মোহন ক্ষমতা আছে তার। ) তিনি আরো বলেন, “আমি বোস্টনের যেখানে থাকি তার থেকে কয়েক মাইল দূরে থাকেন তাফরেশি।  তাফরেশির বক্তৃতায় জ্যোতির্আলোকচিত্র বা অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফির প্রতি তার আবেগকে অনুধাবন করতে  পারবেন। সাধারণভাবে শুনতে পাবেন অন্ধকার আকাশ সংরক্ষণের গুরুত্ব। পুরস্কারজয়ী আলোকচিত্রী তাফরেশি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের সাথে নিয়মিত কাজ করছেন। এছাড়া জ্যোতির্আলোকচিত্রের প্রায় প্রতিটি প্রধান উৎসে নিজ কর্মগুণে অবদান রেখেছেন। তাফরেশি একাধারে আলোকচিত্রী, বিজ্ঞান সাংবাদিক ও সংরক্ষণবাদী। এ তিন ক্ষেত্রে নিজ মূল্যবান অভিজ্ঞতার আলোকে ২০০৭ সালেদ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাট নাইট (TWAN)’ কর্মসূচির গোড়াপত্তন করেন তিনি। ২৫ দেশের প্রায় ৪০ আলোকচিত্রীর এক অভিজাত দল গড়ে তুলেছেন তিনি। এ দলগত আলোকচিত্রের মাধ্যমে নিশি আকাশ এবং নিশি নিসর্গের শোভা প্রতিনিয়ত উপস্থাপন করছে।” তুখোড় বক্তা এবং প্রাণবন্ত প্রশিক্ষকের পঙক্তিতেও ফেলতে হবে তাফরেশিকে।

স্পেস ডটকমকে এ বই প্রকাশ সম্পর্কে তাফরেশি বলেন, “এটা খুবই সময়োপযোগী প্রকাশনা। কৃত্রিম আলোকচ্ছটার অনুপ্রবেশের ধাক্কায় আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ প্রাকৃতিক রাতকে হারিয়েছে। আলোকদূষণহীন রাতের আকাশ দেখার আগ্রহ বিশ্বে বাড়ছে। সাদা-নীল এলইডির ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে দূষণ নতুন করে আরো বিরক্তিকর পর্যায়ে চলে গেছে। এ  সময়ে আলোক দূষণ নিয়ে সাধারণ জনগণকে অবহিত করা খুবই সময়োপযোগী কাজ হবে। আলোক দূষণের কারণে  আমরা যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি বইতে সে বিষয়ে পুরো একটি অধ্যায় উৎসর্গ করেছি। এটি একটি সচিত্র বই ... তবে কেবল কফি-টেবিলের পাশে সাজিয়ে রাখার জন্য সুন্দর ছবির বই নয়। বইয়ের প্রবন্ধ এবং ছবিতে যে কাহিনি বলা হয়েছে তাতে জ্যোতির্বিদ্যা, তারকা পর্যবেক্ষণ (স্টারগেজিং) আলোকচিত্র এবং প্রকৃতি সংরক্ষণ সম্পর্কে অনেক শেখার আছে।”

বইতে কোনো ডিজিটাল চালিয়াতি নেই। তাফরেশি স্পেস ডটকমকে বলেন, এই বইয়ের আলোকচিত্রগুলো মৌলিক এবং নির্ভরযোগ্য সে বিষয়ে আস্থা রাখতে পারেন যে কোনো পাঠক। তথ্যচিত্রের নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে এ কথা উল্লেখ করে আরো জানান, একটিমাত্র এক্সপোজারের মাধ্যমে অনেক ছবি তোলা হয়েছে। প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণেই অনেকগুলো ছবি জোড়া দিয়ে প্যানোরোমা ছবি তৈরি করা হয়েছে। এভাবে যে সব ছবি তোলা হয়েছে সেখানে তার ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।

তারপরও বইটি মগ্ন হয়ে দেখার পর বাংলাদেশি পাঠকের মনে অতৃপ্ত তৃষ্ণা রয়ে যাবে। বইতে ঠাঁই পায়নি দেশের আকাশ। বড় কথা বইটি দেখার প্রেক্ষাপটে ময়নামতির শালবন বিহার, মহাস্থানগড়জাতীয় স্মৃতিসৌধ, সংসদ ভবন, শহিদ মিনার, বায়তুল মোকাররম, লালবাগ কেল্লাসহ সব গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিয়ে এমন ছবি, আলোক ও বায়ু দূষণের আবিলতামুক্ত সাপেক্ষে, তুলতে আগ্রহী করে তুলবে হয়ত দেশের জ্যোতির্আলোকচিত্রে উৎসর্গিত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে।নীল আকাশে খইক্ষেতের সোনালি ফুলের মতো অজস্র তারা” দেখার আমন্ত্রণ ভুলে যাওয়া পাঠককেনক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে” আসমানের দিকে আবার তাকানোর তাড়না দেবে। আর এখানেই সফল, বার্তাবহ এই বইটি।

শুঁয়া ভাইরাস (করোনা ভাইরাস) কোভিড-১৯ সৃষ্ট বিশ্বমারির প্রকোপে দলিত দুনিয়া। এমন অসহায় সময়ে তাফরেশির দুটি বইয়ের প্রকাশনা পিছিয়ে দিতে হয়েছে- সে বইয়ের দিকেও আগ্রহ ভরে তাকিয়ে থাকবে অনেকে।

syed.musareza@gmail.com