logo

অপচয় রোধে পাল্টে ফেলি কিছু রোজকার অভ্যাস

সঞ্জয় দত্ত | Sunday, 7 November 2021


অপচয় কিংবা অপব্যয় নিয়ে ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে জগতের কল্যাণপ্রার্থী সমস্ত বিষয়ই কথা বলে। আমরা সেগুলো পড়ি, অন্যকে শুনাই, এবং এভাবেই কাটিয়ে দিই পলকা জীবন। নিজেকে পরিবর্তনের ন্যূনতম বালাই আমাদের নেই, কারণ আমরা যে চোখ থাকিতেও অন্ধ, আত্মা থাকিতেও অন্তঃসারশূণ্য!

সে যাই হোক, আক্ষেপের বয়ান বন্ধ করে, আজকে থেকে চলুন দৃষ্টির ধারাপাত মেলে ধরি, দেখি আমাকে আপনাকে দিয়ে কী পরিমাণ অপচয় হচ্ছে রোজ, এবং খুঁজি উত্তরণের চৌরাস্তা। 

পানি অপচয়: গোসলে আপনি ইচ্ছেমত পানি ব্যবহার করছেন, কিংবা এক বালতি পানি আয়েশ করে ঢাললেন আপনার পায়ে, বিস্তর এক ভালো লাগা, আরাম, শান্তি। থামুন। যখন আপনি শরীরে কিংবা পায়ে পানি ঢেলে আরাম বোধ করছেন, ঠিক তখন কোনো এক প্রান্তে কারো বুক তৃষ্ণায় কাতর৷ তার হাতের কাছে হয়তো তখন এক গ্লাস পানি নেই। তাই, খেয়ালের দরজা খুলুন, বন্ধ করুন অপচয়।

পানি পানের পর যতটুকু গ্লাসে থেকে গেলো, তা নিয়ে শখের বাগানে যান। শ্যাম্পু ব্যবহারের সময় কল বন্ধ রাখুন। সজোরে চললে কল, বাঁচবে সময় বাঁচবে বল— এমন অর্থহীন ভাবনা থেকে বিরত থাকুন। কল জোরে কিংবা আস্তে চালানোয় কিচ্ছু আসে যায় না, যদি না আপনি কাপড় কিংবা নিজেকে ধৌত করতে জানেন। মোদ্দাকথায়, অপচয় না করে ব্যবহারে মনোযোগী হোন। 

কাগজ অপচয়: ছোটবেলায় স্বচক্ষে দেখা একটি ঘটনা আপনাদের শুনাই। 

নাম তার শাওন। মধ্যবিত্ত বলতে আমরা যা বুঝি তার চাইতে অনেকটাই কম তার পরিবার। বাবা কাঠমিস্ত্রি। মা শয্যাশায়ী। পড়াশোনায় ষোলোআনা শাওন। নির্বাচনকালীন সময়ে পোস্টার টাঙানো এবং মিছিল করার সুবাদে নাবিস্কো বিস্কুট আর অল্পকিছু উপহার পাওয়া যেত। কিছু করে কিছু পাওয়ার জমজমাট ফুর্তি শৈশবের এক অনন্য চাহিদা। সে চাহিদা আমারও ছিল। মিছিল সন্ধ্যেবেলা থেকে শুরু হয়ে চলত মধ্যরাত পর্যন্ত। পোস্টারের অপর পৃষ্ঠায় আঠা লাগানোর সময় খেয়াল করলাম, অষ্টম পড়ুয়া শাওন দড়ি ছিঁড়ে পোস্টারগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছে। কিছু একটা বলব ভাবতে ভাবতেই ভৌ-দৌঁড়। 

পরদিন শাওনের খোঁজ করলাম। বেচারা লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে সামনে আসলো। হাতে সেলাই করা খাতা। ধবধবে সাদা পাতা। 

পোস্টারের কাগজে তৈরি খাতায় জ্যামিতিক কাজকর্ম। অবাক হলাম, দুঃখও হলো। আমরা অনেকেই হয়তো দিস্তা দিস্তা কাগজ ক্রয় করে, ইচ্ছেমত কোনো পৃষ্ঠায় লিখে না লিখে নতুন খাতা নিয়ে বসি, আর শাওনেরা কুড়ায় পোস্টার।

আবার অনেকসময় আমরা পুরনো অ্যাকাডেমিক বই কিংবা নোটবই স্রেফ দশটা কেজি দরে বিক্রি করে ফেলি। কারো কারো কাছে সে অর্থ হয়তো গুরুত্বপূর্ণ নয়, ঘর খালি করাই মূল উদ্দেশ্য। এমনটা না করে আমরা চাইলেই আশেপাশে খোঁজ করে বইগুলো যাদের প্রয়োজন তাদের হাতে তুলে দিতে পারি। কিছু পৃষ্ঠার ঝালমুড়ির ঠোঙা হওয়ার চাইতে, কারো প্রভাতের উচ্চস্বরে বাংলা উচ্চারণে শরিক হওয়া নিশ্চয়ই ভালো?

জ্বালানি বা গ্যাস অপচয়: বারবার দেশলাই ব্যবহার করতে বড্ড আলসেমি আমাদের। আর তাই সকালবেলা জ্বালিয়ে রাখা গ্যাস চুলো চলতে থাকে দুপুর কিংবা রাত পর্যন্ত। টাকা দিয়ে চালাই গ্যাস, যা মন চায় তা তো করতেই পারি! হ্যাঁ পারেন। কিন্তু আপনার একটু গা-ছাড়া স্বভাবে অন্য কোনো মানুষের ডেকচির চাল সেদ্ধ করতে যদি কষ্ট হয়, তবে তাকে কষ্ট দেয়ার অধিকার তো আমাদের নেই।

সর্বোপরি, কারণ ছাড়াই গ্যাসের ব্যবহার একদিন হয়তো আমাদের নিজেদেরকেই ফেলতে পারে নানামুখী সমস্যায়। তাই, প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাসের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে আমাদেরকেই। 

তড়িৎ অপচয়: মৃদুমন্দ বাতাস, সূর্যের স্বার্থহীন আলো, আমাদের অনেকেরই হয়তো চোখে লাগে না। আর তাইতো, ভরদুপুরে কিংবা প্রভাতে জানলার পর্দা সরানোর মত বিস্তর কষ্টদায়ক কাজ আমরা করতে চাই না। চট করে হাতের কাছে থাকা সুইচ টিপলেই যেখানে বিপ্লব ঘটে, কী দরকার সেখানে এমন ঝক্কি-ঝামেলার!

সূর্যের আলো ব্যবহার শুধু যে আমাদের তড়িৎ অপচয় কমিয়ে দেয় তা কিন্তু নয়, বরং এই আলো দেহের জন্যও উত্তম কিছু। তাই, প্রতিদিন আমরা যেন একটিবারের জন্য হলেও নিজেদের দিকে তাকাই, প্রয়োজন আর অপচয়ের সূক্ষ্ম পার্থক্যটুকু অনুধাবন করি।

জীবনের সাথে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক কোনো শব্দ খোঁজা গেলে, আমি বলব, তার নাম প্রয়োজন। প্রয়োজনের বৃত্তেই আমরা চরকির মত ঘুরছি প্রতিদিন। যেখানে অপচয় করা অন্যায়, নিজের প্রতি নিজেরই অবহেলা। কবি নির্মলেন্দু গুণ প্রয়োজন প্রসঙ্গে যথার্থই বলেছেন— আমি জন্মের প্রয়োজনে ছোট ছিলাম, মৃত্যুর প্রয়োজনে বড় হচ্ছি। 

লেখক সঞ্জয় দত্ত ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।

ই-মেইল:sanjoydatta0001@gmail.com