logo

আগুনপানের অন্য স্বাদ

অর্থী নবনীতা | Tuesday, 5 July 2022


বাংলাদেশের সংস্কৃতির সাথে যেন মিশে আছে আপ্যায়নের পান। যেকোনো অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে মানুষকে বরণ করে নেওয়া সব জায়গায় পানের প্রচলন। প্রয়োজন থেকেই এবং পানের জনপ্রিয়তার কারণে নানাভাবে নানা রূপে মানুষ পান খেতে পছন্দ করে।

বাংলাদেশে মিষ্টি পানের প্রচলন খুব বেশি সময় ধরে হয়নি। এখন দোকানেও নানা রকম পান পাওয়া যায়। একেক পানের এক এক দাম। তবে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় আগুনপান। আগুনপান যেন এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। পানে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তারপর আগুন ধরিয়ে মুখে পুরে ফেলা! কিন্তু এখানে মুখ পুড়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। রাজধানীর পুরান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া যায় এই পান।

ভারতবর্ষে পানের সংস্কৃতি প্রায় ৫,০০০ বছরের পুরনো। প্রাচীনকালে অভিজাত জনগোষ্ঠীর মাঝে পান তৈরি, সাজানো লোকজশিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেত।আগুন পান এর কেন্দ্রস্থল গুজরাটের রাজকোটে। সেখানেই সর্বপ্রথম আগুনপানের প্রচলন শুরু হয়। তারপর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে এই পানের জনপ্রিয়তা। বাংলাদেশে যারা আগুন পান বিক্রি করেন, তারা অনেকেই ভারত বা অন্য জায়গা থেকে শিখে আসেন অথবা ইউটিউব দেখে এই পান বানানো শিখে থাকেন।

পুরান ঢাকা নানাধরনের জনপ্রিয় খাবারের কেন্দ্রস্থল। খাওয়া শেষে পান যেন খাবারে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে, এক সম্পূর্ণতা এনে দেয়। তাই ক্রেতারা খাওয়াদাওয়া শেষে মুখে পুরে নেন পান। এছাড়া মিরপুর সহ ঢাকার নানা জায়গায় পাওয়া যায় এই পান।

পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারে গেলে দেখা মিলবে অনেক গুলো পানের দোকানের। আল্লাহর দান জলিলের মিষ্টি পান, কাশ্মিরি মিঠা পান, দিল্লির শাহী পান, নানা বৈচিত্রময় নামের পানের দোকানের দেখা মিলবে পুরান ঢাকায়। নাজিরাবাজারের কাজী আলাউদ্দিন রোড এবং আগাসাদেক রোডের দোকানগুলোতে আগুন পান পাওয়া যায়। পানের সাথে এখানে দেওয়া হয় চেরি, কিসমিস, সুইট বল, কাজু বাদাম, মোরব্বা, ইন্ডিয়ান শাহী মশলা, স্পেশ্যাল সুগন্ধী, ধনিয়া, মুহরী ইত্যাদি। এছাড়া স্ট্রবেরির জেলি, নারকেল, চকলেট ক্রিম, ভ্যানিলা ক্রিম ইত্যাদিও ব্যবহার করা হয় পানে। 

আগুন পান ছাড়াও শাহী পান, বেনারসী পান, স্ট্রবেরি পান, ওরেঞ্জ পান, লাভ ফরেভার,  স্পেশাল পান, নানা ধরনের নামে ও দামে বিক্রি হয় পানগুলো।

নাজিরাবাজার গেলে সামনেই চোখে পড়বে একটি পানের দোকান। সামনে ঝুলানো বোর্ডে লেখা 'আল্লাহর দান জলিলের মিষ্টি পান'। সাথে পানের নাম আর দামগুলো লিখে রাখা।  

এ দোকানের নাম জানেনা এমন মানুষ কম ই পাওয়া যায়৷ বিকাল থেকে রাতের দিকে এ দোকানে দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া যায়না। দোকানে যিনি বসে আছেন তার নাম আবুল কাশেম। তার সামনে সারি সারি পানের উপাদান সাজানো। আল্লাহর দান দোকানটি চালু প্রায় ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তার থেকে জানা যায়, মহাজন ইন্ডিয়া থেকে পান বানানো শিখেছিলেন। সেটা দিয়ে এখনো পান বানানো হয়। ৫/৬ বছর ধরে এই দোকানে মিষ্টি পান পাওয়া যাচ্ছে।

মহাজন আবুল কাশেমের মামা হন সম্পর্কে। এখন দোকানে আবুল কাশেমই চালান। তার দোকানে বেনারসি, শাহী ও আগুন পানের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। আগুন পান বানানোর আগে বড় আকারের পান নিয়ে সেখানে প্রায় ৪০ টির বেশি মশলা ব্যবহার করেন৷ তারপর সেখানে বিশেষ এক তরল পদার্থ ব্যবহার করে আগুন জ্বালান। নিজেই ক্রেতার মুখে পুরে দেন পান৷ মুখে যাওয়ার পরেই আগুনটা নিভে যায়। একধরনের গরম অনুভূতি পান ক্রেতা। তার দোকানে আগুনপানের দাম ৪০ টাকা। শিক্ষার্থীদের কাছে তুলনামূলক বেশি জনপ্রিয় এই আগুন পান। ফুড ব্লগারদের কাছেও সমান জনপ্রিয় এই পান।

আল্লাহর দান দোকান থেকে আরেকটু এগিয়ে গেলে পাওয়া যাবে আরেকটি পানের দোকান।

দোকানের উপরে লেখা পলাশ স্টোর। বর্তমানে এই দোকানের নাম 'দিল্লীর শাহী মিঠা পান'। এদোকানের যে মালিক তিনিও ইন্ডিয়া থেকে পান বানানোর প্রক্রিয়া শিখে আসেন। প্রায় ৪০ বছর ধরে চলছে এ দোকান৷ জানা যায়, বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া এবং পাকিস্তান থেকে পানের মশলা আনা হয়। এদোকানে সবচেয়ে জনপ্রিয় বেনারসি, ফায়ারপান।

এখানে একটু অবাক করার মত বিষয় যে প্রায় পাশাপাশি অবস্থিত হলেও দুটো দোকানে আগুনের পানের দামের পার্থক্য। তিনি বলেন তাদের বেনারসী পান আর ফায়ার পানে ভিন্ন মশলা দেওয়া হয়। কিন্তু আল্লাহর দানে একই মশলা দিয়ে বেনারসি, আগুন পান বানানো হয়। এছাড়াও এ এলাকায় আরো পানের দোকান পাওয়া যাবে।

তবে জনপ্রিয়তার পরেও এই পান যেমন মানুষের ভাল লাগে আবার ভাল না লাগার তালিকাতেও থাকে এ পান আবার অনেকের কাছে মনে হয় আগুনপান নিয়ে বেশিই আলোচনা করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নুরুল আফসার বলেন, আগুন পান সম্পর্কে অনেকের কাছেই শুনে পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার গেলাম টেস্ট করতে। মুখে নিয়ে হতাশই হলাম। এভারেজ বলা যায়। এর থেকে শাহী পান বা অন্য যেকোনো মিষ্টি পান আরও উপভোগ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী শিহাবুন সাকিব বলেন, পান তার তেমন পছন্দ না। কিন্তু বন্ধুর জোরাজোরিতে তিনি আগুন পান খেয়ে দেখেন। তার কাছে খারাপ লাগেনি৷ তবে তিনি মনে করেন যেহেতু এখানে আগুনের ব্যাপার আছে, তাই এই পান নিয়ে মানুষের আগ্রহ ও আলোচনার কেন্দ্র বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সিফাত তাসনিম বলেন, পানের স্বাদে অন্য পান থেকে তেমন তফাত নেই। আগুনের ব্যাপারটি নিয়ে কিছুটা আগ্রহ কাজ করেছিল তার। খাওয়ার পর বিশেষ কিছু মনে হয়নি। গতানুগতিক পানের মতই।

এই পান এখন বিভাগীয় শহর ছাড়িয়ে দেশের অনেক প্রান্তেই পাওয়া যাচ্ছে। বহু আগে থেকেই আমাদের দেশে দাওয়াত বা বিশেষ আয়োজনে পান খাওয়ার প্রচলন ছিল। গল্পগুজবের মাঝেও পান হয়ে উঠে নিত্য সঙ্গী। তবে অনেকেই আবার মিষ্টি পান পছন্দ করেন না। তারা ভাবেন এতে পানের আসল স্বাদের জায়গাটা নষ্ট হয়ে যায়।

তবে এই মুখে আগুনের ব্যাপারটি নিয়ে অনেকের মধ্যেই নানা প্রশ্ন জেগেছে। এর আছে নেতিবাচক দিক। চিকিৎসকরা বলেন, আগুন পান বেশি খেলে খাদ্যনালীর ক্ষতি হতে পারে। এমনি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে! কেননা আগুনের কারণে মুখের ভেতরের কোষগুলো পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই এগুলো বেশি না খাওয়ার পরামর্শ দেন তারা।

অর্থী নবনীতা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

aurthynobonita@gmail.com