Loading...

‘যাকে হত্যা, তার মায়ের কাছেই আশ্রয় নেয় খুনি’

| Updated: December 29, 2021 13:51:07


ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

ছিনতাই করা মোবাইল নিয়ে বিরোধে ঢাকার রাস্তায় ছুরি মেরে নিজ দলের এক সদস্যকে হত্যার পর তার মায়ের কাছেই আশ্রয় নিয়েছিল খুনি। হত্যা মামলার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে প্রধান সাক্ষীও হয়েছেন তাদেরই একজন।

ঘটনার তদন্তে নেমে হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে একথা জানানা হয়। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- রুবেল (২১), রনি (২২), ক্যান্ডি ওরফে কন্ডি (১৯) এবং রিংকু (২০)। এরা সবাই মোবাইল ছিনতাইয়ে জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ২৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টার পর আসাদ গেট এলাকায় তালুকদার পেট্রোল পাম্প থেকে কিছু দূরে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় পরদিন মারা যায় তাদের এক সদস্য আব্দুর রব।

তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, “সেদিন জাতীয় সংসদ ভবনের কাছে ওই রাস্তায় চেঁচামেচি শুনে রব ও রুবেলকে ফুটপাতের ওপর আহত অবস্থায় পায় পুলিশ।”

তাদের উদ্ধার করে শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে রুবেলকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন ভোরবেলায় মারা যান রব।

পরে এ ঘটনায় রবের মা নূর জাহান (৪০) বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষী হন রুবেল। সাভারের বলিয়ারপুর এলাকায় মায়ের সঙ্গে থাকতেন রব।

মামলার এজাহারে বলা হয়, বাসা থেকে নিউ মার্কেটের উদ্দেশে কাপড় কেনার জন্য বের হওয়া আবদুর রবকে ছুরিকাঘাত কর ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। এসময় তার সঙ্গে থাকা তিন হাজার টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

সেসময় রবের সঙ্গে থাকা রুবেলের দেওয়া তথ্য তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, “পুলিশকে সে জানায়, স্থানীয় মোবাইল টানা পার্টির সদস্য বা ‘থাবা কামলা’ হিসেবে পরিচিত সন্ত্রাসীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।”

এ বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি উৎপল বড়ুয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জিজ্ঞাসাবাদে প্রতিপক্ষ কাজল, শিপন গ্রুপের নাম বলে রুবেল। আমরাও তাদের খোঁজ শুরু করলাম।

“কিন্তু বিস্তারিত তদন্ত করে দেখা গেল এই গ্রুপগুলো তখন ওই অবস্থানে ছিল না। আমরা জানতে পারলাম, এরাও ছিনতাই করে এবং এদের মধ্যেই পক্ষ-বিপক্ষ আছে।”

সংবাদ সম্মেলনে বিপ্লব কুমার বলেন, “ঘটনাস্থল সরাসরি সিসিটিভির আওতায় না থাকলেও আশেপাশের সিসি ক্যামেরা ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে পুলিশ যে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছিল তাতে রুবেলের কথার সত্যতা পাওয়া যায় না।

“ভিকটিম আব্দুর রবের পরিবারের সদস্যরাও শুরু থেকেই রুবেলের বিষয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিল। রুবেল ও নিহতের পরিবারের দেওয়া মিথ্যা তথ্যের মধ্য থেকেই পাওয়া যেতে থাকে সত্যের সন্ধান।”

আসলে যা ঘটেছিল

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঘটনার দিন সাভারের বলিয়ারপুরে রবের বাসা থেকে তাকে নিয়ে মোবাইল ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে বের হন রুবেল। মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়ে এসে তাদের সাথে যোগ দেয় রনি ও ক্যান্ডি।

পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “‘থাবা কামলা’ রনির বিশেষ পারদর্শিতা আছে মোবাইল থাবা দেওয়ায়। তবে, তাদের দলনেতা রুবেল। তিন রাস্তার মোড় থেকে আসাদ গেট পর্যন্ত তারা সেদিন থাবা দিয়ে পেয়ে যায় চারটি মোবাইল।

“মোবাইলের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে আগে থেকেই দ্বন্দ্ব ছিল রুবেল, রনি ও রবের। ছিনতাই করা চারটি মোবাইলের একটি সেদিন পছন্দ হয় রবের। এ নিয়েই আবারও বিবাদ শুরু হয়।”

তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “মনে মনে রবকে শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনায় রাস্তা পার হয়ে আসে রনি ও রুবেল। সাথে আনে রবকে। রাস্তার অপরদিকে থেকে যায় ক্যান্ডি ও রিংকু।

“রাস্তার এপারের ফুটপাথে আসার পরেই সঙ্গে থাকা দ্বিমুখী সুইচ গিয়ার ও অপর একটি গিয়ার দিয়ে রবকে আঘাত করতে থাকে রনি ও রুবেল। এতে মাটিতে পড়ে যায় রব।”


সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তাদের যেন সন্দেহ করা না হয়, সে জন্যে তারাই চিৎকার করে পুলিশকে ডেকে আনে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা মনগড়াভাবে অন্য ‘থাবা কামলা’ গ্রুপের নামগুলো বলতে থাকে।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার বলেন, “পুলিশ যখন সেখানে গিয়েছিল তখনও রবের জ্ঞান ছিল। তবে ভয়ে গুরুতর আহত রবও তার মুখ বন্ধ রাখে।”

যাকে হত্যা তার মায়ের কাছেই আশ্রয়

ওসি উৎপল বড়ুয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঘটনার পর আহত রুবেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে রবের মায়ের কাছে গিয়েই উঠেছিল। পরে সে অন্য জায়গায় চলে যায়।

“ঘটনা আঁচ করতে পেরে অভিযান শুরু করে শেরেবাংলানগর থানার পুলিশ। পরে ২৬ ডিসেম্বর রবের বাড়ি থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় ক্যান্ডিকে। এরপরই ধীরে ধীরে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারে পুলিশ।”

ওসি জানান, ক্যান্ডির তথ্যের ভিত্তিতে একইদিনে গ্রেপ্তার করা হয় রিংকুকে। সোমবার যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় রনিকে। একই দিনে গ্রেপ্তার হয় রুবেল।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে পুলিশ জানায়, তারা মূল শহর থেকে কিছুটা দূরে বাস করে। বাসাগুলোকে তারা তাদের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে। যে কোনো অপরাধ করে তারা পালিয়ে থাকছে এই আস্তানাগুলোতে।

“তাদের পরিবারের সদস্যরাও অপরাধমূলক কাজের সুবিধাভোগী ও উৎসাহদাতা। নিজের আপনজনকে হারিয়েও তারা জানা সত্ত্বেও হত্যার মূল ঘটনা, হত্যার সাথে জড়িত, অভিযুক্ত এমনকি হত্যায় ব্যবহৃত আলামত লুকিয়ে রাখতেও দ্বিধা করছে না।”

অভিযুক্ত রিংকু ও ক্যান্ডি ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের নামে দুটি করে মামলা রয়েছে বলেও জানায় পুলিশ।

রুবেলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় সাতটি, রনির বিরুদ্ধে তিনটি মামলা আছে। ডাকাতি, ডাকাতির চেষ্টা এবং দস্যুতার অভিযোগে এসব মামলা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলেন জানানো হয়।

Share if you like

Filter By Topic