logo

আফগানিস্তান: মস্কো বা ওয়াশিংটন জিততে পারেনি কখনোই

সের্গেই রাদচেনকো | Thursday, 19 August 2021


আফগানিস্তান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সরিয়ে আনা এবং সেখানে তালেবানের চোখ ধাঁধানো বিজয়ের পর লেখালেখির ঢল নেমেছে। দেশটিতে আসন্ন তালেবান শাসনের সম্ভাব্য ভয়াবহতা তুলে ধরে আবেগকে উস্কে দেওয়ার মতো অনেক লেখাই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। একই সাথে একটি প্রশ্নও শোনা যাচ্ছে, আফগানিস্তানের সরকারকে বাঁচানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরো কিছু করা কী উচিত ছিল? এরই মধ্যে দেশটির সরকার ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে অঢেল রক্ত ও সম্পদ ব্যয় করেছে আমেরিকা।

এমন প্রশ্নের পরিষ্কার জবাব হলো, না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এমন এক পরিস্থিতির মুখে পড়েন যা ১৯৮০-র দশকের শেষে দিকে সাবেক সোভিয়েত নেতা মাইকেল গর্বাচেভও মোকাবেলা করেননি। বাইডেন ও গর্বাচেভ উভয়ই আফগানিস্তান থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেন তার ভিত্তি ছিল প্রায় একই। গর্বাচেভ আফগানিস্তানেকে ‘অবিরত রক্তক্ষরণ হচ্ছে এমন এক ক্ষতের’ সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। আমেরিকানদের জন্য আফগানিস্তান ছিল এমন একটি দেশ সেখানে প্রতিটি রণক্ষেত্রে জয়লাভ করার পরও গোটা যুদ্ধে হেরে যেতে হয়। সোভিয়েতকালেও এ কথা তাদের জন্য সত্য ছিল। আজকের আমেরিকা এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ই আফগানিস্তানে রাষ্ট্র-গঠনে ৩০ বছর ব্যয় করেছে। দুই প্রচেষ্টাই শোচনীয় ভাবে ভরাডুবির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।

আফগানিস্তান নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরো মিল রয়েছে। এই দুইজনের কারোই আফগানিস্তান ছেড়ে আসার কথা ছিল না। আফগান যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত এ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল সাড়ে সাত  বিলিয়ন (বা সাত হাজার ৫০০ কোটি) ডলার। সে সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বার্ষিক  সামরিক ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১২৮ বিলিয়ন (বা ১২ হাজার ৮০০ কোটি) ডলার। এই ব্যয়ের সাথে তুলনা করলে আফগানিস্তানে সোভিয়েত অর্থ খরচকে একটি শিশির বিন্দু হিসেবেই মনে হবে।

তবে সাবেক সোভিয়েতের তুলনায় আফগানিস্তানে আমেরিকার অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। সেখানে দুই ট্রিলিয়ন ( বা দুই লাখ কোটি) ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করেছে আমেরিকা এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মতোই খারাপের পেছনে আরো নগদ অর্থ পাঠাতে প্রস্তুত ছিল আমেরিকা।

আফগানিস্তানে হতাহতের শিকার হয়েছে ১৫ হাজার সোভিয়েত নাগরিক,  অন্যদিকে আমেরিকার হয়েছে দুই হাজারের বেশি। তবে আফগান যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকা বা সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনো যুদ্ধ-বিরোধী বিক্ষোভের মোকাবেলা করেনি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে মস্কো বা ওয়াশিংটন উভয়ই আরো বছরের পর বছর ধরে আফগানিস্তানে থাকতে পারত। এরপরও আফগানিস্তান নিয়ে প্রশ্ন যতোটা না আর্থিক তার চেয়ে বেশি হলো নৈতিক। আফগানে নিজ সংকট নিয়ে ১৯৮৬ সালে সোভিয়েত পলিট ব্যুরোতে গর্বাচেভ যে কথা বলেছিলেন তাই এখানে তুলে ধরা হলো। তিনি বলেন, “আফগানিস্তানে কি আমরা চিরকাল থাকবো? নাকি সেখানে চলমান যুদ্ধের ইতি টানা আমাদের উচিত? না হলে, আমাদেরকে সব দিক দিয়েই অবমাননার মুখে পড়বত হবে…..আমাদের এখনই আফগানিস্তান থেকে সরে আসতে হবে। ওখান থেকে আমাদেরকে বের হয়ে আসতেই হবে।”

২০ বছর আফগানিস্তানে কাটানোর পরও আমেরিকা নিজেকে সংকটের একই পর্যায়ে দেখতে পায়। তারা কি দেশটিতে চিরকাল থাকবে? যদি তাই না হয় তবে তবে আজই বা এক বছর পরে কিংবা আরো ২০ বছর পরে আফগানিস্তান থেকে সরে আসে তা হলে কী হবে?

                                                         মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন


তা হলে, ওয়াশিংটনকে আরো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করতে এবং আরো মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার মতো অবস্থায় পড়তে হবে। আর এ সবই ঘটবে অর্থহীন ভাবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের মতোই আফগানিস্তানও মার্কিনীদের জন্য কৌশলগত বিভ্রান্তি এবং নৈতিক কলঙ্ক। কোভিড-১৯ থেকে বিশ্বের উষ্ণায়ণ, চীনের সঙ্গে চলমান প্রতিযোগিতাসহ নানামুখী চ্যালেঞ্জ চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে আমেরিকাকে। দুনিয়ার কোনো এক রাষ্ট্র-নির্মাণে জড়িত আমেরিকার জন্য এ পরিস্থিতি মোটেও সহায়ক নয়। কেননা, সেখানে রাষ্ট্র গড়ে তোলার সকল কার্যক্রম ও তৎপরতা ধারাবাহিক ভাবে বানচাল হয়ে গেছে।

আর যাই হোক, বাইডেন অন্তত স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গর্বাচেভকে কথিত তৃতীয় বিশ্বের বন্ধুদের কাছে সোভিয়েত বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়েছিল। এতে আফগানিস্তান থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে কয়েক বছর লেগে যায়।

১৯৮৯ সালে সোভিয়েতরা আফগানিস্তান থেকে হটে আসার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে থাকে। একই সময়ে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপের দিকে দ্রুতগতির ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করে। যাতায়াতের আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর মুজাহিদদের হুমকি বাড়ে। কান্দাহারকে ঘিরে ফেলে তারা। এমন কি উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত সাবেক সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এডওয়ার্ড শোভার্দনাজ পর্যন্ত আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা সরিয়ে আনার সিদ্ধান্তের খানিক রদবদল করতে চান। সোভিয়েত সমর্থিত নাজিবুল্লাহর নেতৃত্বাধীন সরকারকে বাঁচাতে আফগানিস্তানে ১০ থেকে ১৫ হাজার সোভিয়েত সেনা রাখার প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসেন তিনি।

বিজ্ঞজনোচিত ভাবেই এ প্রস্তাব নাকচ করেন গর্বাচেভ। তিনি বুঝতে পারেন যে আধা-খিঁচরে পদক্ষেপ কোনো সুফল বয়ে আনবে না। বরং তাতে চলমান যন্ত্রণা বাড়বে,  কিন্তু অনিবার্য ঘটনা প্রবাহ এড়ানো যাবে না। ১৯৮৯ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে সরে আসে।

                                              সাবেক সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ



এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণির মতো আফগানিস্তান ছেড়ে ভেগে যাননি নজিবুল্লাহ। বরং তার ক্ষমতা আয়ু প্রত্যাশারও চেয়ে খানিকটা বেশি হয়েছিল। ১৯৯২ সালে তাঁর সরকারের পতন হয়। নিজে অবশ্য অবধি টিকে থাকেন ১৯৯৬ তালেবানের হাতে ধরা পড়েন এবং প্রাণ হারান। আফগানিস্তানে সোভিয়েত বা রাশিয়ার উপস্থিতি বজায় থাকলে নজিবুল্লাহর সরকার কী রক্ষা পেতো? কিছু সময়ের জন্য তো রক্ষা পেতোই। সে জন্য কী মূল্য দিতে হতো? নজিবুল্লাহ সোভিয়েতে খয়ের খাঁ ছাড়া বেশি কিছু ছিলেন না। তাই তাঁর বৈধতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। আফগানিস্তানের ভেতর থেকে বৈধতা অর্জন করতে না পারলে তার পক্ষে দীর্ঘ দিন টিকে থাকা সম্ভব ছিল না।

এরপর আফগানিস্তান নিয়ে বাকি কাহিনী সবাই জানে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সরে আসার পর দেশটিতে বছরের পর বছরে ধরে চলেছে গৃহযুদ্ধ।  এরপর সেখানে শুরু হয় তালেবানের নৃশংস শাসন।  ৯-১১-র ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের কালোছায়া গ্রাস করে দেশটিকে। এ অবস্থায় কেউ কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, সোভিয়েতরা থেকে গেলে হয়ত এ পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো। কিন্তু এ চেয়েও ভালো প্রশ্ন হলো, সোভিয়েতরা যদি আফগানিস্তানে হামলা না করতো তবে হয়ত এ সবই এড়ানো সম্ভব হতো, তাই নয় কি? সঠিক প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই যথাযথ শিক্ষা গ্রহণ করা যেতে পারে।

আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের ধামা ধরা সরকারের পতন ঘটেছে ৩০ বছর আগে। সাম্রাজ্যবাদী হঠকারিতার মধ্য দিয়ে   আফগানিস্তানের দীর্ঘ দিনের নির্যাতিত মানুষের ওপর ধ্বংস এবং মৃত্যুলীলা বইয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে সব দিনের  কথা হয়ত আজও হয়ত খুব কম মানুষই ভুলতে পেরেছে। ভুল ও কাল্পনিক ভুলের কথা তুলে তার দায় নিয়ে রাশিয়ার অনেকে গর্বাচেভের প্রতিই তাদের আঙ্গুল তুলে থাকেন। আফগানিস্তানে হেরে যাওয়ার জন্য গর্বাচেভকে দায়ী করার আগে এ সব মানুষও দ্বিতীয়বার চিন্তা ভাবনা করবেন।

            আফগানিস্তানের কান্দাহর থেকে শেষ সোভিয়েত সেনাদল চলে ফিরে যাচ্ছে ১৯৯৮ সালে


প্রায় ৩০ বছর পরে এ কথা প্রায় নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে, আফগানিস্তানকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে গর্বাচেভ ঠিক কাজটিই করেছিলেন। নিজ সময়ে সহযোগী কমরেড নেতাদেরসহ অনেকেরই কঠোর সমালোচনা সইতে হয়েছে তাঁকে। তারপরও আজ গর্বাচেভের সিদ্ধান্তই সঠিক হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে। একই ভাবে বাইডেনও কী ধরণের চাপের মুখে রয়েছেন তা হয়ত আমরা বুঝতে পারব না। তবে তিনিও সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। যদিও এর বাস্তবায়ন ততো ভালো হয়নি। সে তুলনায় সাবেক সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে বেশ সুশৃঙ্খলার সাথেই হটে এসেছিল।

তবে এও ঠিক আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে সুন্দর কিছু ঘটবে না। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য আফগানিস্তান দৃষ্টি নন্দন কিছু নিয়ে আসেনি। এরপরও সেখানকার মূল কথার তেমন রদবদল হয়নি। আর তা হলো : (আফগানিস্তানে) ঢোকাই ছিল মহা ভুল আর সরে আসাই হলো একমাত্র সঠিক কাজ।

এর কারণ খুবই সহজ: আফগানিস্তানে ইতি ঘটার মধ্য দিয়ে কখনোই মস্কো বা ওয়াশিংটনের হার-জিৎ নির্ধারিত হয়নি।

 

[সের্গেই রাদচেনকো জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। দ্য মস্কো টাইমসে প্রকাশিত তাঁর লেখাটি বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]