logo

অফিস যখন ঘরে

তানজিম হাসান পাটোয়ারী | Thursday, 20 May 2021


কর্মজীবী মানুষদের কাছে সকালবেলা মানেই তড়িঘড়ি করে অফিসের ব্যাগ গুছিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের আগে কর্মস্থলে পৌঁছানো। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি অফিসের হাজারো কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখার মাধ্যমে কেটে যায় তাদের প্রাত্যহিক দিনগুলো। এই সময়ের মধ্যে অনেকে আবার চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মেতে ওঠেন সহকর্মীদের সাথে খোশগল্পে। এটাই যখন প্রত্যেকের নিত্যদিনের জীবনের চিত্র, ঠিক তখনই করোনা মহামারির ছোবলে পাল্টে যেতে থাকে চেনা পরিচিত দৃশ্যগুলো। বিভিন্ন বিধি-নিষেধের কারণে সেই নির্দিষ্ট অফিস কক্ষের পরিবর্তে নিজ নিজ ঘরই হয়ে উঠে প্রত্যেকের কর্মক্ষেত্র।

২০১৯ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকেই সংকটের মুখে পড়তে হয় প্রায় সব দেশকে। মারাত্মক সংক্রামক রোগ হওয়ায় এসময় সব দেশেই জারি হয় লকডাউন। সবাইকে অবস্থান করতে হয় নিজ নিজ ঘরে। তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে এসময় ঘরে বসেই মানুষ কাজ করার সুযোগ পায়। ফলে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোও মানুষ ঘরে বসে করা আরম্ভ করে। আজকের এ লেখায় ‘ঘরে বসে অফিসনামক মুদ্রার দুটো পিঠই দেখার চেষ্টা করব।

সুবিধাগুলো

ঘরে বসে কাজ করার সুবিধার সংখ্যা কিন্তু কম নয়। আগে একজন কর্মীকে নির্দিষ্ট অফিস সময়ের মধ্যে অফিসে উপস্থিত হয়ে সব কাজ করতে হতো। কিন্তু এখন তিনি ঘরে অবস্থান করার কারণে ঐ সময়ের কিছুটা আগে বা পরেও সেসব কাজ সম্পাদন করতে পারেন। অন্যদিকে আগে যেমন অফিসে যাওয়ার আগে তৈরি হতে একটা সময়ের দরকার হতো, এখন সেটিও আর দরকার হয় না। বাসায় পরে থাকা জামা-কাপড় দিয়েই অফিসের কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। অন্যদিকে অফিসে যেতে রাস্তায় যে সময়টি ব্যয় হতো, সেটিও এখন বেঁচে গেল। ফলে মুক্তি মেলে ট্রাফিক জ্যামের মতো একটি বিরক্তিকর জিনিস থেকে।

এছাড়া বাসায় অফিস হলে যেকোনো ব্যক্তি অফিসের কাজের পাশাপাশি বাসার কাজও করতে পারে। যেমন বাসা পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে রান্না করা, এমনকি মোবাইলে আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কথা বলার কাজটিও করা যায় খুব স্বাচ্ছন্দ্যে। আগে যেমন অফিসে থাকার কারণে পরিবারের সদস্যদের খুব একটা সময় দেওয়া হতো না, সেখানে এখন সার্বক্ষণিক বাসায় অবস্থান করার কারণে পরিবারের সদস্যদের সাথে অনেক সময় কাটাতে পারবেন। খোঁজ-খবর নিতে পারবেন তাদের প্রাত্যহিক জীবন সম্পর্কে যা পারিবারিক বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করতে ভূমিকা রাখবে।

অন্যদিকে, ঘরে অফিস করার কারণে অন্য সময়ে পিছিয়ে থাকা নারীরাও এখন এর সাথে যুক্ত হচ্ছেন, যা নারী ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

অসুবিধাগুলো

অনেক সুবিধা থাকলেও হোম অফিসের ক্ষেত্রে রয়েছে বেশ কিছু অসুবিধা। এক্ষেত্রে প্রথমেই যে অসুবিধাটির কথা মনে আসে, সেটি হলো অপর্যাপ্ত ইন্টারনেট সুবিধার কথা। যেহেতু হোম অফিসের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই পর্যাপ্ত ইন্টারনেট সুবিধার অভাবে প্রায়ই কাজে বিঘ্ন ঘটতে দেখা যায়। অনেকসময় এর কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজও আটকে থাকে। এতে কাজের গতি কমা ছাড়াও আরো নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে বয়োজ্যেষ্ঠ কর্মী যারা আছেন, তারা আগে থেকে এসব তথ্য-প্রযুক্তির সাথে পরিচিত না থাকার কারণে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন। আর এতে প্রতিষ্ঠানের কাজ সম্পাদনে বিলম্ব হওয়া ছাড়াও আরো নানা জটিলতার তৈরি হয়।

এছাড়াও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল বা মফস্বলে অবস্থানকারী কর্মীরা ঠিকমতো ইন্টারনেট সুবিধা পান না। ভোগান্তির পরিমাণও যায় বেড়ে।

আমরা সবাই জানি যে, কাজের মধ্যে বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকলে ঐ কাজটি আনন্দদায়ক হয় না। আগে যেহেতু সবাই অফিসে গিয়ে কাজ করত, তাই কাজের ফাঁকে কিছুটা সময় সহকর্মীদের সাথে ভালো সময় কাটানোর সুযোগ ছিল। অফিস শেষে সবাই মিলে কোথাও ঘুরতে যাওয়াটাও ছিল তখন খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। আর কাজের ফাঁকে এই বিশ্রামের সময়টা তাদের ক্লান্তি দূর করে পুনরায় নতুন উদ্যমে কাজ করার উৎসাহ দিত। কিন্তু হোম অফিসের ক্ষেত্রে এ সুবিধা নেই বললেই চলে।

দৈনিক একই জায়গায় বসে একা একা কাজ করতে গিয়ে অনেকেই মানসিক অবসাদে ভোগেন, যা কাজের গতিশীলতাও কমিয়ে দেয়। মেজাজ খিটখিটে হওয়া থেকে শুরু করে পারিবারিক কলহসহ বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয় এ সময়টাতে। এছাড়া, অফিসের কাজ ঘরে হওয়ায় যেকোনো সময় যেকোনো কাজ ধরিয়ে দেয়া ঊর্ধ্বতনদের সংখ্যাও কম নয়, এতে কর্মীর নিজস্ব রুটিন বাধাগ্রস্ত হয়।

তবে সমস্যা যা-ই হোক না কেন, যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অবশ্যই এর সমাধান করা সম্ভব। যেহেতু অনলাইনে কাজ করার বিষয়ে কর্মীরা আগে থেকে পরিচিত ছিলেন না, তাই তাদের জন্য কিছু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে তারা দক্ষতার সাথে প্রতিষ্ঠানের কাজগুলো করতে পারবে। আর এতে করে কাজের গতিশীলতা বাড়বে। অন্যদিকে কর্মীরা মাঝে মাঝে অনলাইনে সবাই একসাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ পেলে এটি তাদেরকে মানসিকভাবে উৎফুল্ল রাখতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের উপরিস্তরের ব্যক্তিদের অবশ্যই অনলাইনে হয়রানিমূলক কোনোকিছু যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করতেও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।

এ বিষয়ে ‘লাঞ্চ লাগবেনামক চট্টগ্রামের একটি ক্যাটারিং সার্ভিসের প্রতিষ্ঠাতা অনিক রায় বলেন, “লকডাউনে আমাদের ব্যবসায়ের খাবার অর্ডার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে প্রায় সব কাজই অনলাইনের সাহায্যে করা হচ্ছে। অনেক ক্রেতা এখন ঘরে অবস্থান করার কারণে আগের থেকে বেশি খাবার অর্ডার করছে। আর এতে আমাদের ব্যবসার মুনাফার পরিমাণও আগের থেকে বেড়েছে।ঘরে বসে কাজ করতে গিয়ে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কিছু ক্রেতা  অনলাইনে খাবার অর্ডার করে পরে বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ করে। এই সমস্যাটি ছাড়া বাকি সবকিছুই এখন আমাদের ব্যবসার অনুকূলে আছে। 

লেখক বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ইনস্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন

tanjimhasan001@gmail.com