১৯৫৪ সালের কথা। এপ্রিলে বেরোনো একটি বই হইচই ফেলে দিলো গোটা আমেরিকা ও ইংল্যান্ড জুড়ে। নাম সেডাকশন অভ ইনোসেন্ট।
সাইকিয়াট্রিস্ট ফ্রেডরিক ভারথাম লিখেছেন বইটি। বিষয়বস্তু কিশোর-তরুণদের ওপর কমিকস বইপত্রের কুপ্রভাব।
প্রকাশের সাথে সাথেই বইটি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে শুরু হলো তুমুল আলোচনা। ভারথাম দাবি করলেন, প্রচলিত কমিকস বইগুলো বিপথে নিয়ে যাচ্ছে কিশোর-তরুণদের। এসব বই পড়ে মূল্যবোধহীন হয়ে পড়ছে কিশোরেরা।
এসব বইয়ে থাকা বিভিন্ন ছবি ও সংলাপ যুক্ত করে তিনি মত দিলেন, বয়স নির্বিশেষে যে কেউ পড়ে এসব বই। কিন্তু এসব বইয়ে আছে খুন, নগ্নতা, যৌনতা, সমকামিতার মত বিষয় যা তরুণদের পাপাচারী করে তুলতে ভূমিকা রাখছে।
উল্লেখ্য, পঞ্চাশ দশকের আমেরিকায় সমকামিতা বৈধ কোনো বিষয় ছিলো না। এটাকে দেখা হতো মানসিক বিকৃতির ফল হিসেবে। ভারথাম মনে করেছিলেন, কমিকসে সমকামিতার উপস্থিতি তরুণদের এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তুলবে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি এনেছিলেন ব্যাটম্যানের কথা। আলোচিত এই সুপারহিরোর সাথে রবিনের সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি মত দেন, এসব সম্পর্ক তরুণদের কাছে সমকামিতার মতো ব্যাপারকে স্বাভাবিক করে তুলবে।
তাছাড়া ওয়ান্ডার ওম্যান এর শক্তি-সামর্থের জায়গা নিয়েও ছিল তার আপত্তি। তিনি মনে করতেন এই নারী চরিত্রের উপস্থাপন নারীসুলভ নয়, বরং ওয়ান্ডার ওম্যানকে প্রদর্শন করা হচ্ছে পুরুষসুলভভাবে ও পুরুষের মতো ক্ষমতা দিয়ে।
এছাড়া আরেক আলোচিত সুপারহিরো সুপারম্যানকে তিনি মনে করতেন ফ্যাসিস্টসুলভ, যা আমেরিকান গণতন্ত্রের ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এদিক থেকে সুপারম্যানও ছিলো তার কাছে একটি 'অ-আমেরিকান' চরিত্র।
ভারথাম মনে করতেন হরর কমিকসগুলোতে থাকা নগ্নতা ও যৌনতা শিশুদের অবাধ যৌনাচারী করে তুলবে। বিশেষত 'নাইটস অব হরর' সিরিজে আঁকানো নারীচরিত্রগুলোর দিকে আঙ্গুল তুলে তিনি দেখান যে, এভাবে যৌনলীলা ও স্বল্পবসনে উপস্থিত চরিত্র কিশোরদের নারী বিষয়ে ভোগবাদী ধারণা আরো পোক্ত করবে।
ভারথামের লেখালেখি নিয়ে সে সময় তৈরি হয় ব্যাপক আলোচনা। সিনেটর এসটেস ক্যাফাবুভে ভারথামকে পূর্ণ সমর্থন করেন এবং সিনেটে এসব কমিকসে সেন্সরশিপ আনার ব্যাপারে আলোচনা উত্থাপন করেন।
সে সময় তার এই প্রস্তাব টেলিভিশনে প্রচারিত হয়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। কমিকস বইগুলোর প্রতি অভিভাবকরাও হয়ে ওঠেন বিরূপ৷ ফলে বাজারে নামে ব্যাপক ধ্বস। কয়েকমাসের মধ্যেই পনেরোটির মত কমিকস প্রকাশক কোম্পানি বইবাজার ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
তবে এ কাজটি করার পেছনে ক্যাফাবুভের অন্য উদ্দেশ্য ছিলো। কমিকস বা কিশোরদের নিয়ে তেমন মাথাব্যথা ছিলো না তার। তিনি আগ্রহী ছিলেন মবদের ধরতে।
সেসময় কমিকসের রমরমা বাণিজ্যের ফলে মবদের অনেকে বিনিয়োগ করতো এসবের পেছনে। তাদের কালো টাকা সাদা করার একটা ভালো মাধ্যমে পরিণত হয়েছিলো এই ইন্ড্রাস্ট্রি৷ কাজেই ক্যাফাবুভে ভেবেছিলেন কমিকস ইন্ড্রাস্ট্রি দুর্বল হলে মব নির্মুল করতে তা সহায়ক হবে।
সে বছরই (১৯৫৪ সালে) ঘটে কুখ্যাত ব্রুকলিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। এই হত্যাকারীদের মনস্তত্ব বিশ্লেষণের জন্য নিযুক্ত হয়েছিলেন ভারথাম। তিনি দাবি করেন, কমিকস বই থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েই এই কিশোর গ্যাং এই ঘটনা ঘটায়।
যদিও আদালতের রায়ে কমিকসের কোন দায় প্রমাণিত হয়নি, তবে ততদিনে যা সর্বনাশ হবার তা হয়ে গেছে। পাবলিক সেন্টিমেন্ট তখন পুরোপুরিভাবে চলে গেছে কমিকসের বিরুদ্ধে। ফলে বাজারে ব্যাপক ধ্বস নামে। শুধুমাত্র ইসি আর মার্ভেল ছাড়া অন্য প্রায় সব কোম্পানি বাজার ছাড়ে।
তবে ইসি কমিকসের প্রধান উইলিয়াম গেইনস দাবি করেছিলেন, এসব কমিকস ওরকম নেতিবাচক ক্যাথারসিস ঘটায় না। এখানে যা উপস্থাপন করা হয়, তা কাহিনীর সাথে সঙ্গতি রেখেই। আর কোনরকম অপরাধকে এখানে গৌরবান্বিত করা হয়না।
১৯৫৪ সালেই প্রবল জনপ্রিয় ' নাইটস অব হরর' সিরিজের ওপর আদালত নিষেধাজ্ঞা দেন যা বলবৎ থাকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত। এ সময়ে কোম্পানিগুলোতে সেলফ সেন্সরশিপ অনেক বেড়ে যায়।
এতে একদিকে যেমন যৌনতার মতো সংবেদন বিষয়গুলোর উপস্থাপন কমে আসে, আবার একইভাবে স্পর্শকাতর বিভিন্ন বিষয় বা অপরাধের বর্ণনাও যথাসম্ভব এড়িয়ে যাওয়া হতে থাকে।
তবে ভারথাম যেভাবে কমিকসগুলোকে দায়ী করেছিলেন আসলেই কি সেগুলো অতটা ক্ষতিকর ছিলো? পরবর্তী সময়ের গবেষকরা অনেকক্ষেত্রেই ভারথামের মূল্যায়নকে অতিরঞ্জিত বা অতিসরলীকৃত মনে করেছেন।
আবার হরর বইগুলোর কথা বলতে গেলে এখানে যৌনতার ব্যাপারটি অনেক পুরাতন। ড্রাকুলারও আগে কারমিল্লা-য় আমরা দেখতে পাই, নারী খলচরিত্রটি সমকামি। ডিটেকটিভ উপন্যাসে অপরাধ সংঘটন খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। কমিকসে শুধু সেটা এঁকে দেখানো হতো, এটুকু পার্থক্য। কিন্তু ডিটেকটিভ উপন্যাসেও দিনশেষে সত্যের বিজয়ই প্রতিষ্ঠিত হয়।
যা-ই হোক, সে সময়ে আমেরিকা-ইউরোপের বহু দেশেই কমিকস ইন্ড্রাস্ট্রি ধ্বংসের প্রান্তে দাঁড়ায় এ বইটির কারণে।
ফ্রান্স-জার্মানিসহ আরো বহু দেশেই সেন্সর আইন ও কিশোর সাহিত্যের কনটেন্টগুলো মূল্যায়নের জন্য সংসদীয় কমিটি গঠিত হয়। ফলে সামাজিক বিভিন্ন অসংগতি বা সমসাময়িক ঘটনা তুলে ধরার ক্ষেত্রেও বাধার সৃষ্টি হয়।
মধ্য-পঞ্চাশ দশকের এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অবশ্য অনেকদিন লেগেছিলো কমিকস ইন্ড্রাস্ট্রির। শেষপর্যন্ত নব্বই দশকে এসে আবার কমিকস বইগুলো ফিরে পায় তাদের হারানো যশ-খ্যাতি।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
mahmudnewaz939@gmail.com