logo

অপু থেকে ফেলুদায় সৌমিত্র-সত্যজিৎ

মোজাক্কির রিফাত | Monday, 15 November 2021


কালজয়ী অভিনয়শিল্পী, বাচিকশিল্পী, লেখক কিংবা মঞ্চাভিনেতা - সব পরিচয়েই সমান উজ্জ্বল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। 

২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর ধরাধামের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে অজানায় নিরুদ্দেশ হন তিনি। আজ তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে চলচ্চিত্র অনুরাগীরা। 

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের তারকাখ্যাতির শীর্ষে পৌঁছানোর পথটা দীর্ঘ, কিছুটা বন্ধুরও। তবে চলচ্চিত্রের চালচিত্রে মহারাজাকে সেলাম না ঠোকা সৌমিত্রের চলচ্চিত্রে আগমনটা কিন্তু বেশ রাজসিক। 

একেবারে প্রথম ছবিতেই চলচ্চিত্রের মহারাজ সত্যজিৎ রায়ের সাথে কাজ তো আর সহজ কথা নয়। এরপর তো সত্যজিৎ-সৌমিত্র বাংলা চলচ্চিত্রের এক অলৌকিক মেলবন্ধনের নাম হয়ে গেলো।  

সাহিত্যে মশগুল, থিয়েটারে নিবেদিত আর রেডিওর কথাশিল্পী সৌমিত্র সিনেমায় মজেছেন পথের পাঁচালী থেকে। এই চলচ্চিত্রের প্রথম দিনের শো দেখতে পারেননি কোনো কারণে। তবে দ্বিতীয় দিন দেখার পর কতবার যে পথের পাঁচালী দেখেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। সেই থেকে সত্যজিৎ রায়কে মনে ধারণ করেছেন তিনি। 

এরপর নাটক, সাহিত্যে মেতে সৌমিত্র আপন ছন্দে, আপন বলয়ে আড্ডা দিয়েছেন, কথা বলেছেন, অভিনয় করেছেন। হঠাৎ একদিন মঞ্চে তার অভিনয়ে অভিভূত হয়ে মানিকবাবুর (সত্যজিৎ রায়ের ডাক নাম) শুটিং ইউনিটের নিত্যানন্দ সৌমিত্রের কাছে আসেন। 

“মানিকদা অপু চরিত্রের জন্য নতুন মুখ খুঁজছেন। তুমি একবার চলো,” নিত্যানন্দের এ কথাগুলোর জন্যই যেন অপেক্ষায় ছিলেন সৌমিত্র। আর যা-ই হোক, মানিকদার সাক্ষাতের সুযোগ তো আর হাতছাড়া করা যায় না!

তবে মানিকদার লেকভিউয়ের বাড়িতে সেদিন ঘটেছিল মজার ঘটনা। ঢুকতে না ঢুকতেই সত্যজিৎ রায় তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ভরাট গলায় বলেছিলেন, “আপনি যে বড় লম্বা হয়ে গেলেন!” দীর্ঘকায় হবার কারণে সে যাত্রায় অপরাজিত সিনেমাতে কাজ পান নি সৌমিত্র।

তবে তাকে মনে ধরেছিলো মানিকবাবুর। মাঝে মাঝেই লেকভিউয়ের বাড়িতে আসা যাওয়া শুরু করেন সৌমিত্র। ১৯৫৯ সালে অপুর সংসার চলচ্চিত্রে ডাক পড়ে তার। সেই যে যুবক অপু হিসেবে শুরু, সত্যজিতের চলচ্চিত্রে এই যাত্রা ফেলুদা  পর্যন্ত বিস্তৃত। এরপর মানিকবাবুর ৩৪ টি চলচ্চিত্রের ১৪টিতেই কাজ করেছেন সৌমিত্র।

অপুর সংসারে  অভুদ্যয়ের পরের বছরই আবার দেবী  চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান সৌমিত্র। এখান থেকেই মানিকদার সাথে রসায়নের বিশেষ শুরু। দুজনের মধ্যে গড়ে উঠে এক অপত্য শ্রদ্ধা-স্নেহের সম্পর্ক। 

চলচ্চিত্রে সত্যজিতের মেজাজ-মর্জি পড়তে পারতেন সৌমিত্র। আবার সৌমিত্রের অভিনয় দক্ষতা আর চিত্রনাট্যের সাথে একাত্মতা প্রকাশের কলাকৌশল মুগ্ধ করেছিল রায়কে। 

তাকে চিন্তা করেই যেন তিনি চিত্রনাট্য লিখেছেন একের পর এক। এই আস্থার প্রতিদান দিয়ে সৌমিত্র অভিনয় করেছেন তিনকন্যা, চারুলতা, অরণ্যের দিনরাত্রি, কাপুরুষ, অশনি সংকেতের মতো চলচ্চিত্রে। 

এরপর এলো সত্যজিৎ রায়ের নিজের সৃষ্টি - গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া সোনার কেল্লা  দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে ফেলুদার আগমন। প্রথম ফেলুদা হিসেবেই বাজিমাত করলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তারপর দ্বিতীয় ও সত্যজিতের পরিচালিত ফেলুদা  সিরিজের শেষ চলচ্চিত্রেও এই ধারা অব্যাহত রাখেন তিনি। এখনো ফেলুদার নাম শুনলে সৌমিত্রর মুখটিই যেন ভেসে ওঠে সবার সামনে।  

ফেলুদার পাঠ চুকিয়ে হীরক রাজার দেশে, ঘরে বাইরে, গণশত্রু  এবং শাখা-প্রশাখা  চলচ্চিত্রে অসাধারণ অভিনয় নৈপুণ্য দেখিয়েছেন সৌমিত্র। ছন্দে বানানো চলচ্চিত্র হীরক রাজার দেশে চলচ্চিত্রের একমাত্র চলিত বাংলাভাষী উদয়ন পন্ডিত চরিত্রে সৌমিত্র মনে গেঁথে আছেন সকলেরই। সেই সাথে গেঁথে আছে তার বলা সব সংলাপ, যিনি সেলাম ঠোকেন না। 

১৯৯০ সালের শাখা-প্রশাখা  চলচ্চিত্রে প্রশান্ত চরিত্রটি ছিল বাংলা সিনেমায় সত্যজিৎ-সৌমিত্র জুটির শেষ নির্মাণ। সত্যজিৎ রায় মারা যান ১৯৯২ সালের ২৩ শে এপ্রিল। এরপর সৌমিত্রও টলিউডের সিনেমাতে দীর্ঘ সময় সরব উপস্থিতির পর ২০২০ সালে বিদায় নেন চিরতরে। 

সত্যজিৎ যেরূপ না থেকেও আছেন তার অমর শিল্পকর্মের মাঝে, লৌকিকতার বাঁধন ভেঙে মহাকালে মিশে গেলেও সৌমিত্রও আছেন তেমনিভাবে, জীবন্ত আর প্রাণবন্ত।

মোজাক্কির রিফাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

anmrifat14@gmail.com