logo

অর্থনৈতিক বাহুবল খাটাতে চাইছে সৌদি আরব

এফই অনলাইন ডেস্ক | Friday, 29 October 2021


বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতই ঘটল ঘটনাটা। আগাম সামান্যতম ইঙ্গিত না দিয়েই ধুম করে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আমদানির বিধি বদলে দিল সৌদি আরব। এ ঘটনায় সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)’এর বড় বড় কোম্পানিগুলোর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। এ সব কোম্পানির কর্তারা তড়িঘড়ি ফোন তুলে নিলেন। সৌদি সীমান্তে পৌঁছে যাওয়া তাদের পণ্যবাহী ট্রাক বহরকে দ্রুত ফেরার নির্দেশ দিলেন। এসব ট্রাকে চাপানো ছিল ইস্পাতের তক্তা থেকে শুরু করে কার্ডবোর্ডের বাক্স পর্যন্ত বিচিত্র সব পণ্য । সময় নষ্ট না করে এবারে তাঁরা সৌদি আরবে নিজ নিজ মক্কেল বা গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজ লেগে গেলেন। মক্কেলদের তাঁরা জানালেন, আগে বছরের পর বছর ধরে যে সব পণ্য শুল্কমুক্ত ছিল এবারে সেগুলোর ওপর ৫ থেকে শুরু করে ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ধার্য করা হয়েছে। এ অবস্থায় সৌদি আমদানিকারকরা এ সব পণ্য বাড়তি টাকা দিয়ে কিনতে রাজি আছে কিনা?

নিজেরদের পরিস্থিতি তুলে ধরতে যেয়ে এক কোম্পানির নির্বাহী বলেন, “খুবই আতঙ্কের মধ্যে পড়েছি। এসব মাল নিয়ে এখন কী করব ভাবতেও পারছি না “

এ বছর জুলাইয়ে এ ভাবে পুরো এক সপ্তাহ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিতরাতের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত ব্যবসা অচল হয়ে রইল। এরপর সৌদিভিত্তিক কোম্পানিগুলো এই আর্থিক ক্ষতি মেনে নিলে ব্যবসায়িক তৎপরতা আবার প্রাণ ফিরে পায়। উপসাগরীয় ব্যবসার মূল বাজারই হলো সৌদি আরব। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমিরাতভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সৌদি আরবের আন্তরিক সম্পর্ক পুরোই বড় ধরণের টানাপড়েনে পড়ে।

তুলনামূলক ভাবে দুর্বল আমিরাত গত কয়েক দশক ধরেই সৌদি আরবের কাছাকাছি থাকার সুবিধা ষোল আনাই ভোগ করছে। মুক্ত, উদার এবং অবাধ জীবন ব্যবস্থার কারণে আমিরাত বিদেশি ব্যবসায়ী ও করপোরেট নির্বাহীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্য ও আর্থিক কেন্দ্র বনে গেছে দেশটি। অবশ্য, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের ভোক্তাদের সবচেয়ে বড় বাজার বলতে  এখনা সৌদি আরবকেই বোঝায়। দেশটিতে  রকমারি সেবায় নিয়োজিত ব্যাংকার, উপদেষ্টা, পরামর্শক, আইনজীবী এবং নির্মাতারা  আমিরাতেই তাঁদের দোকান খুলেছেন। এখানেই ভিড় করে থেকেছেন। কেবল একান্ত বাণিজ্যিক প্রয়োজনে তুলনামূলক  রক্ষণশীল সৌদি আরব সফর সাঙ্গ করেছে তাঁরা।

কিন্তু পারদের মতো চপঞ্চলমতি হিসেবে খ্যাতিমান সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানই এখন সৌদি আরবের কার্যত ভাগ্য-বিধাতা। তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছা, রুচি-অভিরুচি দেশটির দৈনিক কার্যতালিকার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করে। সৌদি আরবকে আধুনিকায়নের আগ্রাসী উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন যুবরাজ। নতুন নতুন শিল্প-কারখানার বিকাশ ঘটানো এবং সৌদি তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য চাকরির সুবিধা সৃষ্টির তাড়নার মধ্যে আছেন তিনি। তাঁরই নেতৃত্বাধীন দেশটি এবারে যে বার্তা ছিল তার মানে নিয়ে কল্পনার কোনো অবকাশই নেই। জানিয়ে দেওয়া হলো, বাণিজ্য এবং কর্মধারা আগের পথে আর চলবে না।

যুবরাজ পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলেন, কোম্পানিগুলো যদি ব্যবসা করতে চায় বিশেষ করে সৌদি আরবের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনের ভাবনা থাকে তাহলে তাদেরকে সৌদি আরবেই ডেরা গাড়তে হবে।  এককালের ঘুমন্ত রাজতন্ত্রের দেশটিকে সে অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নাকাঙ্খা যুবরাজের মনোজগতে উৎসারিত হচ্ছে। তাকে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সৌদি নাগরিকদের এ সব কোম্পানিতে নিয়োগের দরজা খুলে দিতে হবে।

দুবাইতে গুণে-মানে সেরা বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিলাসী পানশালা ও রেস্তোঁরাসহ রয়েছে জীবন যাপন, বিলাস-ব্যসনের নানা সম্ভার ও উপকরণ। রয়েছে বিদেশিদের আর্থিক তৎপরতা দেখভালের জন্য আছে স্বতন্ত্র দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফাইনান্স সেন্টার সংক্ষেপে ডিআইএফসি। এমন সব সমাহারের অনেক কিছুরই দেখা মিলবে না সৌদি আরবে। তারপরও অর্থনৈতিক বিশালতা এখানে মুখ্য হয়ে উঠবে বলেই মুহাম্মদ বিন সালমান (সংক্ষেপে এমবিএস) এবং তাঁর সহচররা বাজি ধরেন।

রিয়াদের আহ্বান:

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের জাগরণের ধ্বনি যেন এখন প্রতিধ্বনি ঘটছে গোটা আমিরাতে। এটি অনুভব করা যাচ্ছে, উপসাগরীয় দেশটির স্থানীয় এবং বহুজাতিক ব্যবসায়ীদের পর্ষদকক্ষগুলোর ধারাবাহিক বৈঠকে।

স্বভাবজাত জাঁকজমকের সাথেই চলতি বছরের শুরুতেই যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান ঘোষণা দেন,  ২০২৪ সালের মধ্যে কোম্পানিগুলোকে তাদের আঞ্চলিক দফতর রিয়াদের সরিয়ে আনতে হবে।  না হলে, সৌদি সরকারের লোভনীয় ব্যবসার কথা তাদের ভুলে যেতে হবে। সৌদি সরকারের ব্যবসা পাওয়া মানেই বাণিজ্যের প্রধান পুরষ্কার পাওয়া হয়েছে বলে গণ্য করে অনেকেই।

এরই পরে জিসিসি দেশগুলো থেকে আমদানি বিধি কাটছাঁট করে রিয়াদ। পরিবর্তনটির মধ্য দিয়ে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে নির্মিত পণ্যের শুল্ক ছাড় এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে গঠিত উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসি হলো উপসাগরীয় মুক্ত বাণিজ্য জোট।

শুঁয়াভাইরাস করোনা বিশ্বমারি নিয়ে উদ্বেগের অজুহাতে আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি দেশের যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল করে রিয়াদ। আমিরাত মনে করে, এর মাধ্যমে যে বার্তা দেওয়া হলো তা গোপন নয়। তবে মজার ব্যাপার হলো, যুবরাজ মুহাম্মদ এবং ইউএই-র কার্যত প্রধান শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের (আবু ধাবির যুবরাজ) মধ্যে টেলিফোন আলোচনার দুইদিনের মাথায়ই তুলে নেওয়া হয় আমিরাতের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া নিষেধাজ্ঞার জোয়াল। [ সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাদশা হলের খলিফা বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান। সংযুক্ত আরব আমিরাত রাষ্ট্রটি সাতটি ছোট ছোট রাজ্যের সমষ্টি: আবুধাবি, আজমান, ফুজাইরাহ, শারজাহ, দুবাই, রাস আল-খাইমাহ এবং উম্ম আল-কাইওয়াইন । আবু ধাবির আমির খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ান হলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতি ও রাষ্ট্রপ্রধান। অন্যদিকে দুবাইয়ের আমির মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম হলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী ও সরকারপ্রধান।] সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবু ধাবির নির্বাহীরা স্বীকার করেন, রিয়াদের নজিরহীন আচরণে ইউএইর কর্তা এবং ব্যবসায়ীরা হতবিহবল হয়ে পড়েছিল। প্রবীণ এক উপদেষ্টা জানান, “প্রথমে সবাই বজ্রাহত হয়ে পড়েছিল। অনেক মক্কেলকেই  সৌদি কর্তারা বলেছে, সৌদি আরবেই উৎপাদন করো এবং উৎপাদনের কাজে সৌদিদের নিয়োগ করো না হয় তোমাদের পণ্যের ওপর হয় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে বা কর বসানো হবে।”

জিসিসির প্রতীক

আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো বড় ধরণের মাথাব্যথায় পড়েছে। সৌদি যুবরাজের আহ্বান মেনে আঞ্চলিক সদর দফতর রিয়াদে সরিয়ে নেবে কিনা ভাবতে গিয়ে এমন ‘মাইনকা চিপায়’পড়েছে তাঁরা। রিয়াদে যেতে হলে, এর মধ্য দিয়ে দুবাইয়ে নির্বাহী হিসেবে যে বিলাস-ব্যসনের জীবন যাপন করছিল তার ইতি টানতে হবে। আঞ্চলিক সদর দফতর রিয়াদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য রিয়াদ তাদের ওপর চাপ বাড়িয়েই চলেছে। তবে এ সংক্রান্ত আইনগত কাঠামো এখনও স্পষ্ট করে তোলা হয়নি।

রিয়াদে আঞ্চলিক সদর দফতর স্থাপনের জন্য অস্থায়ী চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বলে জানুয়ারি মাসে ২৪ কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করা হয়। এ সব কোম্পানির মধ্যে কোমল পানীয় প্রস্তুতকারী পেপসিকো, তেল সেবা গোষ্ঠী শ্লেম্বারগার, প্রকৌশল ও নির্মাণ গ্রুপ ব্যাচটেল এবং পিডব্লিউসি, পরামর্শদাতাসংস্থাসহ আরো কিছু কোম্পানি রয়েছে।

দুবাইভিত্তিক আরেক আন্তর্জাতিক ব্যাংকার বলেন, তাঁর গোষ্ঠী যদি আজ আঞ্চলিক দফতর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় তবে তা সম্ভবত সৌদি আরবে করা হবে। একটি বহুজাতিক কোম্পানির নির্বাহী বলেন, তাঁদের গোষ্ঠী দুবাই দফতরের তৎপরতা কমিয়ে রিয়াদে তৎপরতা বাড়াবে। সৌদি আরবে ব্যবসার পরিমাণ অনেক বেশি, তাই এ কাজ করা হবে।

তবে কোনো কোনো কোম্পানির অভিযোগে বলা হয়েছে, সৌদি আরব তাঁদের সঙ্গে জোর-জবরদস্তি করছে। লাঠির আগায় গাজর ঝুলিয়ে লোভ দেখানোর বদলে লাঠি পেটা করার বা বল প্রয়োগের প্রতি যুবরাজের অনুরাগই এর মধ্য দিয়ে ফুটে বের হয়েছে। ওই ব্যাংকার বলেন, প্রাথমিক ধারণা হচ্ছে, প্রথম প্রথম শাস্তিতে বা ভোগান্তিতে পড়তে হবে তাঁদের। তবে এটাই হয়ত কোম্পানিগুলোকে রিয়াদে আঞ্চলিক সদর দফতর খুলতে বাধ্য করবে।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]