আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি: মৃত্যুর পরও যেখানে বেঁচে আছে এক কিশোরী লেখিকা
তাহসীন প্রাচী | Sunday, 12 June 2022
“আমি লেখক হতে চাই, মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকতে চাই আমি। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ, কারণ তিনি আমাকে লেখার ক্ষমতা দিয়েছেন। লেখা দিয়ে আমি আমার ভেতরের সব দুঃখকে বের করে আনতে পারি, নিজেকে বেঁচে থাকার সাহস যোগাই। কিন্তু আমার তার কাছেই প্রশ্ন, আমি কোনোদিন এই ডায়েরির বাইরে কিছু লিখতে পারব? আমি কি কখনো একজন লেখিকা বা সাংবাদিক হওয়ার সুযোগ পাব?”–আনা ফ্রাঙ্ক
৮০ বছর আগের এক ১২ই জুনে ফিরে যাওয়া যাক, হল্যান্ডের আর্মস্টারডার্মের মেরউইডেপ্লিনের এক বাড়িতে। টেবিলের ওপর রাখা বেশ কয়েকটি উপহারের প্যাকেটের মাঝে একটি খুলে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ে কোকড়া চুলের সদ্য ত্রয়োদশী মেয়েটি। একটি প্যাকেটের মাঝে ছিল লাল-সাদা মোড়কের ডায়েরি, মেয়েটির জন্মদিনের উপহার।
তার দিন দুই পর ডায়েরির পাতায় প্রথম কলমের আঁচড় পড়ে। কে জানত, আর্মস্টারডার্মের এক কিশোরীর এই লাল – সাদা ডোরাকাটা মোড়কের ডায়েরি ‘কিটি’ হয়ে উঠবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক অনন্য দলিল, যুগ থেকে যুগান্তরে যা অমর হয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায়?
১৯২৯ সালের ১২ জুন জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে জন্ম হয় আনেলিস মেরি ফ্রাঙ্কের, যাকে বিশ্ব চেনে আনা নামেই। বাবা অটো ফ্রাঙ্ক, মা এডিথ ফ্রাঙ্ক ও বড় বোন মারগট ফ্রাঙ্কের সাথে চার বছর বয়সে নেদারল্যান্ডসে (হল্যান্ডে) পাড়ি জমায় আনা। ১৯৩৯ সালে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হিটলার ও তার নাৎসি বাহিনী তখন ইহুদি হত্যায়- এব্যস্ত। স্বয়ং আলবার্ট আইনস্টাইনকে ছাড়তে হয় মাতৃভূমি জার্মানি, কারণ তিনি ইহুদি ধর্মাবলম্বী।
আনার ডায়েরি লেখার যাত্রা শুরু হয় ১৯৪২ সালের ১৪ জুন, সেই বছরই জুলাইয়ে বন্দিশিবিরের ডাক আসে ফ্রাঙ্ক পরিবারে। আনার বাবা অটো সেই ডাকে সাড়া দেননি। হল্যান্ডের প্রিসেনগ্রাখট ২৬৩ – তে তাদের অফিস-বাড়ির পেছনে একটি গোপন আস্তানায় সপরিবারে আশ্রয় নেন তারা। সাথে ছিল আরেকটি পরিবার ও একজন দন্তচিকিৎসক। কয়েকজন বন্ধুর সাহায্যে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত আত্মগোপন করে ছিলেন তারা। এই পুরোটা সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চিত্র ফুটে উঠেছে কিশোরী আনার লেখনীতে, তার ডায়েরির পাতাগুলোয় লিপিবদ্ধ হয়েছে যুদ্ধ পরিস্থিতি, রাজনীতি, পারিবারিক নির্ঘণ্ট, প্রেম, সাহিত্য।
এভাবেই কেটে যায় পঁচিশটা মাস। ১৯৪৪ সালের ৪ঠা আগস্ট, গেস্টাপোর নাৎসিবাহিনী হামলা করে আনাদের ‘সিক্রেট এনেক্সে’। লুকিয়ে থাকা আটজন ইহুদি মানুষকে টেনে নিয়ে যায় বন্দিশিবিরে। আউশভিৎস বন্দিশিবিরে ১৯৪৫ সালের জানুয়ারীতে মারা যান আনার মা। মারগট আর আনাকে পাঠানো হয় আরো দূরবর্তী বেরজেন – বেলসেন বন্দিশিবিরে। ১৯৪৫ - এর ফেব্রুয়ারিতে মারা যায় মারগট। আর হল্যান্ডের মুক্তির দুই মাস আগে এই বন্দিনিবাসেই টাইফাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অত্যাচার - জর্জরিত আনা ফ্রাঙ্ক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। মৃত্যুর পর তার স্থান হয় কোনো এক গণকবরে, তার মা আর বোনের মতো।
বন্দিশিবিরের অন্ধকার থেকে বেঁচে ফেরেন শুধুমাত্র আনার বাবা, অটো ফ্রাঙ্ক। ফিরতে পারেননি সাথে থাকা পরিবারটির কোনো সদস্যও। অটো ফেরেন তাদের বন্ধু মিপ গিয়েস ও এলি ভোসেন - এর কাছে। সেখানে তার হাতে মিপ তুলে দেন আনার ডায়েরিটি, সাথে আরো কিছু নোটবই যাতে আনা মূল ডায়েরির পাতা শেষ হওয়ার পর তার দিনলিপি লিখছিল। প্রথমে অটো বিশ্বাস করতে পারেননি তার ছোট্ট আনা এত গভীর ভাবনার জগতে ঘুরেছিল, লিখেছিল এমন সব বর্ণনা যার ক্ষমতা অনেক প্রাপ্তবয়স্ক বিশ্লেষকের কাছেও মনে হয়েছে আশ্চর্যজনক। মিপ অটোর হাতে ডায়েরিটি তুলে দেওয়ার সময় বলেন, ‘এই হলো আপনার আনার কিংবদন্তি, এর মাঝেই আনা বেঁচে থাকবে।’.jpg)
নেদারল্যান্ডসের আনা ফ্রাঙ্ক হাউসে সংরক্ষিত আনার ডায়েরি ছবি: হিস্ট্রি ডট কম
অটো ফ্রাঙ্ক প্রথমেই সাহস হারাচ্ছিলেন ডায়েরিটি খুলে পড়ার। নিজের মায়ের কাছে চিঠি লিখে জানালেনও তা। কিন্তু মাসখানের মধ্যেই মন বদলান তিনি। নিজে পড়লেন ডায়েরিটি, কিছু কপি পাঠালেন বেজেলে তার আত্মীয়দের কাছে, কিছু কপি বন্ধুদের কাছে। পুরো ডায়েরিটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করতে শুরু করলেন।
অটো ফ্রাঙ্ক ডায়েরিটি নিয়ে তার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বারবার। তিনি লিখেছেন, “যে আনাকে আমি আমার কন্যা হিসেবে চিনতাম বলে ধারণা করেছিলাম, তার ভাবনায়-লেখায় এত গভীরতা ছিল যা আমি কোনোদিন বুঝতেই পারিনি। আমার কাছে মনে হয় আমি দুজন আনাকে দেখছি, একজন আমার কন্যা, আরেকজন লেখিকা আনা।”
অটো প্রথমেই ডায়েরিটি প্রকাশ করতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু তার বন্ধুরা তাকে বোঝান এই ডায়রিটি সাধারণ কোনো দিনলিপি না, তখনকার প্রেক্ষাপটে মানবতার এক দলিল, যা বিশ্বযুদ্ধকে এক ভিন্ন চোখে দেখতে পুরো বিশ্বকে উদ্বুদ্ধ করবে। অটো রাজি হলেও তখনই কোনো প্রকাশক মিলছিল না, যুদ্ধ – পরবর্তী বিশ্ব তখন সামনে এগিয়ে যেতে আগ্রহী।
অটোর পরিচিত দুজন ইতিহাসবিদ একজন প্রকাশক খুঁজে পেতে অটোকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। ডাচ খবরের কাগজ ‘হেইত পারউল’ – এ জেন রোমেইন আনার ডায়েরি নিয়ে একটি কলাম লেখেন ‘এ চাইল্ড’স ভয়েস’ নামে।
জেন লেখেন, ‘যখন আমি ডায়েরিটি পড়ে শেষ করলাম তখন রাত হয়ে গেছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম এটা ভেবে যে এখনো ঘরের আলো জ্বলছে, আমার সামনে রুটি ও চা আছে, আকাশ থেকে কোনো যুদ্ধবিমানের গর্জন বা সামনের রাস্তা থেকে সৈনিকদের বুটের খটখটানি আমার কানে আসছে না। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভাবতে লাগলাম এই শক্তিশালী লেখার কথা ভেবে, যা আমাকে অচিরেই ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এমন এক সময়ে যা আমরা প্রায় এক বছর আগে পার করে এসেছি।'
এরপর জেন অটোর সাথে ‘কনটাক্ট’ নামে এক প্রকাশনা সংস্থার চুক্তি করতে সাহায্য করেন। এরপর কিছু সম্পাদনার পর অটো অল্প কিছু অংশ বাদে আনার পুরো ডায়েরিটা প্রকাশনার জন্য দিয়ে দেন। ১৯৪৭ সালের ১২ জুন আনার আঠারোতম জন্মবার্ষিকীতে ডায়েরিটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। বইয়ের নামও আনাই ঠিক করে দেয়, ১৯৪৪ সালের ২৯ মার্চ তার দিনিলিপিতে লেখে, বই আকারে যদি এটি বের করা হয় তাহলে নাম হবেহেট আখটেয়ারহুটুস (দা সিক্রেট এনেক্স)।
এরপর পৃথিবীর প্রায় ৬০টি দেশে ৭০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এটি। লেখা হয়েছে চিত্রনাট্য, মঞ্চস্থ হয়েছে নাটক, নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র। ডায়েরির পাতায় পাতায় বারবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আনা, বলে গেছে তেরো থেকে পনেরোর দিকে হেঁটে চলার কৈশোরের গল্প, অনায়াসে বলে গেছে দর্শন, ঈশ্বর, মানবচরিত্র, প্রেম - প্রকৃতি – জীবনবোধ নিয়ে, প্রিয়জনদের হারিয়ে ফেলার দুঃখগাঁথা নিয়ে। সেইসঙ্গেই ফুটে উঠেছে সমকালীন ইতিহাস, ইহুদিদের লাঞ্ছনা – যন্ত্রণা - সংগ্রাম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছবি। অনেক দেশে হলোকাস্টের ঘটনাপ্রবাহের সাথে শিক্ষার্থীদের প্রথম পরিচয় হয় পাঠ্য হিসেবে আনার ডায়েরির অংশবিশেষ পড়ার মাধ্যমেই।
আনা লেখিকা হতে চেয়েছিল, তার ডায়েরিতে বারবার সে এই কথা লিখে গেছে। বন্দিশিবিরের অন্ধকারের আনাকে আমাদের জেনে ওঠা হয়নি, কোনো একখানের মাটিতে মিশে গেছে তার দেহাবশেষ। কিন্তু বেঁচে আছে লেখিকা আনা, তার বই দিয়ে সে ঘুরে বেড়িয়েছে দেশ থেকে দেশান্তরে। ঠিক যেমনটা সে লিখেছিল তার দিনলিপিতে, ‘আমি লেখক হতে চাই, মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকতে চাই আমি।’
তাহসীন প্রাচী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
amipurbo@gmail.com